চাল সংকটের অন্যতম কারণ মজুদকরণ

২০১৭ সাল ছিলো চালের বাজারে আগুন লাগা একটি বছর। জনগণের দাবি এর জন্য দায়ী মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা। আর মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা দোষ দিচ্ছেন প্রাকৃতিক দুর্যোগকে। চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের মজুদকরনের সাথে লড়তে তেমন কিছু আসলে করার নেই সরকারের। নওগাঁ, দিনাজপুর এবং পঞ্চগড় এলাকায় ধান থেকে চাল উৎপাদন হওয়া পর্যন্ত কিভাবে মূল্যের তারতম্য ঘটছে,তা নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ঢাকা ট্রিবিউন। আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব:

গত বছর আমন ধানের সময়ে বন্যা আর কীটপতঙ্গের উৎপাতের জন্য ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন ধান চাষীরা। কিন্তু বোরো ধানের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির মাত্রা অতটা না হওয়া সত্ত্বেও বাজারে সৃষ্টি হয়েছে চালের অভাব। জানা যায়, এই সংকটের পিছনে মূল ফাটকাবাজ হলেন ব্যবসায়ী এবং মিল মালিকেরা।

চালের বাজারে চলছে দুই ধরণের খেলা। প্রথমত, বাজারে যদি চাল সংকটের আভাস পাওয়া যায়, তখন তুলনামুলকভাবে স্বচ্ছল কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ১৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত চাল আটকে রাখেন,এবং মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পরে তা বিক্রি করেন। দ্বিতীয়ত, যেসকল বড় ব্যবসায়ী এবং মিল মালিকদের চাল মজুদ করার মত বড় গুদাম আছে, তারা চাল নিজেদের ইচ্ছামত আটকে রাখেন। তারপর বাজারে তাদের দ্বারাই তৈরি চালের অভাবকে কেন্দ্র করে মূল্য বৃদ্ধি করে দিয়ে তারপরে চাল বিক্রি করেন ক্রেতাদের কাছে।

পঞ্চগড়ের বদা উপজেলার মোঃ আশরাফুল নামের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, “মাঝে মাঝে আমি দুই বা তিন ট্রাক চাল বাজারে না পাঠিয়ে দুই-তিন সপ্তাহ নিজের কাছেই রেখে দেই। একেকটা ট্রাকে ৭৫ কেজি ওজনের ২০০ থেকে ২৫০টি বস্তা রাখা সম্ভব হয়। আমি এই চাল পরবর্তীতে দাম বাড়লে বিক্রি করে দেই”।

দিনাজপুর সদর উপজেলার মোহাব্বতপুর এলাকার ধান ব্যবসায়ী মজিবুর রহমান জানান যে, তার মতো ছোট ব্যবসায়ীরা মিল মালিকদের মতো দীর্ঘ সময় ধরে চাল মজুদ করে রাখতে পারেননা। তিনি আরো জানান যে, গত বছর বোরো ধানের মৌসুমে মিল মালিকেরা প্রচুর পরিমাণে বোরো ধান গুদামজাত করে রেখেছে। তারা এগুলোকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে চাল না বানিয়ে ধান হিসেবেই সংগ্রহ করে রেখেছে। আইন ফাকি দেওয়ার এটিই তাদের পন্থা। সুযোগ বুঝে তারা সেগুলো থেকে চাল তৈরি করবেন এবং চড়া মূল্যে বিক্রি করবেন।

দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও নওগাঁর সকল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অন্তত একটি ব্যাপারে একমত যে, সেখানকার বড় বড় রাইস মিলগুলোর মালিক ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা চাল মজুদ করার একটি সিন্ডিকেট দাড় করিয়ে ফেলেছে। তারা জানান, যখনই কোন মিল মালিকের কাছে মজুদ করার মতো কোন জায়গা তৈরি হচ্ছে, সেখানেই সে ও তার সহকারীরা মিলে ধান মজুদ করে রাখছে।

এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে যাওয়া হয়েছিল অভিযুক্ত সেসব রাইস মিলে। সেখানে সাংবাদিক পরিচয় না দিয়ে গবেষক হিসেবে পরিচয় দিলে তারা কথা বলতে রাজি হন। কারণ এই মুহুর্তে তারা কোন সাংবাদিককে তাদের গুদামঘরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না।

দিনাজপুর সদরের মাহমুদপুর এলাকায় ‘সারওয়ার অটোমেটিক রাইস মিল” নামের একটি কারখানায় গিয়ে দেখা গেল, সেখানে তাদের ধারণ ক্ষমতার চেয়েও প্রায় ৫০ মেট্রিক টন বেশি  ধান তারা মজুদ করে রেখেছে। এই ঘটনা মেনে নিয়ে মিলটির মালিক সারওয়ার সৈয়দ সোহেল জানান, এই ধানগুলো তার নিজের নয়। তিনি জানান এগুলো অন্য ব্যক্তিদের ধান, যা তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে প্রক্রিয়াকরনের জন্য। এক মাসের মধ্যে এগুলো চাল বানিয়ে যার যার ধান তার তার কাছে পৌছে দেওয়া হবে বলে দাবি করেন তিনি।

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার “মৌসুমী অটো রাইস মিল” এর শ্রমিকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, তারা গত বছর থেকে একটানা খেটেই চলেছেন প্রচুর ধান নিয়ে। তাদের মধ্যে একজন নারী শ্রমিক বলেন, “আমরা এখানে দিনমজুর হিসাবে কাজ করি। কিন্তু এখানে আমাদের একটানা কাজ করে যেতে হচ্ছে, সারা সপ্তাহ জুড়ে। আমাদের মাসে একদিনও ছুটি মিলছে না। সারা বছরে শুধু কার্তিক মাসে আমরা ছুটি পাই। আমন ধান কাটার সময়ের ঠিক আগে”।

তিনি আরো জানান, “বন্যার কারণে আশ্বিন মাসে আট থেকে দশদিন মিলের কাজ বন্ধ ছিল। সেই সময় ছাড়া বাকি সময়ে মিলে ধান আসার পরিমাণ স্বাভাবিকই ছিল”। কিন্তু তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় সেখানে উপস্থিত ঐ মিলের এক তত্ত্বাবধায়ক দাবি করেন, তাদের মিলে বেশিরভাগ ধান পঞ্চগড় থেকে নিয়ে আসা।

অথচ পঞ্চগড়ের ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের জিজ্ঞাসা করা হলে নওগাঁয় তাদের ধান পাঠানোর এমন কথাকে গুজব বলেই উড়িয়ে দিলেন। সেখানকার বদা উপজেলার সাখোয়া বাজারের হাফিজুর রহমান নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, “পঞ্চগড় আর নওগায় চালের দামের তেমন কোন পার্থক্য নেই। নওগাঁর মিল মালিকেরা যদি এখান থেকে চাল কেনে, তা কোন ভাবেই সাশ্রয়ী নয়। তাছাড়া, বাইরের জেলাগুলোতে বিক্রি করার সমান এত পরিমাণে চাল পঞ্চগড়ে উৎপাদন হয়নি এবার”।

বেশিরভাগ মিল মালিক ও তাদের কর্মীরা তাদের ধানের মজুদ সম্পর্কে তথ্য দিতে অস্বীকার করলেও, তাদের মাঝে কেউ কেউ পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন যে, মিল সচল রাখতে তারা কয়েক মাস পর্যন্ত ধান মজুদ করে রাখেন।

নওগাঁর রামভদ্রাপুরের “তসিরন অটোমেটিক রাইস মিল”-এর মালিক আনিসুর রহমান জানান যে, বোরো ধানের চেয়ে আমন ধানের উৎপাদন কম হয়। তাই রাইস মিলগুলোতে বোরো ধান মজুদ করে রাখা হয় যাতে সারা বছর যাবত মিলগুলো সচল থাকে।

সেখানকার রানীনগর উপজেলায় অবস্থিত “মফিজ উদ্দিন অটো রাইস মিল” এর মালিক তৌফিকুল ইসলাম স্বীকার করেছেন যে তার কাছে ছয় মাস আগে থেকে মজুদ করা বোরো ধান রয়েছে এখনো।

নওগাঁর কিছু কারখানায় এখনো কিছু চিনিগুড়া চালের মজুদ দেখা গিয়েছে। চিনিগুড়া চাল আমন ধান থেকে তৈরি অসিদ্ধ একটি চাল। আমন ধানের মৌসুমের আগে থেকে তাদের কাছে এই চাল থাকার একটিই মানে হতে পারে, তারা এগুলো মজুদ করে রেখেছেন বাজারে না পাঠিয়ে।

দিনাজপুরের খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, তাদের অভিযানের সময়ে তারা আটকে রাখা চালের গুদাম খুজে পেতে সক্ষম হননি। তারা আরো জানান, মন্ত্রীমহল থেকে মিল মালিকদের মাঝে আতংক সৃষ্টি না করারও নির্দেশ রয়েছে। তাছাড়া এতগুলো রাইস মিলে অভিযান চালানোর পর্যাপ্ত লোকবল নেই খাদ্য অধিদপ্তরের।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষনা ইন্সটিটিউটের কর্মকর্তা ড. আসাদুজ্জামান জানান যে, তিনি লক্ষ্য করেছেন বাংলাদেশে রাইস মিল বানানোর উপরে কিংবা সম্প্রসারনের উপর তেমন কোন আইন নেই। তিনি বলেন, “গত দশ বছরে বাংলাদেশে বৃহৎ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সব রাইস মিল তৈরি হয়েছে। সেসব মিলের ধারণক্ষমতার ৪০% খালি পড়ে থাকে। আর তাই প্রতি বছর উৎপাদিত ধানের একটি বড় অংশ গিয়ে জমা হচ্ছে সেখানে। তারা চাইলেই বাজারে চালের দামে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে”।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার রাইস মিল আছে যেখানে দেশের মোট উৎপাদিত ধানের ৬০% পাঠানো হয় চাল বানানো ও বাজারজাত করার জন্য। ২০০৫ সালে দেশে অটোমেটিক এবং সেমি-অটোমেটিক মিলিয়ে রাইস মিল ছিলো মাত্র ২০০ টি।

কৃষি মন্ত্রী মাতিয়া চৌধুরী বলেছেন, “তাদের মধ্যে (মিল মালিক) ধান মজুদ করে রাখার প্রবনতা বিদ্যমান। তাদের মধ্যে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী রয়েছে। অনেকেই মোটা চাল কেটে মিনিকেট বলে বাজারে বিক্রি করছে। আমরা আমাদের সাধ্য মত তাদের রুখতে চেষ্টা করছি। তাই বলে আপনারা কি চান যে আমি প্রতিটি কারখানায় পুলিশ পাঠিয়ে হয়রানি করি এবং অবশেষে একটি অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি হোক?”

পড়ুন প্রথম পর্ব: চালের মূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ী কারা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *