ধান ছেড়ে ফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন চাষীরা

ফসলের ক্ষতি এবং স্বল্প লাভের কারণে অনেক চাষী ধান চাষ থেকে সরে আসছেন। মোটা চালের ধান চাষে খুব একটা লাভের দেখা না পাওয়ায় তারা চিকন চালের চাষে মনোযোগ দিচ্ছেন। অনেকে আবার শুরু করছেন ফলের বাগান। ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত ধান বিষয়ক একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ তৃতীয় ও শেষ পর্বটি তুলে ধরা হলোঃ

গত বছরের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের সময়ে হওয়া বন্যার পানি কবে নামবে তার উপর নির্ভর করে বসে থাকতে হয়েছে নওগাঁর ধান চাষীদের। আর তাই কম সময়ে কি ধরনের চাল উৎপাদনে মন দেওয়া যায়, এই প্রশ্নের একমাত্র উত্তর ছিলো চিনিগুড়া। স্বর্নার বদলে তাই অনেক চাষী গত বছর চিনিগুড়া চাষে মন দিয়েছিলেন।

মহাদেবপুর উপজেলার ললবল গ্রামের মোঃ রব্বানী তার নিজ জমিতে ফলানো চিনিগুড়া চালের মান যাচাই করছিলেন গত ডিসেম্বরের ২ তারিখে। তিনি জানান, তার গ্রামের প্রায় অর্ধেক কৃষকই গত মৌসুমে চিনিগুড়া চালের চাষে যোগ দিয়েছেন। তার পাশের বাগ্ধানা গ্রামের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন চাষীই ঝুকেছেন এই চাল চাষের দিকে।

রব্বানী বলেন, “সাধারনত স্বর্না চাষ করলে প্রতি বিঘায় ১৮-২০ মণ চাল হয়, আর পাইজাম চাষ করলে বিঘাপ্রতি পাওয়া যায় ১৫-১৬ মণ। কিন্তু এই বছর বন্যার কারণে এসব ক্ষেত্রে প্রতি বিঘায় কমপক্ষে ৫ মণ চাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে চিনিগুড়া চাল ফলাতে পেরেছে, তারা এই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পেরেছে”। তিনি আরো বলেন, “এই ধরণের আতপ (সিদ্ধ না করা) চালের উৎপাদনের ক্ষেত্রে বীজের দাম এবং সারের খরচ বেশ কম। এক বিঘা জমিতে মাত্র দুই কেজি বীজ বপন করলে তা থেকে ১৯ মণ ধান পাওয়া সম্ভব।“

চিনিগুড়া চাষ করলে স্বল্প সময়েই তা কাটা সম্ভব হয় বলে সেসব কৃষকেরা বছরে যেখানে আগে দুই ধরনের ফসলের চাষ করতেন সেখানে এখন দিন ধরনের ফসল ফলানোতে মন দিতে পারেন। যদিও এই ক্ষেত্রে ফলন খুব বেশি হয়না, তবু প্রতি মণ ১,৩০০ থেকে ১,৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয় বলে ক্ষতি হয়না কৃষকের।

সাপাহার উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেলো আরেকটি ভিন্ন চিত্র। রাস্তার পাশের জমিগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে আমবাগান। স্থানীয়রা জানালেন, তিন বছর আগেও যা ছিলো ধানক্ষেত, তা আজ আমবাগানে পরিনত করা হয়েছে।

এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বেশ নিচে নেমে গিয়েছে। অনেক চাষীর নেই সেচ এর ব্যবস্থা করার সামর্থ। আম গাছের যেহেতু খুব বেশি পানির প্রয়োজন হয়না, তাই ধান চাষীরা তাদের জমিকে আমবাগানে রুপান্তরিত করে ফেলেছেন।

সাপাহার বাজারের আমবাগান মালিক মোঃ মজুমদার বলেন, “আম চাষে কোন ক্ষতি নাই। আম গাছ লাগানোর এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে সেখান থেকে লাভ আসতে শুরু করে। প্রতি বিঘা জমির ধান থেকে যেখানে ৪০০০-৫০০০ টাকা আয় হতো, সেখানে একই মাপের জমি থেকে আম চাষে আসে ৭০,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা”।

কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ (ডিএই) তে থাকা একটি তথ্য তালিকায় দেখা যায়, নওগায় বোরো ধানের মৌসুমে ধান চাষ হয়েছিলো ৬,২৮০ হেক্টর জমিতে, যা পাঁচ বছর আগেও ছিলো ১০,২০০ হেক্টর।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারন বিভাগের সহকারী পরিচালক মনোজিত কুমার জানিয়েছেন, কৃষকেরা ধান চাষ করে খুব একটা লাভবান হতে না পারায় ক্রমেই সেখান থেকে সরে আসছেন। তিনি বলেন, “হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করলে তাদের ফলন বেশ ভালোই হয়। কিন্তু ফলন বেশি হলে বাজারমূল্য কমে যায়। তাই অনেক চাষী এখন এর বিকল্প খুজছেন। অনেকেই ধান চাষ ছেড়ে ঝুকেছেন আম গাছ বপনের দিকে। অনেকে আবার বড় পরিসরে সবজির চাষ করছেন। অনেক কৃষক সম্পূর্নভাবেই সরে গিয়েছেন চাষাবাদ থেকে এবং অন্য কোন পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তারা তাদের জমি বিক্রি করে দিয়েছেন”।

নওগাঁ সদর উপজেলার বালিয়াগাড়ি গ্রামের জাকির হোসেন কয়েক বছর আগেও পুরোদমে চাষী ছিলেন। কিন্তু ক্ষতির পুনরাবৃত্তি দেখে বাধ্য হয়ে চাষাবাদ ছেড়ে বেছে নিয়েছেন নতুন পেশা। তিনি তার এলাকায় এখন একটি সারের দোকান চালান। তিনি বলেন, “ধান চাষ করতে গিয়ে আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন আমি আমার সারের ব্যবসার পিছনেই আমার সময় ও অর্থ ব্যয় করছি। অবশ্য স্বল্প পরিসরে এখনো ধান চাষ করি আমি”।

পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব: চাল সংকটের অন্যতম কারণ মজুদকরণ

পড়ুন প্রথম পর্ব: চালের মূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ী কারা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *