চালের মূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ী কারা?

লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে চালের দাম। গত এক বছরে চালের মূল্য বেড়ে গেছে ৩৫ শতাংশ। কেন বাড়ছে চালের দাম? কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ঢাকা ট্রিবিউন। এটা সেটিরই প্রথম পর্ব

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোমমিক মডেলিং (সানেম) এর তৈরি একটি মূল্য তালিকায় দেখা গিয়েছে, চালের দাম গত এক বছরের মধ্যে ৩৫% বেড়ে গিয়েছে। গত বছরের জুন থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ২ মিলিয়ন টনেরও বেশি চাল আমদানী করেছে। ভাবলে অবাক হবেন, তার আগের বছরে এই আমদানীকৃত চালের পরিমাণ ছিলো মাত্র ৭,১০০ টন। আমন ও বোরো ধানের সময়ে বন্যা এবং কীটপতঙ্গের কারণে অবশ্য বেশ ক্ষতি হয়েছে চালের। যার ফলে সরকারের চালের মূল্য কমানোর উদ্যোগ সফলতা পায়নি।

কৃষকেরা চড়া মূল্যে বিক্রি করছেন ধান, যার প্রভাবে খুচরা ও পাইকারী ক্রেতারা টের পাচ্ছেন চালের আগুনমূল্য। যেহেতু বন্যা ও পোকামকড়ের আক্রমনে কৃষকদের অনেক ধান নষ্ট হয়েছে, তাই চড়া মূল্য দাবি করে তারা তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

নওগাঁর মখমলপূরের কৃষক আজিজার রহমানের মতো বড় পরিসরে যারা ধান চাষ করেন, তাদের আরো বেশি লোকের দরকার হয় ক্ষেতে কাজ করা জন্য। তার সেই মজুরদের তিনি ডিসেম্বরের ১ তারিখে ধান কাটার দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন। গত বছরের আমন ধানের সময়ে তিনি বিভিন্ন ধরণের ধান প্রতি মণ ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই বছর দালালেরা সেগুলোর জন্য দিতে চাইছে মনপ্রতি ১০০০ টাকা।

কিন্তু এই বছরের উৎপাদন ছিলো আশাভঙ্গের পর্যায়ের। অক্টোবরের ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো ধানক্ষেত। ফলে প্রতি বিঘা জমিতে ধানের উৎপাদন প্রায় ২০০ কেজি করে কমে গিয়েছিলো।

আজিজার রহমান বলেন, “আমি ধানের বীজ কিনেছি প্রতি কেজি ৩৫ টাকা দিয়ে। আর তার সাথে পুরো সময়জুড়ে সার ও কীটনাশকের খরচও রয়েছে। বাজারে চালের দাম মণপ্রতি ৯৮০-১০০০ টাকা হলেও, এই দামে বিক্রি করলে আমার খরচের টাকাও উঠে আসবেনা। ১২০০ টাকা বা তার বেশি মূল্যে বিক্রি করতে পারলে কিছুটা লাভ হবে”।

নুরুল্লাহ মিয়া নামের আরেকজন কৃষক নিজেই তার ধান নিয়ে বাজারে আসেন। তিনি বলেন, “ধান কাটার আগে দালালেরা খুবই কম দামের প্রস্তাব দেয়। তাই বেশি টাকার জন্য আমি নিজেই এগুলা বাজারে এনে বিক্রি করি”। তিনি অভিযোগ করেন যে, দালাল এবং চাল মিলের মালিকেরা বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রন করে। বাজারে যদি মূল্য বেশি থাকে তাহলে তা থেকে লাভবান হয় তারাই।

মহাদেবপুরের একজন দালাল নুরুল ইসলাম দাবি করেন, ধান কাটার আগেই তা কিনে ফেলতে পারলেই কেবল লাভ করা সম্ভব। তার সাথে সহমত পোষন করেছেন আরো অনেক দালাল। তাদের অনেকেরই ধান সংরক্ষন করে রাখার জন্য গুদামের ব্যবস্থা নেই। দালালেরা যখন মিল মালিকদের কাছে চাল বিক্রি করেন, তখন তারা প্রতি ৪০ কেজিতে লাভ করেন ১০-৫০ টাকা। আর মিল মালিকেরা বাজারজাত করার সময় প্রতি ৪০ কেজিতে ১০ টাকা লাভ রেখে বাজারজাত করেন।

তারা আরো জানান, বাজারের চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে চাল কেনেন মিলের মালিকেরা। এই বছর দুর্যোগের কারণে চালের অভাব তৈরি হওয়ার কারণে অনেক মূল্য বেড়ে গিয়েছে বলে জানান তারা।

নুরুল ইসলাম জানান, “সরকার গুটি স্বর্ণা চালের দাম প্রতি কেজি ৩৯ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও এই বছর এর উৎপাদন খরচই দাড়িয়েছে প্রতি কেজিতে ৪১ টাকা। আমরা এক মন চাল ১০১৩-১০২০ টাকা দরে কিনছি”।

নওগাঁ সদরের মেসার্স তসিরন রাইস মিল এর মালিক মোঃ আনিসুর রাহমান জানান, বড় শহরের পাইকারী ব্যবসায়ী এবং দালালদের কারণেই চালের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অবশ্য ঢাকার পাইকারী ব্যবসায়ীরা এই দায় অস্বীকার করেছেন। নানুনাজার এবং বাদামতলীর পাইকারি চাল বিক্রেতা সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, “ঢাকার পাইকারেরা ৫০ থেকে ৬০ টনের বেশি চাল গুদামজাত করে রাখতে পারেনা। কিন্তু অটো রাইস মিলগুলো চাইলে ১০০০ টন পর্যন্ত সংরক্ষন করতে পারে। এখন আপনারাই বলেন, কারা প্রকৃতপক্ষে চালের দাম নিয়ন্ত্রন করছে”।

বাজারে বিক্রয়মূল্য হিসাব করলে অবশ্য দেখা যায়, পাইকারেরা তেমন বেশি লাভ করছেন না চাল বিক্রিতে। তারা প্রতিটি ৫০ কেজির বস্তা কিনছেন ১,৯৫০ টাকায়। আর প্রতি কেজি চাল বিক্রি করছেন ৪১ থেকে ৪৫ টাকায়, যা থেকে তাদের লাভ হয় ১ থেকে ৬ টাকা। বর্তমানে ঢাকার খুচরা বাজারে মোটা চালের দাম ৪৫-৪৬ টাকা প্রতি কেজি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষনা ইন্সটিটিউটের গবেষক ড. আসাদুজ্জামান জানান, ধারণা করা হয় চালের মূল্য বৃদ্ধির মূল কারণ বন্যা এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণ। সরকার চাল সংকট নিরসনে বিদেশ থেকে আনা চালের উপরে আমদানী শূল্ক কমিয়ে দিয়েছে। তাই এখনো যে উচ্চ মূল্য বিদ্যমান, তা কেবলই কৃষকদের মনের ভয় এর কারণে। তিনি বলেন, “কৃষকেরা হয়তো লোকসানের ভয়ে রয়েছে। যার ফলে তারা কিছু চাল নিজেরাই মজুদ করে রাখছে। মিলের মালিকেরাও হয়তো এই একই ভয়ের বশবর্তী হয়ে বিপুল পরিমাণের চাল মজুদ করে রাখছেন কারখানায় ও গুদামে”।

তিনি আরো বলেন, “এই বছর যে উৎপাদন খুবই কম হয়েছে তা নিশ্চিত। কিন্তু যেহেতু ২ মিলিয়ন টন চাল এরই মধ্যে আমদানী করা হয়েছে, এই সংকট আর থাকার কথা না। বাজারে চালের কোনই অভাব থাকা উচিত না এত চাল আসা সত্ত্বেও। যাকে তাকে চাল আমদানীর সুযোগ দিয়ে ভুল করেছে সরকার। সরকারের উচিত ছিলো আমদানীকারকদের এমন শর্তে চাল আনতে দেওয়া, যাতে সরকার চাওয়া মাত্রই চাল সরবরাহ করতে বাধ্য থাকে তারা। রাষ্ট্র যদি ইচ্ছুক হয়, তবে এই সংকট নিয়ন্ত্রন কোন ব্যাপারই না”।

গত বছর বন্যায় দেশের ৩২ টি জেলায় প্রায় ৫,৯১,৬৪৭ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছিলো। নীলফামারী, সিলেট, নড়াইল, হবিগঞ্জ এবং চাপাইনবাবগঞ্জের ধানক্ষেতগুলোতে পোকার আক্রমণও ছিল মাত্রাতিরিক্ত।

ডিসেম্বরের ২১ তারিখে খাদ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকার গত বছর ৪,৬৪,০০০ টন চাল আমদানী করেছে এবং বিভিন্ন প্রাইভেট সংস্থা আমদানী করেছে ১.৭০৫ মিলিয়ন টন চাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*