ক্রিকেট বড় না জীবন বড়?

‘পানির অপর নাম জীবন’। চিরাচরিত এই সত্য কথাটি যে সত্যিই কতটা সত্য ও বাস্তব, তা হাড়েহাড়ে উপলব্ধি করছে করছে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের মানুষ। আর মাস দুয়েকের মধ্যেই ফুরিয়ে যাওয়ার কথা শহরটির পানির মজুদ। তখন কী ধরণের পরিস্থিতি তৈরি হবে, সেই আশঙ্কায় দিন গুনছেন দক্ষিণ আফ্রিকার রাজধানীর বাসিন্দারা। এখনও পানি ব্যবহারের ওপর আরোপ করা হয়েছে নানাবিধ বিধিনিষেধ।

ভয়াবহ এই পানি সংকটের মধ্যে কেপ টাউনে আয়োজিত হতে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ। যে ম্যাচগুলোর জন্য স্টেডিয়াম প্রস্তুত করার জন্য প্রচুর পানি ব্যবহার করতে  হয় গ্রাউন্ডসম্যানদের। সেটা করা হবে কিনা, তা নিয়েই সংশয়-বিতর্ক চলছে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট অঙ্গনে। প্রশ্ন উঠছে… ক্রিকেট বা খেলাধুলা বড় নাকি জীবন বড়?

আগামী ১২ এপ্রিলকে ‘ডে জিরো’ হিসেবে সনাক্ত করেছে কেপ টাউন। অর্থাৎ এই দিনের পর থেকে শহরটি হয়ে যাবে বিশ্বের প্রথম পানিশূণ্য শহর। সেই দিনের পর থেকে প্রতিদিন একজন ব্যক্তির জন্য বরাদ্দ হবে মাত্র ২৫ লিটার পানি। আর সেটা নেওয়ার জন্যও প্রতিদিন লাইনে দাঁড়াতে হবে কেপ টাউনের নাগরিকদের। বর্তমানে শহরটিকে আরোপ করা হয়েছে পানি ব্যবহারের বিশেষ আইন। এখন প্রতিদিন একজন ব্যক্তির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৫০ লিটার করে পানি। পর্যাপ্ত পানির অভাবে জীবনযাপনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই থমকে যেতে হচ্ছে শহরটির মানুষদের। বাধার মুখে পড়ছে ক্রিকেটও।

ক্রিকেট স্টেডিয়ামগুলো খেলার উপযোগী রাখার জন্য পিচ ও আউটফিল্ডে নিয়মিত পানি ছেটাতে। হয়। কিন্তু পানি সংকটের কারণে গত অক্টোবরে অর্ধেক করে আনা হয়েছিল ক্লাব ক্রিকেটের সূচি। আর এবারের মৌসুমের খেলা পুরোপুরিই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ক্ষেত্রে কী করা হবে, তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউপিসিএ)।

আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি কেপ টাউনের নিউল্যান্ডস ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের পর মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি টেস্ট খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা এই স্টেডিয়ামটিতে। কিন্তু সেসময় প্রবল পানিসংকটের মধ্যে খেলা আদৌ চালানো সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।

কেপ টাউনের যে জায়গাটিতে স্টেডিয়ামটি অবস্থিত, সেখানে এক শতাব্দী আগে ছিল একটি লেক। আর সেখানে এখনও জমে আছে বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি। মাঠ প্রস্তুত করার জন্য এখন সেই পানি উত্তোলনের কথাই ভাবছে ডব্লিউপিসিএ-র কর্মকর্তারা। সংগঠনটির প্রধান নাবেল ডিন ক্রিকইনফোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমাদের মধ্যে এই মুহূর্তে কিছুটা বিতর্ক চলছে। আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিৎ যে, আমরা কি ক্রিকেট বিশ্বকে একটা সবুজ মাঠ দেখাতে চাই? যেখানে আমরা আছি ভয়াবহ এক খরার মধ্যে! নাকি আমরা তাদেরকে এই বাস্তবতাটাই দেখাতে চাই।’

নিউল্যান্ডের মাঠে এখন প্রতিদিনের বদলে পানি দেওয়া হচ্ছে প্রতি সপ্তাহে একবার। আর পর্যাপ্ত পানির অভাবে ধূসর হতে শুরু করেছে মাঠের আউটফিল্ড। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করলে রাতারাতিই এই চিত্র পাল্টে ফেলে খেলার উপযোগী একটি সবুজ মাঠ তৈরি করে ফেলা সম্ভব বলেও জানিয়েছেন ডব্লিউপিসিএ-র সিইও নাবেল ডিন।

কিন্তু তিনি এটা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি যে, প্রচণ্ড পানি সংকটে ভুগতে থাকা একটা শহরে আন্তর্জাতিক দলকে আতিথেয়তা দেওয়াটা কতটা যুক্তিযুক্ত হবে। শেষপর্যন্ত এই প্রশ্নের সিদ্ধান্তটা হয়তো নেওয়া হবে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ও ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে।

এখন পর্যন্ত কেপ টাউনে কোনো ক্রীড়া অনুষ্ঠিত বাতিলের নজির নেই। ক্রিকেট ছাড়াও আগামী দুই মাসের মধ্যে অন্য কয়েকটি বড় ক্রীড়া ইভেন্ট আছে। মার্চের ১১ তারিখ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে দ্য কেপ বাইকেল ট্যুর। এটি বিশ্বের অন্যতম বড় সাইক্লিং ইভেন্ট। আর মার্চের ৩১ তারিখ থেকে শুরু হবে হাফ ম্যারাথন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*