কেন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এই ফেসবুক মডারেটর?

ফেসবুকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রকমের আপত্তিকর পোস্ট দিয়ে থাকেন ব্যবহারকারীরা। যে পোস্টগুলো দেখলে অনেকেই মানসিকভাবে অসুস্থ বোধ করতে পারেন। আর সেই যন্ত্রণা থেকে যে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা মুক্ত থাকেন, সেজন্য ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে ফেসবুক মডারেটরদের। নানাবিধ আপত্তিকর পোস্ট অপসারণের কাজটি করতে হয় তাদের। আর সেটি করতে গিয়ে অনেকেই পার করেন দুঃসহ সময়। অসুস্থ বোধ করেন মানসিকভাবে। ফেসবুক মডারেটর হিসেবে ৮ মাস কাজ করা এক নারীর অভিজ্ঞতা থাকছে আজকের এই প্রতিবেদনে।

সারাহ ক্যাটজ ২০১৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি সংস্থায় যোগ দিয়েছিলেন ফেসবুক মডারেটর হিসেবে। তার কাজ ছিল ফেসবুক ব্যবহারকারীরা কোন বিষয় নিয়ে অভিযোগ করলে তা যাচাই করে দেখা। সেই অভিজ্ঞতার কথাই তিনি জানিয়েছেন বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে।

“বেশিরভাগ সময়েই অভিযোগ আসতো পর্নোগ্রাফী নিয়ে”, জানালেন সারাহ, “আমি যে তৃতীয় পক্ষের সংস্থাটিতে কাজ করতাম, তারা খুব কঠোরভাবে ফেসবুকে আমরা কি দেখতে পাবো তা যাচাই করতে সক্রিয় থাকতে বলতেন। আক্রমণাত্মক এবং দৃষ্টিকটু সব কিছু সরিয়ে ফেলার দায়িত্ব ছিলো আমাদের”।

সারাহ বলেন, “সংস্থা থেকে আমাদের প্রতিটি পোস্ট যাচাই করতে এক মিনিট সময় দেওয়া হতো। এক মিনিটের মাঝে দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হতো কন্টেন্টগুলো হয়রানীমূলক কিনা এবং তা সরিয়ে ফেলা উচিত কিনা।মাঝেমাঝে কন্টেন্টের পাশাপাশি যে সেগুলো প্রকাশ করেছে তার একাউন্টও বন্ধ করে দেওয়া হয়।“

তিনি জানান, সংস্থার ব্যবস্থাপকেরা চাইতেন না তারা দিনে আট ঘন্টার বেশি কাজ করুক। দিনে তাদের প্রায় ৮,০০০ টি পোস্ট পরীক্ষা করে দেখতে হয়, ফলে ঘন্টায় প্রায় এক হাজারটি যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করতে হয় তাদের। সারাহ নিজেও এই কাজকে যথেষ্ট শ্রমসাধ্য বলেছেন। তবে অতিরিক্ত পরিশ্রমই একমাত্র সমস্যা ছিল না তার আট মাস মেয়াদী চাকরী জীবনে। তার সাথে হাজার হাজার পোস্টের মাঝে দেখতে হয়েছে এমন সব জিনিস, যা সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষের জন্য সহ্য করা কঠিন।

অবৈধ ছবি

এ প্রসঙ্গে সারাহ বলেন, “মাত্র একটি ক্লিক করেই আপনাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে যে কোনো কিছু দেখার জন্য। কারণ আপনার সামনে আসলে কি আসতে যাচ্ছে তা আপনি জানেন না। যে কোন কিছুই হতে পারে এটি। কোন রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই এক ভয়ংকর ছবি বা ভিডিও আপনার মস্তিষ্কে আঘাত হানতে পারে। এর মধ্যে একটি বিষয় আমাকে অনেক বেশি নাড়া দিয়েছিলো, আর তা হলো শিশুদের পর্নোগ্রাফীর একটি ছবি। দুটি শিশু, ছেলেটি মনে হয় ১২ বছরের, আর মেয়েটি আট কিংবা নয়, দাড়িয়েছিল মুখোমুখি। তাদের পরনে কোন কাপড় ছিলনা এবং তারা একে অপরকে অপ্রীতিকরভাবে ছুয়ে দিচ্ছিল। দেখে বোঝা যাচ্ছিলো যে ক্যামেরার দ্বায়িত্বে থাকা প্রাপ্তবয়ষ্ক কেউ তাদের শিখিয়ে দিচ্ছিল কি কি করতে হবে। ছবিটি খুবই গোলমেলে, কারণ এটি কেউ মজা করে নয়, সত্যি সত্যিই করেছে”।

বারবার আবির্ভাব হওয়া পোস্ট

কিছু কিছু অশোভন পোস্ট ঘুরেফিরে বারবার আসতে থাকে ফেসবুক জুড়ে। মুছে দিলেও প্রতিদিন এগুলো ছয়-সাতজন ব্যবহারকারীর মাধ্যমে বারবার ফিরে আসতে থাকে। তাই এইসব পোস্টের আসল সূত্র খুজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

চিত্রানুগ সহিংসতা

ফেসবুকের একজন মডারেটর সহিংস চিত্র বা গ্রাফিক ভায়োলেন্সের সাথে পরিচিত হয়ে যান খুব অল্পদিনেই। তার মানে এই নয় যে এগুলো এক পর্যায়ে ভালো লাগতে শুরু করে, এর মানে হলো বারবার বিশ্রী সব ছবি দেখতে দেখতে এক ধরণের সহনশীলতার জায়গা তৈরি হয় মনের মাঝে।

সারাহ বলেন, “প্রাপ্তবয়োষ্কদের পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত প্রচুর পোস্ট আসে, সেগুলো আর তেমন গায়ে লাগেনা আমাদের। কিন্তু তার সাথে আরো আসে পাশবিকতা। একটি ছবি দেখেছিলাম যেখানে দেখা যায় একজন নারীর দেহ যার মাথা থেতলে ফেলা হয়েছে। তার শরীরের অর্ধেকটা ছিলো মেঝেতা, আর উপরের অংশ চেয়ারের উপরেই ছিলো। আমাদের অবশ্য চিত্রানুগ সহিংসতার চেয়ে পর্নোগ্রাফি ঠেকানোর দিকেই বেশি জোর দিতে বলতেন উর্ধ্বতনেরা”।

মিথ্যা সংবাদ

ফেসবুকের পাতায় পাতায় মিথ্যা সংবাদ যেন স্বাভাবিক একটি ঘটনা হয়ে গিয়েছে দিনে দিনে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ে এই মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদের প্রচারনা ছিলো তুঙ্গে। সারাহ বলেন, “আমরা দেখতাম ব্যবহারকারীরা নানা ধরনের খবর শেয়ার করছে প্রতিদিন। এগুলোর সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ে অবশ্য আমাদের কর্মকর্তারা তেমন গুরুত্ব দিতেন না। প্রতিটি খবরের লিংক ক্লিক করে দেখার মতো সময় আমাদের থাকেনা।“

সারাহ’র সাক্ষাৎকার নিয়ে ফেসবুকের প্রতিক্রিয়া

সারাহ-র সাক্ষাৎকারটি বিবিসি তাদের ফেসবুক পাতায় প্রকাশ করেছিলো। এর প্রত্যুত্তরে ফেসবুকের একজন মুখপাত্র বলেন, “ফেসবুককে একটি মুক্ত ও নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের মডারেটরেরা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। কাজটি বেশ কঠিন এবং আমরা চাই যারা এত খাটনি করছেন তাদের যেন পর্যাপ্ত সহায়তা দেওয়া হয়। আর সেজন্যেই কর্মীদের আমরা নিয়মিত ট্রেনিং, পরামর্শ এবং মানসিক সমর্থন দিয়ে থাকি”।

তিনি আরো বলেন, “যেখানে সম্ভব সেই জায়গাগুলোতে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করে থাকি। তার পরেও ফেসবুকের কন্টেন্ট যাচাই করতে প্রায় ৭,০০০ মানুষ নিয়োজিত রয়েছে। আমাদের প্লাটফর্মটা যেন ভালো থাকে সেদিকেই প্রাধান্য দেই আমরা”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*