রাশিয়া বিশ্বকাপ: কী হতে পারে গ্রুপ র্পবরে লড়াইয়ে

ফুটবল বিশ্বকাপের দামামা শুরু হতে আর বেশিদিন নেই। নিজেদের শক্তি দেখাতে মুখিয়ে আছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্সের মতো দলগুলো। খুব একটা পিছিয়ে নেই উরুগুয়ে, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া, সুইডেনের মতো আন্ডারডগরা। চমক দেখাতে পারে স্বাগতিক রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, আইসল্যান্ডের মতো খর্বশক্তির দেশগুলো। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের গ্রুপপর্বের চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে আজকের এই প্রতিবেদন।

গ্রুপ  (রাশিয়া, উরুগুয়ে, মিশর, সৌদি আরব)

বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয়া ৩২ দলের মধ্যে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে সবার নিচে অবস্থান রাশিয়ার। তারপরেও শেষ ১৬’র দুয়ার খোলাই থাকছে তাদের জন্য। কারণ, ঘরের মাঠে উদ্বোধনী ম্যাচে সৌদি আরবকে মোকাবেলা করা খুব একটা কঠিন হবার কথা নয় রাশানদের জন্য। যদিও ছেড়ে কথা বলবে না লিভারপুল তারকা মোহাম্মদ সালাহ’র মিশর। ১৯৯০ সালের পর প্রথমবারে মতো বিশ্বকাপের টিকেট পাওয়া আফ্রিকার দলটি হয়ে উঠতে পারে রাশিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অপরদিকে ল্যাটিন পরাশক্তি উরুগুয়ের জন্য গ্রুপটাকে কঠিন বলার উপাই নেই।

অনুমান: গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শীর্ষ ষোলতে যাবে উরুগুয়ে। সঙ্গী হবে রাশিয়া।

গ্রুপ বি (পর্তুগাল, স্পেন, ইরান, মরক্কো)

গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হবে ইউরোপীয়ান দুই জায়ান্ট স্পনে ও পর্তুগাল। নিশ্চিতভাবেই ম্যাচে বাড়তি উত্তাপ ছড়াবে রয়িাল মাদ্রদিরে দুই সর্তীথ সার্জিও রামোস আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দ্বৈরথ। গ্রুপের কঠিনতম লড়াই হবে এ দুই দলের।

পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলবে ইরান। যদিও বিশ্বকাপে তারা সবশেষ জয়ের দেখা পেয়েছিলো ১৯৯৮ সালে। ইরানের বিপক্ষে জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও স্পেন-পর্তুগালের জন্য বিপজ্জনক হবে না ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয়া মরক্কো।

অনুমান: গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কাছে হারলেও সহজেই পরের রাউন্ডে উঠে যাবে পর্তুগাল।

গ্রুপ সি (ফ্রান্স, পেরু, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া)

ফ্রান্সের জন্য স্বপ্নের গ্রুপ। পেরু কিছুট হালকাভাবে নিতে পারলেও ১৯৯৮ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নদের জন্য ডেনমার্ক হতে পারে বিপদজনক।

৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া পেরুর অবস্থান ফিফা র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দশে। এদিকে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখা অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ সফলতা এসেছিলো ২০০৬ সালে। সেবার গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে শীর্ষ-১৬তে জায়গা করে নিয়েছিলো তারা। ডেনমার্কেরও এটি পঞ্চম আসর। তাদের সর্বোচ্চ অর্জন কোয়ার্টার ফাইনাল। শক্তির বিচারে গ্রুপে দ্বিতীয় অবস্থানের জন্য পেরু-ডেনমার্ক-অস্ট্রেলিয়ার হতে পারে ত্রিমুখী লড়াই।

অনুমান: গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। সঙ্গে যাবে পেরু।

গ্রুপ ডি (আর্জেন্টিনা, ক্রোয়েশিয়া, আইসল্যান্ড, নাইজেরিয়া)

আর্জেন্টিনার জন্য ড্র’টাকে সুখকর বলা যাবে না। নিজেদের ছয় বিশ্বকাপে পঞ্চমবারে মতো আর্জেন্টিনাকে মোকাবিলা করতে যাচ্ছে নাইজেরিয়া। যদিও আগের চারবারই হেরেছে সুপার ঈগলরা। বাছাইপর্বটা ভালো যায়নি আর্জেন্টাইনদের। হ্যাটট্রিক করে খাদের কিনারা থেকে দলকে রাশিয়ার টিকেট পাইয়ে দিয়েছেন লিওনেল মেসি। আর তিনিই জর্জ সাম্পাওলির তুরুপের তাস।

এদিকে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলছে আইসল্যান্ড। মাত্র ৩ লাখ ৩৪ হাজার জনসংখ্যার দেশটি বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ। ২০১৬ ইউরো থেকে ইংল্যান্ডকে ছিটকে দিয়ে নিজেদের সামর্থের প্রমাণ তারা আগেই দিয়েছে।

এদিকে ধারাবাহিক উন্নতি করা ক্রোয়েশিয়াও আছে লাইমলাইটে। রিয়াল তারকা লুকা মডরিচ এবং লিওনেল মেসির ক্লাব সতীর্থ ইভান রাকিটিচের মতো প্রতিশ্রুতিশীল ফুটবলারা নিজেদের মেলে ধরতে পারলে সবকিছুই সম্ভব ক্রোয়েটদের জন্য।

‘গ্রুপ অব ডেথ’ বলা না গেলেও কোনো দলকেই এককভাবে ফেভারিট বলা যাচ্ছে না। শক্তির বিচারে নাইজেরিয়া কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও গ্রুপের সবগুলো ম্যাচই হবে কঠিন।

অনুমান: গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হবে আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয় স্থানের জন্য দ্বিমুখী লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়ার কাছে পরাজয় হবে আইসল্যান্ডের।

গ্রুপ  ( ব্রাজিল, সুইজারল্যান্ড, কোস্টারিকা, সার্বিয়া )

ব্রাজিলের জন্য স্বস্তির ড্র। প্রতিযোগিতার সবগুলো আসরে কোয়ালিফাই করা একমাত্র দল ব্রাজিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সফলতম দলটি সবশেষ ঘরের মাটিতে জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের ভৌতিক হারের শোক কাটিয়ে ফিরেছে দারুণ ছন্দে। নেইমার, কৌতিনহো, জেসুসের মতো তুরুণ তুর্কীদের নিয়ে গড়া দলটি সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে ছন্দে আছে। রাশিয়া বিশ্বকাপেও শিরোপার শক্ত দাবিদার তিতের শিষ্যরা। বাছাইপর্বে তাদের গর্জণ তারই প্রমাণ। ‘ফুটবলস্বর্গ’ দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলেরর বাছাইয়ে ১৮ ম্যাচের মাত্র ১টিতে হেরেছে তারা।

রাশিয়ায় নিজেদের ১২তম বিশ্বকাপে লড়বে সার্বিয়া। নিজেদের দিনে যেকোনো দলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর যথেষ্ট সক্ষমতা তাদের আছে। দ্বিতীয় স্থানের জন্য সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে হয়তো জোর লাড়াই হবে সার্বদের। তবে সবশেষ বিশ্বকাপের মতো এবারও যদি কোস্টারিকা চমক দেখাতে পারে তবে হিসেবটা ভিন্ন হতেই পারে। ব্রাজিল বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা দলটিকে তাই হিসেবে রাখতেই হচ্ছে সুইজারল্যান্ড ও সার্বিয়ার।

অনুমান: গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। সঙ্গী সুইজারল্যান্ড।

গ্রুপ এফ ( জার্মানি, মেক্সিকো, সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়া)

জার্মানির মতো পরাশক্তি এর চেয়ে সহজ গ্রুপ প্রত্যাশাই করতে পারে না। ফ্রান্স বা ব্রাজিলের মতো ড্র নিয়ে জার্মানিরও অভিযোগ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। সুইডেন পরিশ্রমী এবং লড়াকু দল। তবে জার্মানদের সামনে তাদের ক্ষমতা সীমিত। দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা মেক্সিকোও বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের চিন্তার কারণ হবার জন্য যথেষ্ট না।

মেক্সিকো ও সুইডেনের মধ্যে একটা দলকে একটু এগিয়ে রাখার কাজটা কঠিন। নিজেদের সবশেষ ছয় বিশ্বকাপের প্রত্যেকটিতেই নকআউট পর্বে পা রেখেছে মেক্সিকো। অপরদিকে বাছাইপর্বের প্লেঅফে ইতালিকে বিদায় করে মূল পর্বে এসেছে সুইডিশরা। এছাড়া বিশ্বকাপে এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ধারাবাহিক দক্ষিণ কোরিয়া। মেক্সিকো আর সুইডেনের বিপক্ষে লড়াইয়ের সক্ষমতা থাকলেও বড় কিছুর প্রত্যাশা করাটা কঠিন কোরিয়ানদের জন্য। গ্রুপে দ্বিতীয় স্থানের জন্য জোর লড়াই হবার সম্ভাবনা মেক্সিকো এবং সুইডেনের মধ্যে।

অনুমান: গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন জর্মানি। সঙ্গে যাবে মেক্সিকো।

গ্রুপ জি ( বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, তিউনিশিয়া, পানামা )

ফিফা র‌্যাংকিংয়ের দিক থেকে এই গ্রুপটিই সবচেয়ে দুর্বল। ড্রয়ের সময় তাদের সম্মিলিত র‌্যাংকিং সবচেয়ে কম, চার দলের গড় র‌্যাংকিং ২৬। এর মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে পানামা। এর আগে চার বিশ্বকাপে কোনবারই গ্রুপ পর্ব পার করতে পারেনি তিউনিশিয়া। গ্রুপ পর্বে কিছু পয়েন্ট অর্জনের ক্ষমতা থাকলেও বড় ধরণের ঝাঁকুনি হয়তো দিতে পারবে না আফ্রিকান দলটি।

নজর থাকবে বেলজিয়াম আর ইংল্যান্ডের দিকে। দুই দলই বাছাইপর্বে অপরাজিত। ইউরোপীয়ান দল দু’টির শীর্ষ-১৬তে পৌঁছাতে খুব বেশি বেগ পাবার কথা নয়। তবে গ্রুপে সেরা হবার লড়াইয়ে ইংলিশদের মোটেও ছাড় দেবে না বেলজিয়াম। কারণ, তাদের বেশিরভাগ ফুটবলারই খেলছেন প্রিমিয়ার লিগে। তাই ইংলিশদের খেলার ধরণ এবং কৌশল বেশ ভালোভাবেই জানা তাদের।

অনুমান: বেলজিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে নকআউট পর্বে পা রাখবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড।

গ্রুপ এইচ ( পোল্যান্ড, কলম্বিয়া, সেনেগাল, জাপান)

রাশিয়া বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ গ্রুপ সম্ভবত এটিই। ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা- মহাদেশীয় চতুর্মখী লড়াই। শক্তির বিচারে পোল্যান্ড এবং কলম্বিয়ার যে কোন এক দলকে এগিয়ে রাখা কঠিন। বাছাইপর্বে গ্রুপসেরা হয়ে রাশিয়ার টিকেট নিশ্চিত করেছে পোল্যান্ড। অপরদিকে ল্যান্টিন আমেরিকা থেকে কোয়ালিফাই করেছে কলম্বিয়া, যেখানে প্যারাগুয়ে এবং চিলির মতো পরাশক্তি বাদ পড়েছে।

২০১৪ বিশ্বকাপেও চমক দেখিয়েছে কলম্বিয়া। এবার তাই আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিও থাকার কথা নয় তাদের। অপরদিকে সাদিও মানের সেনেগালও কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে যে কারো জন্যই। সেনেগালের এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ২০০২ সালের বিশ্বকাপেও ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলো সেনেগাল। দারুণ কিছু ফুটবলার থাকায় এবারের সেনেগালকেও গোনায় ধরতে হচ্ছে।

এশিয়ান দলগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক জাপান। গ্রুপের অন্য সদস্যদের চ্যালেঞ্জ জানানোর সক্ষমতা থাকলেও নকআউটের স্বপ্নটা জাপানিদের জন্য ধুসরই মনে হচ্ছে।

অনুমান: গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন কলম্বিয়া। সঙ্গী পোল্যান্ড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *