কোরিয়ার দুই বন্ধুর স্বর্ণপদক জয় আর চিরবিচ্ছেদের গল্প!

কাঁটাতার দিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করার ইতিহাস খুব বেশিদিনের না। কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব-ভালোবাসা কী সীমান্ত-কাঁটাতারের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়? হয় না বলেই নিজ দেশের চরম বৈরিতা সত্ত্বেও গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার দুই টেবিল টেনিস খেলোয়াড়ের। একসঙ্গে তাঁরা জিতেছিলেন স্বর্ণপদক। কিন্তু কাঁটাতার আর রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে আর কাছাকাছি আসতে পারেননি তাঁরা। ঘটেছিল তাঁদের চিরবিচ্ছেদ।

দক্ষিণ কোরিয়ায় চলমান শীতকালিন অলিম্পিকে যৌথভাবে আইস হকি দল গড়েছে উত্তর ও দক্ষিন কোরিয়া। উদ্বোধনী দিনে এক পতাকাতলে হেঁটেছেন দুই বৈরিভাবাপন্ন দেশের অ্যাথলেটরা। তবে খেলাধুলার আসরে উত্তর আর দক্ষিণের এক হয়ে যাওয়ার নজির অবশ্য এবারই প্রথম না।

১৯৯১ সালে বিশ্ব টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে তারা পাঠিয়েছিলো যৌথ একটি দল। সেই দলের দুই সেরা খেলোয়াড়ই এই প্রতিবেদনটির মূখ্য চরিত্র। তাদের নেতৃত্বে সেই দলটি জয় নিয়ে এসেছিলো দুটি দেশের জন্যই। দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল গভীর বন্ধুত্ব। কিন্তু পরবর্তীতে আর কেউই কারো দেখা পাননি। বাকি জীবনটা দুজনেই কাটিয়েছেন এই চিরবিচ্ছেদের বেদনা নিয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোরিয়াকে ভাগ করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তি ও জোসেফ স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন। দক্ষিণ দিকে গড়ে তোলা হয়েছিল পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। আর উত্তর হেঁটেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রের পথে। দুই কোরিয়ার চরম বৈরি সম্পর্কের সূত্রপাত হয়েছিল এখান থেকেই।

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলে কোরিয়া যুদ্ধ। এরপর মুখ দেখাদেখিই বন্ধ হয়ে যায় দুই কোরিয়ার। দীর্ঘদিন পর ১৯৯১ সালে এসে প্রথমবারের মতো কোনো ক্রীড়ামঞ্চে একসঙ্গে দল গড়েছিল উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৯১ সালে বিশ্ব টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে এসে দক্ষিন কোরিয়ার চ্যাম্পিয়ন হিউ জুং হুয়ার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল উত্তর কোরিয়ার রি পুন-হুই-এর। দুজনের দারুণ নৈপুণ্যে ভর করে শিরোপা জিতেছিল অখণ্ড কোরিয়া। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষে তাদের ফিরে যেতে হয়েছিলো নিজ নিজ দেশে। তারপরে আর দেখা হয়নি নিজেদের মাঝে চমৎকার বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এই দুই ক্রীড়াবিদের। সম্প্রতি বিবিসির কাছে সেই সময়ের স্মৃতি স্মৃতি রোমন্থন করেছেন হিউ জুং হুয়া।

“রি পুন-হুই আর আমি ছিলাম আমাদের দলের অধিনায়ক। সে আমার চেয়ে বয়সে এক বছরের বড় ছিলো বলে আমি তাকে বড় বোন বলে ডাকতাম। আমার মনে হয় সে তা পছন্দ করতো। এভাবেই আমরা নিজেদের খুব কাছের হয়ে উঠেছিলাম দিনে দিনে। তাছাড়া দুটি দেশের প্রত্যাশার ভার আমাদের কাধে সমানভাবে ছিলো বলে দুজন দুজনের দ্বায়িত্বের জায়গাটাও বুঝতাম। সে যদি কোন খেলায় খারাপ খেলতো, আমার নিজের খারাপ লাগতো, উল্টোটা তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিলো”।

এভাবেই তারা ধীরে ধীরে একে অপরের খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠলেন। হিউ জুং হুয়া আরও বলেছেন, “নারীদের টুর্নামেন্টের ফাইনালের দিনে গ্যালারীতে উপচে পড়া দর্শকের ভীড় ছিল। শুধুমাত্র উত্তর কোরিয়ানরাই না,দক্ষিন কোরিয়ানরাও খেলা দেখতে এসেছিল”। ফাইনালে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিলো কোরিয়া আর চীনের মাঝে। আর তারপরেই ঘটলো সেই ঘটনা, চমৎকার এক শটে জয় নিজেদের করে নিলো কোরিয়ার দল।

“খেলা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সাংবাদিকেরা আমাদের ঘিরে ধরেছিলো। আমরা তখন কাদছিলাম জয়ের আনন্দে। সে কান্না যেন আর থামে না। এই অর্জনটি আমাদের দুজনের একত্রে কাজ করার ফল ছিল।“

খেলা শেষে বিদায়কালে হিউ একটি সোনার আংটি উপহার দিয়েছিলেন রি কে, “সে আমাকে বলেছিল, এই আংটিটি নেওয়ার অনুমতি মিলবে না। আমি তাকে বললাম যেভাবে পারো, এটি নিজের সাথে নিয়ে যাও।প্রয়োজনে লুকিয়ে নিয়ে যাও। আমি তাকে বলেছিলাম তার সাথে কাটানো সময় ও স্মৃতিগুলো খুব মূল্যবান আমার কাছে, এই আংটির দিকে তাকালে আমার কথা মনে পড়বে তার”।

বিগত ২৭ বছর ধরে রি-এর সাথে একাধিকবার দেখা করার চেষ্টা করে গিয়েছেন হিউ। কিন্তু কোনোবারই সফলতা পাননি। বেশ দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে তনি শেষ করেছেন, “আমি জানি এটা অদ্ভুত আচরণ আমার দিক থেকে, কিন্তু আমি যখনই তার কথা ভাবি, মন খুব ভারী হয়ে ওঠে”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*