ফেসবুকের বিবর্তন: ১৪ বছরে যেভাবে বদলে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি

গত ৪ ফেব্রুয়ারি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক পার করেছে তার এগিয়ে চলার ১৪তম বছর। এই মাধ্যমটি মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে আরও অনেক কিছু। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ হয়ে উঠেছেন অনেক তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তার অনুপ্রেরনা। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই যোগাযোগ মাধ্যমটির পথচলা অবশ্য পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। অনেক বাধা, সমালোচনা আর তর্কবিতর্কের অধ্যায় পাড়ি দিয়ে এই পর্যায়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বড় বড় সব মালিকানা অধিগ্রহন থেকে শুরু করে নতুন সব প্রযুক্তির উম্মোচন, সব মিলিয়ে ফেসবুকের ১৪ বছরের এই পথচলায় উল্লেখযোগ্য ঘটনার সংখ্যা কম নয়। চলুন দেখে নেওয়া যাক এর আগের ১৩ বছরে ফেসবুকের বিবর্তনের বৃহত্তম সব ঘটনাগুলোঃ

২০০৪: শুরু

ফেসবুকের সূচনা আসলে জুকারবার্গের ২০০৩ সালে তৈরি ‘ফেসম্যাশ’ এর মাধ্যমে। এটিই কিছু পরিবর্তনের পরে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জুকারবার্গ “দ্য ফেসবুক” হিসেবে চালু করেন। তখন এটি কেবলমাত্র হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো। ব্যবহারকারীরা নিজেদের ছবি সম্বলিত প্রোফাইল তৈরি করতে পারতেন এখানে। তবে পরবর্তীতে এর নাম থেকে “দ্য” অংশটি বাদ দেওয়া হয়।

২০০৫: ফেসবুকে ছবির শুরু

২০১৭ সালে ফেসবুকে আপলোড করা ছবির সংখ্যা ১০০ বিলিয়ন পার করেছে। এই ছবি শেয়ারিং-এর সুবিধার শুরুটা হয়েছিলো ২০০৫ সালে। তখন থেকেই তা সবার কাছে একটি অতি জনপ্রিয় বিষয় হয়ে ওঠে। বন্ধুদের সাথে ছবির মাধ্যমে মুহুর্ত ভাগাভাগি করার বিষয়টি যেন এক নতুন যুগের সূচনা করে ঐ সময়ে। ২০০৫ সালের অক্টোবর মাসে ফেসবুক হয়ে যায় পৃথিবীর প্রথম ওয়েবসাইট যেখানে ছবি দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোন জায়গার সীমাবদ্ধতা নেই, অর্থাৎ যত ইচ্ছা তত ছবি আপলোড করা যাবে এমন ঘোষনা প্রথমবারের মতো ফেসবুকই দিয়েছিল। একই বছরের ডিসেম্বরে ছবিতে ট্যাগ করার সুবিধাও সংযোজন করে প্রতিষ্ঠানটি। এর পর আর তাদের ফিরে তাকাতে হয়নি। শুরু হয় ফেসবুক ছবির জয়যাত্রা।

২০০৬: পৃথিবীকে একত্রিত করা

২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বে যোগাযোগের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, কারণ ফেসবুক তখন উম্মুক্ত করে দেওয়া হয় বিশ্বের সবার জন্য। ১৩ বছরের উর্ধ্বে যাদের বয়স, তারা সকলেই এর ব্যবহারকারী হতে পারবেন বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

২০০৭: ফেসবুক এলো মোবাইল ফোনে!

মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকায় ফেসবুক ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে চালু করে তাদের মোবাইল বান্ধব m.facebook.com ঠিকানার সাইটটি। এর সাথে সাথে এসএমএস ও এমএমএস সুবিধা ব্যবহার করেও ফেসবুকে ছবি ও নোট লেখার ব্যবস্থা চালু করা হয়।

২০০৮: ফেসবুকের পুনঃআবিষ্কার

ব্যবহারকারী বাড়তে থাকার এক পর্যায়ে ফেসবুকের ওয়েবসাইটের ডিজাইন ও ব্যবহারের স্বাচ্ছন্দ নিয়ে কথা উঠলো। এসব মাথায় নিয়ে ২০০৮ সালের জুলাই মাসে ফেসবুক তাদের সম্পূর্ণ ওয়েবসাইটটি নতুন করে ডিজাইন করে ফেলে। তার সাথে যুক্ত করা হয় ব্যবহারকারীদের জন্য “ওয়াল” । আর তার সাথে ট্যাব সুবিধা সংযোজন করে দেওয়া হয় যাতে ব্যবহারকারীরা আলাদা আলাদা বিষয় খুলে স্বাচ্ছন্দে ঘেটে দেখতে পারেন। সেসময় প্রাথমিক ভাবে করলেও পরে সেপ্টেম্বর মাসে তা সবার জন্য উম্মুক্ত করা হয়।

২০০৯: টাকা, টাকা আর টাকা!

 ফেসবুকের জন্মের ৫ বছর পরে মার্ক জুকারবার্গ ঘোষনা দিলেন, তার এই মাধ্যমটি যা খরচ করেছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সেই সাথে একই বছর ফেসবুকের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩০০ মিলিয়ন পার হয়ে যায়। অর্থের গাড়ি সচল থাকা আর ব্যবহারকারীদের আগ্রহ, সব মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, প্রযুক্তি দুনিয়ায় টিকে যাবে ফেসবুক।

২০১০: মন্তব্য করতে আলসেমী হচ্ছে? লাইক করে পাশে থাকুন!

আজকের দিনে ফেসবুকে লাইক করা খুব সাধারন একটা ব্যাপার। অথচ আজ থেকে ১০ বছর আগেও এই সুবিধাটি ছিলনা ফেসবুকে। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করলেও ২০১০ সালের জুন মাসে এই সুবিধা সকল ব্যবহারকারীর জন্য উম্মুক্ত করা হয়।

২০১১: এসে গেলো মেসেঞ্জার

২০১১ সালের আগ পর্যন্ত ফেসবুকে কারো সাথে মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগ করা একটু খাটনির কাজ ছিলো বটে। এসএমএস এবং অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমকে টেক্কা দিতে তাই ফেসবুক শুরু করলো নতুন এক ব্যবস্থা-মেসেঞ্জার। আগেস্টে তারা অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস প্ল্যাটফর্মের জন্য মেসেঞ্জার নামে একটি আলাদা অ্যাপ চালু করে যা শুরু থেকেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

২০১২: বহুল প্রতিক্ষিত আইপিও

বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফেসবুক অবশেষে নিজেকে পাবলিক কোম্পানী লিমিটেড হিসেবে ঘোষনা করে। এ ঘোষনা দেওয়া হয় ২০১২ সালের মে মাসের ১২ তারিখে। তখন ফেসবুকের একখানা আইপিও শেয়ারের মূল্য ছিলো ৩৮ ডলার। এর পরে কোম্পানীটির মূল্য গিয়ে দাঁড়ায় ১০৪ বিলিয়ন ডলারে। নতুন কোন ওয়েবসাইটের ইতিহাসে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে মূল্যবান প্রতিষ্ঠান।

২০১৩: হ্যাশট্যাগ উম্মাদনায় সরব ফেসবুকও

২০১২ সালের এপ্রিল মাসে ফেসবুক ১ বিলিয়ন ডলার দিয়ে কিনে নেয় ইন্সটাগ্রাম। ইন্সটাগ্রামের হ্যাশট্যাগ ব্যবহারের জনপ্রিয়তা এবং টুইটারের সাথে প্রতিযোগিতায় তাল মেলানোর জন্য ফেসবুকেও হ্যাশট্যাগের ব্যবহার জরুরী হয়ে পড়লো। আর তাই ২০১৩ সালের জুন মাসে এটি যুক্ত করা হয় তাদের ওয়েবসাইটে। প্রাথমিকভাবে কম্পিউটার সাইটে থাকলেও দ্রুত তা তাদের মোবাইল সাইট আর অ্যাপ-এ অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হয়।

২০১৪: দৃঢ় সব নতুন পদক্ষেপ

ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই বুদ্ধিমানের কাজ- এই বাণীটির সত্যতা রক্ষাই যেনো মার্ক জুকারবার্গের জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য। তিনি সব সময়ই চোখ-কান খোলা রেখে এসেছেন নতুন সব বড় প্রযুক্তির দিকে। যখন প্রথমবারের মতো ভার্চুয়াল রিয়ালিটি এর আভাস দেখা দিলো, বিশেষ করে অকুলাস নামের সংস্থা যখন এটি নিয়ে কাজ করতে লাগলো, সবাই একটি কথাই ভাবছিলেন, তা হলো কবে মার্ক জুকারবার্গ এটির মালিকানা নিজের করে নেবেন। তাই হলো, ২০১৪ সালের মার্চ মাসে ফেসবুক কিনে নিলো ওকুলাস ভিআর। আর সাথে নিয়ে নিলো যোগাযোগের আরেক মহারথী হোয়াটসঅ্যাপ-এর মালিকানাও। এখন পর্যন্ত নিজেদের সবচেয়ে ব্যয়বহুল চুক্তি ছিলো এই দুটি ক্রয়। এখানে ফেসবুককে গুনতে হয়েছে ১৯ বিলিয়ন ডলার।

২০১৫: বিলিয়ন সক্রিয় ব্যবহারকারীর মাইলফলক

ইন্টারনেটে প্রতিযোগীর সংখ্যা বাড়লেও ফেসবুকে মানুষের যোগদানের ধারা অব্যাহতই থেকে গেলো। ২০১২ সালের অক্টোবরে ফেসবুকের মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা যেখানে ছিলো ১ বিলিয়ন, ২০১৫ সালের আগস্ট মাস নাগাদ দেখা গেলো, একদিনে ফেসবুকের সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যাই তাই। এই সংখ্যাই প্রমান করে সোশাল মিডিয়া হিসেবে ফেসবুকের দাপট কতখানি।

২০১৬: ফেসবুক এখন সরাসরি সম্প্রচারের আরেক মাধ্যম

নতুন কিছু দিয়ে ব্যবহারকারীদের মন জয় করার জন্য সবসময়ই সচেষ্ট থেকেছে ফেসবুক। ভিডিওর ক্ষেত্রে একক ক্ষমতার অধিকারী ইউটিউবের সাথে কিভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায়, তার সমাধান দিতে গিয়ে ফেসবুক ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে চালু করে লাইভ সুবিধা। ব্যবহারকারীরা নিজেদের দৈনন্দিন উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো লাইভে সম্প্রচার করার সুবিধা পেতে শুরু করেন। জনপ্রিয়তার তোড় দেখে ২০১৬ সালের মার্চ মাসে এই সুবিধা সব ব্যবহারকারীর জন্য উম্মুক্ত করা হয়।

২০১৭: ভবিষ্যতের অপর নাম এআর

২০১৬ সালে “পোকেমন গো” নামের মোবাইল গেমটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উম্মাদনা দেখে প্রযুক্তি জগতের হর্তাকর্তারা বেশ অবাকই হয়েছিলেন। তার পর থেকেই অগমেন্টেড রিয়ালিটি বা এআর এর দিকে ঝুঁকেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। সেই নৌকাতে ফেসবুক চেপে বসে ২০১৭ সালের এপ্রিলে। তারা চালু করে নিজেদের ফেসবুক এআর স্টুডিও। এর সহায়তায় থার্ড পার্টি কোন ডেভলপারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা মেসেঞ্জার ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এআর ইফেক্ট দিয়ে কন্টেন্ট বানাতে সক্ষম হন।

পরিশেষে, ফেসবুকের মাত্র ১৪ বছরের অর্জনের থলিতে এত বেশি কিছু রয়েছে, বলার অপেক্ষা রাখেনা তারা এগিয়ে যাবে আরো অনেক দূর। মার্ক জুকারবার্গ তার ২০১৮ সালের নতুন বছরের রেজোল্যুশন হিসেবে বলেছেন, তিনি তার ব্যবহারকারীদের জন্য ফেসবুককে ঠিকঠাক করে আরো সহজ ও নিরাপদ একটি মাধ্যম হিসাবে উপস্থাপন করতে চান। তবে কি আবারো পরিবর্তন হতে যাচ্ছে ফেসবুকের চেহারা আর ব্যবহারবিধি? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছু মাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *