ডোপ কেলেঙ্কারি, মমি আর এক অধিনায়কের অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ যাত্রার গল্প!‍

১৯৯৯ সালের কথা, চিলি আর আর্জেন্টিনার পর্বতঘেরা সীমান্তে জমে যাওয়া তিনটি ইনকা গোত্রের শিশুর লাশ পাওয়া যায়। ভূপৃষ্ঠ থেকে ৬,০০০ মিটার উপরে ঠান্ডা আবহাওয়ায় সেই লাশগুলো ছিলো একদম টাটকা অবস্থায়। সেগুলো পাওয়া গিয়েছিলো এক মৃত আগ্নেয়গিরির উপরে। প্রায় ৫ শতাব্দী আগে তাদের ঠিক যেভাবে সেখানে বলি দিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছিলো, সেভাবেই শায়িত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিলো তাদের অবিকৃত শরীর।

প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গিয়েছে তার পরে, কিন্তু সেই আবিষ্কার এখনো আমাদের জানায় তাদের পেছনে ফেলে আসা সেই পৃথিবীর কথা। সে নিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ আর ইতিহাসবিদদের আগ্রহের অন্ত নেই। কিন্তু সেই মমিগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল এক ফুটবলারের ভাগ্যও। তিনি পেরুর অধিনায়ক পাওলো গারেরো। অবৈধ মাদক নেওয়ার দায়ে নিষিদ্ধ হলেও শেষপর্যন্ত ঠিকই বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রেখেছিলেন তিনি। গারেরোর নেতৃত্বেই পেরু খেলেছে রাশিয়া বিশ্বকাপে। কিন্তু কিভাবে সম্ভব হলো সেটা? আর তার সঙ্গে কয়েকশ বছরের পুরোনো মমিরই বা কী সম্পর্ক? অসম্ভব আকর্ষণীয় সেই গল্পই জানা গেছে বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদন থেকে।

গারেরোর তিক্ত-মধুর বাছাইপর্ব

দূষিত এক হারবাল চা পান করার পর থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নিজেকে বেশ সংযত রেখেছিলেন তিনি, থেকেছেন মাদকমুক্ত এক ইতিবাচক অবস্থায়।

পেরুতে কোকা পাতা সামাজিকভাবেই গ্রহণ করা হয়ে থাকে। প্রায় ৮,০০০ বছর ধরে এই পাতা ভক্ষণের নিয়ম ছিলো কিছুটা পাতা মুখে নিয়ে ঘন্টাখানেক সময় ধরে চুইংগামের মতো চিবনো। কিন্তু এখন সেই প্রাচীন ঐতিহ্য ভেঙ্গে কোকা পাতা পানিতে ভিজিয়ে রেখে তা ভক্ষণের প্রচলন ঘটেছে।

দক্ষিণ আমেরিকার বেশিরভাগ অংশেই কাঁচা কোকা পাতা খাওয়া বৈধ। উচ্চতার ভয় যাদের আছে, তাদের জন্য এটি উপকারী, এমন ধারণাও রয়েছে। এই পাতা খাওয়ার পরের অনুভূতিকে তুলনা করা হয় প্রচন্ড কড়া এক কাপ কফি বা চা খাওয়ার অনুভূতির সাথে।

কুখ্যাত সাদা পাউডার কোকেন আর কাঁচা কোকা পাতার মাঝে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। কোকেন হলো বহু কেমিক্যাল প্রক্রিয়াকরণের ফসল এক উপাদান। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাত্র এক কাপ কোকা পাতার পানিই যথেষ্ট ডোপ টেস্টে দোষী সাব্যস্ত হবার জন্য।

আর তাই হলো গারেরোর সাথে গত বছরের অক্টোবর মাসে বিশ্বকাপের দুইটি কোয়ালিফাইয়ার ম্যাচ খেলা শেষে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ০-০ গোলের ড্র এবং কলম্বিয়ার সাথে ১-১ গোলে ড্র করেছিলো পেরু। সেই ফলাফলের কল্যাণে ১৯৮২ সালের পরে প্রথমবারের মত পেরুর সামনে আসে বিশ্বকাপের প্রধান আসরে অংশ নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ।

তাদের সামনে একমাত্র বাধা নিউজিল্যান্ড, তাদের টপকাতে পারলেই যখন সেটি নিশ্চিত, ঠিক সেই মূহুর্তেই পেরু হারাতে বসেছিল তাদের প্রধান খেলোয়াড় , অধিনায়ককে।

গারেরো ফিফাকে জানান যে, তার ঠান্ডা লাগার কারণে তাকে দুই ধরণের হারবাল চা খেতে দেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান তাকে এক কাপ মৌরি মিশ্রিত চা এবং আরেকবার লেবু ও মধু মিশ্রিত রঙ চা দেওয়া হয়েছিলো, এমন হতে পারে যে ভুলবশত সেই চায়ে মিশানো হয়েছিল কোকা পাতা।

কিন্তু তার সেই ব্যাখ্যা কেউই কানে তোলেনি। ডোপ টেস্টে তার শরীরে পাওয়া গেলো কোকেন মেটাবোলাইট বেনজয়লেকগোনাইন এবং তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো ১২ মাসের জন্য।

আন্ত-মহাদেশীয় প্লে-অফ এর ম্যাচগুলো চললো তাকে ছাড়াই। গারেরো বেঞ্চে বসে দেখলেন তার দল অ্যাওয়েতে ০-০ গোলে ড্র করল। হতাশায় নিশ্চয়ই ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু ফিরতি লেগের ম্যাচটা পেরু জিতে যায় ২-০ গোলে। আর সেই জয়ে সারা দেশের সকলের সাথে এক অসাধারণ আনন্দে মেতে ওঠেন গেরোরো।

কিন্তু এ ছিল তিক্ত-মধুর অভিজ্ঞতা। গারেরো আবেদন করতে পারতেন, কারণ তিনি বিশ্বকাপ এর মত এক অসামান্য আয়োজন থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছিলেন।

তাহলে মমি কোত্থেকে এলো এই গল্পে?

ডিসেম্বরে ফিফার শুনানিতে গারেরোর আবেদনের অংশ হিসেবে তার আইনজীবী এলসি ক্যামেরন নামের একজন ব্রাজিলিয়ান বায়োকেমিস্ট এর শরণাপন্ন হন। ক্যামেরন রিও ডে জেনিরোর ফেডেরাল ইউনিভার্সিটি অফ দ্য স্টেট অফ রিও ডি জেনিরোর একজন বিশিষ্ট প্রাণরসায়নবিদ।

তিনি জবানবন্দী দেন যে, বেনজয়লেকগোনাইন-এর যে উপস্থিতি গারেরোর মূত্র পরীক্ষায় পাওয়া গিয়েছে তা কোকা পাতা সমৃদ্ধ চা খেলে শরীরে থাকা স্বাভাবিক। বরং কোকেন গ্রহণ করলে তা শরীরে নাও থাকতে পারে। এবং তিনি আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে এর মধ্যে এনেছেন- ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডার ইন্সটিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ এর প্রত্নতাত্ত্বিক চার্লস স্ট্যানিশ।

স্ট্যানিশ ইনকা সংস্কৃতির জ্ঞানে পারদর্শী। তিনি সেই শুনানিতে পেরুতে কোকা পাতার স্থানীয় গুরুত্ব এবং জনপ্রিয়তা সম্পর্কে জানান। আরো জানান কিভাবে এক হারবাল মিশাতে গিয়ে অন্য হারবাল ভুলে মিশ্রিত হতে পারে, কিভাবে এই ভুল হলেও খাওয়ার সময় তা নাও বোঝা যেতে পারে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। চমক রয়েছে আরো।

তিনি সবচেয়ে বড় প্রমাণ দিলেন কিভাবে গারেরোর শরীরে কোকা পাতার উপস্থিতিকে কোকেন ভেবে ভুল করা হতে পারে। আর সেই প্রমাণের সময়ে এলো ভলকান লুলাইলাকো এর চূড়ায় ১৮ বছর আগে উদ্ধার করা সেই তিন ইনকা শিশুর মমিগুলো। ২০১৩ সালে ফরেনসিক গবেষণায় দেখা যায় সেই মমিগুলোর চুলে বেনজয়লেকগোনাইন এর উপস্থিতি দেখা যায়, ঠিক যেমনটি পাওয়া গিয়েছে গারেরোর মূত্রে।

এইখানে বার্তাটি সহজঃ এক্ষেত্রে কোকেন কিভাবে দায়ী হয়, যখন সেই শিশুগুলোর শরীর আগ্নেয়গিরির উপরে প্রায় ৪ শত বছর আগে রাখা ছিলো, আর কোকেন এর আবিষ্কার হয় ১৮৫৯ সালে জার্মান রসায়নবিদ অ্যালবার্ট নাইম্যান এর দ্বারা?

এই সময়েই হয়তো গারেরোর কেস এর চাকা ঘুরে যায়নি, তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এই বিষয়টি বেশ উপকারে এসেছে। যাই হোক, তার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে আনা হলো। এক বছরের জায়গায় তার সাজা কমিয়ে ৬ মাস করা হলো, যার ফলে নিশ্চিত হলো তার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া। কি মধুর বিজয়!

এখানেই শেষ নয়!

এপ্রিলে গারেরো যখন মাঠে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন ওয়ার্ল্ড অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সি (ওয়াডা) কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট (ক্যাস) এর কাছে আবেদন জানায়।

ওয়াডা দাবি করে যে ফিফা যাই বিচার করুক না কেন, গারেরোকে লিখিত আইন অনুযায়ী সাজা ভোগ করতেই হবে শরীরে বেনজয়লেকগোনাইন এর উপস্থিতির কারণে। সেই সাজা হলো এক থেকে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা।

গারেরোর আইনজীবিরা এর বিপরীতে আরেক আবেদন জমা দেন, তাদের কথা হলো যে বেনজয়লেকগোনাইন এর উপস্থিতির কারণে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আইন আছে সেটিই ভিত্তিহীন।

কিন্তু মে মাসে যখন বিশ্বকাপ শুরু হবার এক মাস বাকি, তখন ক্যাস ঘোষণা দিলো ওয়াডা এর পক্ষেই। গারেরোকে নিষিদ্ধ করা হলো ১৪ মাসের জন্য।

ঠিক এই সময়ে বিশ্বকাপের তিন ক্যাপ্টেন- ফ্রান্সের হিউগো লোরিস, অস্ট্রেলিয়ার মাইল জেডিনাক এবং ডেনমার্কের সাইমন জাইর এক খোলা চিঠিতে আবেদন জানান যে ফিফা যেনো সাময়িকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং ফ্লামেঙ্গোর হয়ে খেলা এই ফরোয়ার্ডকে রাশিয়া বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

কিন্তু ব্যাপারটি তখন আর ফিফার ক্ষমতার মধ্যে নেই। ঠিক তখনই ঘটনাচক্রে এলো আরেক টুইস্ট!

পেরুর জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রতিবাদ করতে জড়ো হন হাজারো পেরুর নাগরিকেরা। গারেরো নিজের নির্দোষ হবার বিষয়ে এবার সুইস ফেডারাল ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানান। আর সেই সাথে সেই মমিগুলোও তৃতীবারের মতো গেলো আদালতে।

মে মাসের ৩১ তারিখে, বিশ্বকাপ শুরু হবার ২ সপ্তাহ আগে সুইস ফেডারাল ট্রাইব্যুনাল সেই ১৪ মাস মেয়াদী নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। গারেরোর বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এভাবেই।

ক্যাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় যে তারা এই রায় এর বিরোধিতা করবেনা। সে নিশ্চিন্তে খেলতে পারে।

আর এভাবেই যখন পেরু ডেনমার্কের সাথে সারান্সক স্টেডিয়ামে খেলতে নামলো, তাদের সম্পদস্বরূপ স্ট্রাইকার গারেরো, যার ডাকনাম এর অর্থ হলো যোদ্ধা, নামলেন দলকে মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে। কম যুদ্ধ করেননি পেরুর এই যোদ্ধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *