ঢাকায় ডাচদের উত্থান ও পতন

ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের কাছে ভারতীয় উপমহাদেশ চিরদিনই পরিচিত ছিল স্বর্গ হিসেবে। বহুকাল ধরে এই এলাকার সম্পদের প্রাচুর্য, বিশেষ করে এখানে প্রাপ্ত বিভিন্ন ধরণের মসলা আকৃষ্ট করেছে ইউরোপীয়দের। ১৫ শতকের দিকে এখানে আরব, ইরান ও চীনের সাথে এসে ব্যবসায় নাম লেখায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। সবার আগে এসেছিলো পর্তুগিজরা। তার প্রায় একশ বছর পরে এখানে ব্যবসা করতে আসে ডাচ ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশে আমরা ডাচদের ‘ওলন্দাজ’ বলে ডেকে থাকি। ১৬০২ সালে কিছু ডাচ ব্যবসায়ীরা এদেশে এসে ইউরোপের সাথে এদেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যপথ তৈরির স্বার্থে ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’ প্রতিষ্ঠা করেছিল।

ডাচেরা খুবই অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীর নানা প্রান্তে তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছে, বিশেষ করে পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিন আফ্রিকা অঞ্চলে। তারা বাংলার বুকে আসে ১৬০৭ সালে। তারও বেশ পরে অর্থাৎ ১৬৩৫ সালে মুঘল সুবেদারদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসার অনুমতি পেলে হুগলির চিন্সুরা নামের এক জায়গায় বসবাস ও ব্যবসা শুরু করে ডাচরা।

১৬২০ সালের দিকে পর্তুগিজদের মত কিছু ডাচরাও বাংলার উপকূলে ডাকাতি ও লুটের সাথে লিপ্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়। তা সত্ত্বেও করমণ্ডল (বর্তমান ভারতের কর্ণটক) এর ডাচ শাসকেরা বাংলায় তাদের বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য লোক পাঠায়। প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে একটির পর একটি ট্রেডিং পোস্ট গড়ে তুলতে থাকে তারা, যার মধ্যে একটি স্থান হলো ঢাকা।

ডাচরা প্রথম ঢাকায় এসেছিল ১৬৩৬ সালে। তবে সেই আগমন তাদের জন্য ছিল এক দুঃখজনক অভিজ্ঞতা। ডাচদের ছয় সদস্যের একটি দলের কূটনৈতিক কিছু মামলা সামলাতে ঢাকায় আসার কথা ছিল। কিন্তু হুগলি থেকে রওনা হওয়ার আগেই তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের গ্রেফতার করা হয়।

তারা ঢাকায় আসে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায়। পরে মুঘল আদালতে অবশ্য তারা মুক্তি পেয়েছিল, তবে সেই মুক্তির জন্য তৎকালীন নবাবকে দিতে হয়েছিলো দামী দামী সব উপহার। নিজেদের হাতকড়া খোলার জন্য কর্মকার আনা এবং তাদের যাতায়াতের খরচও বহন করতে হয়েছিল তাদেরকেই। তাছাড়া বাজেভাবে মারধরের ঘটনায় তাদের অনেকেই আহত ছিল, ফলে তাদের ডাক্তারের সেবাও নিতে হয়েছে, যা খরচ আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল।

সব মিলিয়ে অবস্থা প্রচন্ড প্রতিকূল হওয়ায় নৌকা কিনে মাঝি ভাড়া করে তারা হুগলীতে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে তাদের সেই সময়ে ১০০০ টাকার মতো খরচ হয়েছিল। সেই সময়ে এক হাজার টাকার মূল্য অনেক বেশি ছিলো। এই তিক্ত অভিজ্ঞতার মাঝে তাদের একমাত্র প্রাপ্তি ছিল ব্যবসা করার বিষয়ে নবাবের অনুমতি প্রাপ্তি।

তবে তখনও ঢাকায় কোনো বসতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি ডাচদের জন্য। এমনকি ঢাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য কোনো কেল্লাও মেলেনি তাদের। ১৬৬৬ সালে আবারও তারা ঢাকায় বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টা চালায়। সেইবার তারা রাজেন্দ্রলাল নামের নবাবের ঘনিষ্ট একজনের সাথে কথা বলে অনুকূল অবস্থা তৈরি করার ব্যাপারটি নিশ্চিত করে নেয়।

তাছাড়া বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য তারা গঙ্গারামকে নিয়োগ দেয় তাদের কারখানায়। তবে অতীতের তিক্ত অভজ্ঞতার কারণে তারা সেখানকার স্থানীয়দের পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিল না। ধীরে ধীরে তারা ঢাকায় তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে যা ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল।

ডাচদের কারখানা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। বর্তমানে যে জায়গায় মিটফোর্ড হাসপাতাল অবস্থিত, ঠিক ঐখানেই ছিলো কারখানাটি। কারখানার পাশাপাশি তাদের অফিসও ছিলো এটি। বর্তমানে ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হল এবং তেজতুরি বাজারের মাঝামাঝি কোন একটি জায়গায় তাদের একটি বাগানও ছিলো। মেজর রেনেল (১৭৮১) এর মানচিত্রে এসব জায়গার সন্ধান মেলে। ঢাকার ব্যবসার উপর সরাসরি নিয়ন্ত্রন ছিল তাদের হুগলীর বাণিজ্য কেন্দ্রের, যা কিনা আবার নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল করমন্ডলের অধীনে। আর তাদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমগ্র ব্যবসায়িক প্রকল্পের প্রধান কেন্দ্র ও অফিস অবস্থিত ছিলো বাটাভিয়া (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) এর জাকার্তায়।

ফ্রান্সের ফ্রান্সোয়া বার্নিয়ার নামের একজন ভ্রমণকারী ১৬৬৫-১৬৬৬ সালে ঢাকা ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি জানান যে, ঢাকা থেকে কাপড় রপ্তানীতে তখন ডাচদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। তারা সাধারণত ইউরোপ ও জাপানে কাপড় রপ্তানী করত। তাদের অন্য প্রধান রপ্তানীযোগ্য পণ্য ছিলো নাইটার বা শোরা। এটি বারুদ তৈরি করার অন্যতম প্রধান একটি উপকরণ। এই শোরা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যেত বিহারে, তাই সেখানে আরেকটি শোধনাগার নির্মান করে তারা। একই সময়ে ঢাকা ভ্রমণে আসা ফ্রান্সের জীন বাপ্তিস্তা তাভার্নিয়ার নামের একজন হীরা ব্যবসায়ী ডাচদের নির্মিত চমৎকার সব গুদামের কথা জানান।

বাংলায় অনেক ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ডাচেরা ছিল উদ্ভাবক ও অগ্রপথিক। এমনকি ১৭৪৬ সালে বাংলা থেকে আফিম রপ্তানীর অনুমতিও তারা পায় একচেটিয়াভাবে। কিন্তু সেই দশকেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তাদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা। প্রাধান্য অর্জন ও মুনাফার জন্য যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় ডাচ ও ইংরেজদের মধ্যে।

১৭৫৯ সালে চিনাসুরার যুদ্ধে ডাচরা ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হয়। প্রচন্ড শক্তিশালী হলেও শেষ পর্যন্ত ডাচ নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনী পরাজয় বরণ করে নেয় ব্রিটিশদের কাছে। এর মধ্যে পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) জয়ের মাধ্যমে বাংলায় ব্যবসা করতে আসা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোকেও কোণঠাসা করে ফেলেছিল ব্রিটিশরা। ফলে ডাচেরা আর কোনদিন তাদের পুরাতন রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক গৌরব ফিরে পেতে সক্ষম হয়নি। অবশ্য তারা ১৭৫৯ সাল পর্যন্ত এখানে অবস্থান করেছিল।

ঘটনাক্রমে ১৭৮১ সাল থেকে ১৭৮৩ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা ডাচদের সমস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র ও ট্রেড পোস্টগুলোর দখল নিয়ে নেয়। ঢাকার বাণিজ্য কেন্দ্রটি তারা বাগিয়ে নেয় ১৭৮১ সালে। সেই সাথে তাদের দখলে চলে যায় ফার্মগেটের সেই বাগানও। ১৮০১ সালে একজন ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের সহায়তায় ডাচদের বাণিজ্যিক অফিসটি গুড়িয়ে দেয়। সেই ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত পাথর শহরের রাস্তা মেরামতের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।

কর্তৃপক্ষ ১৮১০ সালে সেই জায়গায় একটি হাসপাতাল নির্মানের প্রস্তাব দিলে সেখানে মিটফোর্ড হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছিল। অবশেষে ১৮২৪ সালে ডাচ সরকার তাদের সমস্ত সম্পত্তি ব্রিটিশদের নামে লিখে দিয়ে এক শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। সেখানে বলা হয়, ১৮২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে ডাচরা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যাবে।

ব্রিটিশদের কারণে সেই সময়ে নির্মিত কোন ডাচ গুদাম কিংবা অফিসের অস্তিত্ব আর নেই। শতাধিক বছর পুরাতন অসাধারণ সব ভবন ভেঙ্গে তার ধ্বংসাবশেষ দিয়ে রাস্তা মেরামত করেছিলো তারা। ফার্মগেটের বাগানটিও আর রাখা হয়নি। ঢাকায় ডাচদের স্মৃতি বলতে এখন শুধুই দয়েছে ডাচ কারখানার প্রধান জনাব লাংখিত-এর কবর যা নারিন্দাতে একটি খ্রিস্টান কবরস্থানে অবস্থিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*