জানেন কি? গরমে গাছেরাও ঘামে!

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমেই উষ্ণ হয়ে উঠছে পৃথিবী। বিশ্বজুড়ে দেখা যাচ্ছে নানাবিধ আশঙ্কাজনক পরিবর্তন। তীব্র দাবদাহ, খরা, অতিবৃষ্টি, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রাণীকুল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছে না গাছেরাও। এখন জানা যাচ্ছে অতিরিক্ত দাবদাহের সময় নাকি গাছেরা ঘামও ঝরায়। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় গাছ নিয়ে গবেষনারত বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, প্রচন্ড তাপ থেকে বাচার জন্য গাছের পাতা থেকে ঘাম নির্গত হয়।

এক বছরব্যাপী পরিচালিত এক গবেষনায় দেখা যায়, তীব্র গরমে গাছেরা আত্মরক্ষার্থে তাদের পাতা থেকে পানি নির্গত করে, যা বাষ্পীভূত হয়ে এক শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। গাছ মাঝেমাঝে তার সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া প্রয়োজনে বন্ধ রেখে শীতলীকরণে মন দেয়।

আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন সালোকসংশ্লেষণ এবং স্বেদন (পানি বা বাষ্প নির্গমনের এক প্রক্রিয়া) পরষ্পর নির্ভরশীল দুটি কর্মকান্ড। অর্থাৎ একটি না হলে অপরটি সম্ভব নয়। কিন্তু এই গবেষনার পরে দেখা গেলো যে, এই স্বেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলে গাছকে সালোকসংশ্লেষণ থেকে বিরত থাকতে হয়।

সিডনীর হকসব্যারী ইন্সটিটিউটের অধাপক মার্ক জোয়েলকার এই গবেষনার অন্যতম একজন সদস্য। এই গবেষনার ফলাফল এই মাসের ‘গ্লোবাল চেইঞ্জ বায়োলজি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

জোয়েলকার জানান এই আবিষ্কার আসন্ন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, কারন এ থেকে জানা যায় যে আবহাওয়া অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে গেলে গাছ আর কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করবেনা। ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়বে, এমন অনুমানের ফলে এই নতুন আবিষ্কার জন্ম দিয়েছে উদ্বেগের।

জোয়েলকার বলেন, “যদি একটি বড় এলাকাজুড়ে তাপপ্রবাহ শুরু হয়, তাহলে সেই এলাকার বনাঞ্চল তুলনামূলকভাবে খুবই কম কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করবে। মাত্রাতিরিক্ত তাপপ্রবাহ এই প্রাকৃতিক কার্বন নিয়ন্ত্রকদের পঙ্গু করে দেবে”।

২০১৭ সালে নিউ সাউথ ওয়েলস এবং কুইন্সল্যান্ডে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে গত বছর অস্ট্রেলিয়ার তাপমাত্রা ছিলো দেশটির ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। অস্ট্রেলিয়ার সর্বাধিক তাপমাত্রার বছরগুলোর ১০টি বছরের মধ্যে ৭টিই ঘটেছে ২০০৫ সাল থেকে বর্তমান সময়ের মধ্যে।

এ গবেষনায় আরো দেখা যায়, গড়ে ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বেড়ে ওঠা গাছগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় খাপ খাইয়ে বেচে থাকতে সক্ষম নয়। এই গবেষনার কাজে পূর্নাঙ্গ ট্রি ক্যাপসুল ব্যবহৃত হয়েছে। ৯ মিটার এই ক্যাপসুলগুলো হলো কতিপয় তাপমাত্রা ও আবহাওয়া নিয়ন্ত্রনকারী চেম্বার, যা কিছুটা স্পেসশিপ ও গ্রীনহাউজের মাঝামাঝি কিছুর মতো দেখতে। স্থানীয়রা এগুলোর নাম দিয়েছে “কোকের বোতল”। এসব ক্যাপসুলের প্রত্যেকটিতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি করে পারামাত্তা রেড গাম (বৈজ্ঞানিক নাম (Eucalyptus parramattensis ) রোপন করা হয়েছিলো। এই জাতের গাছগুলো ঐ এলাকায় বিলুপ্তির পথে।

এই ক্যাপসুলগুলোর মধ্যে ৬টিতে ছিলো স্বাভাবিক তাপমাত্রা। আর বাকি ৬টিতে অস্ট্রেলিয়ার আগামী এক শত বছরে আসন্ন জলবায়ু পরিবর্তনের অনুমানসাপেক্ষে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট তাপমাত্রার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিলো।দেখা গেলো, তুলনামূলকভাবে উষ্ণতর গাছগুলো অন্যান্য গাছের তুলনায় ৩০% দ্রুত বড় হয়। মাত্র দুই বছরেই এগুলো ৬ মিটার উচ্চতা লাভ করে।

গবেষণার ১২ মাসের মাথায় গাছগুলোকে রাখা হলো কৃত্রিমভাবে তৈরি এক দাবদাহ পরিস্থিতিতে। সে সময়ে ক্যাপসুলের তাপমাত্রা প্রায় ৪৩ ডিগ্রী সে. রাখা হয়েছিলো এবং গাছগুলোকে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা হয়নি,সত্যিকারের দাবদাহ পরিস্থিতিতে যেরকম হতে পারে, অনেকটা সেরকমই।

এই দাবদাহের প্রক্রিয়া শুরু করা হলে দেখা যেত, সকল ক্যাপসুলগুলোতে রাখা গাছগুলোই চেষ্টা করেছে নিজেদের শীতল করার। আর সে সময়ে সবগুলোর সালোকসংশ্লেষণ একেবারেই থেমে গিয়েছিলো। তারা কার্বন গ্রহন থামিয়ে পানি নিঃসরণ চালিয়ে যেতে লাগলো। গাছদের এই শীতলীরণ প্রক্রিয়া একেবারে মানুষের ঘেমে ওঠার মতই অনেকটা।

ভবিষ্যতে আরো ভিন্ন প্রজাতির গাছগুলোর মধ্যে আরো বড় পরিসরে এই গবেষনা করা হবে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। এই প্রক্রিয়াতে গাছেরা আরো দীর্ঘমেয়াদী তাপপ্রবাহ সামলাতে পারে কিনা কিংবা পানি ফুরিয়ে গেলে তখন গাছেরা কি করে সেই দিকগুলোই গবেষনা করে দেখা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *