কেপটাউনের মতো জলশুন্য হতে পারে যে ১১টি শহর

আধুনিক যুগে খাবার পানি সংকটে পড়তে যাওয়া প্রথম শহর হতে চলেছে আফ্রিকার কেপটাউন। এই শহরের এই পরিনতি যেন বিশেষজ্ঞদের অনেক আগে থেকে দিয়ে আসা জলের অভাবের সতর্কতারই বাস্তব রূপ।

আমরা জানি যে পৃথিবীর ৭০ ভাগই পানি। কিন্তু এই পানির মধ্যে পান করার যোগ্য পানি কিন্তু মাত্র ৩ ভাগ। ২০১৪ সালে পৃথিবীর বৃহত্তম ৫০০টি শহরের উপরে একটি জরিপ করে জানা যায়, প্রতি ৪টির মধ্যে ১টি শহর রয়েছে পানিশূন্যতার ঝুঁকিতে। বর্তমানে প্রায় ১ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ পানি স্বল্পতার শিকার। এবং আরো ২.৭ বিলিয়ন মানুষকে বছরে অন্তত এক মাস ভুগতে হচ্ছে পানির অভাবে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষের চাহিদা ও জনসংখ্যে বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী পানির চাহিদা আরও ৪০% বেড়ে যাবে। তখন জলশূন্য হওয়ার ঘটনা যেন খুব স্বাভাবিকই মনে হবে সবার কাছে। কেপ টাউন দিয়ে সবে শুরু, পানির অভাবে ভুগতে পারে এমন ১১টি শহরের তালিকা প্রকাশ করা হলো।

১. সাও পাওলো

ব্রাজিলের অর্থনৈতিক রাজধানী এবং পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল ১০টি শহরের একটি হলো সাও পাওলো। কেপ টাউনের মতো একটি অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন তারা হয়েছিলো ২০১৫ সালে, যখন তাদের প্রধান জলাধারে পানি ৪% এরও নিচে নেমে গিয়েছিলো।

২১.৭ মিলিয়ন মানুষের এই শহরে অভাবের সময়ে কমপক্ষে ২০ দিন পানির সরবরাহ থাকে না। সে সময়ে পানি সরবরাহকারী ট্রাকগুলোকে পুলিশ পাহারায় গন্তব্যে পৌছে দিতে হয় যাতে কেউ তা লুট করতে না পারে।

যদিও ২০১৬ সালে পানির এই সংকট শেষ হয়ে গিয়েছে বলে জানানো হয়েছিলো, তবু ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রধান জলাধারে কাঙ্ক্ষিত পানির পরিমান ১৫% কম হওয়ায় পুনরায় প্রশ্ন জাগছে জলশূন্যতার।

২. ব্যাঙ্গালোর

ভারতের দক্ষিনাঞ্চলের এই শহরের সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে পানির সরবরাহ এবং নিস্কাশন ব্যবস্থা ঝুকির মুখে পড়েছে। শহরের পুরাতন পাইপগুলো মেরামত না করার কারণে সেখানকার বিশুদ্ধ পানির বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

চীনের মতো ভারতেও পানি দূষণ অনেক বেশি, ব্যাঙ্গালোর তারই এক অংশ। শহরের পানির ৮৫% কেবল সেচ ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য। তা দিয়ে গোসল করা কিংবা বা সেই পানি পান করা সম্ভব নয়।

৩. বেইজিং

বিশ্বব্যাংক থেকে পানি স্বল্পতার সতর্কতা তখনই দেওয়া হয়, যখন দেখা যায় কোন এলাকার মানুষ জনপ্রতি ১,০০০ কিউবিক মিটারেরও কম বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে। ২০১৪ সালে বেইজিং এর ২০ মিলিয়ন জনসংখ্যার মানুষেরা পেয়েছিলেন মাত্র ১৪৫ কিউবিক মিটার পানি।

চীনে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২০% এর বসতি হলেও এখানে বিশ্বের মোট বিশুদ্ধ পানির মাত্র ৭% রয়েছে। ২০০০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে দেশটির বিশুদ্ধ পানির পরিমাণ আরো ১৩ শতাংশ কমে গিয়েছে।

এছাড়াও রয়েছে দূষণ সমস্যা। ২০১৫ সালে প্রকাশিত নথিপত্র থেকে জানা যায়, চীনে দূষনের ফলে ৪০% পানি এতটাই বাজে অবস্থায় যায় যে, তা সেচ কিংবা শিল্প কারখানায় ব্যবহারেরও অযোগ্য হয়ে যায়।

৪. কায়রো

বিশ্বের অন্যতম মহান সভ্যতা গড়ে ওঠার পিছনে ভূমিকা যার, সেই নীল নদ বর্তমানে রয়েছে সংকটে। মিশরের ৯৭% পানির যোগান দেওয়া এই নদীটির পানির ব্যবহার বাড়ছে কৃষি, গৃহস্থলী সহ সব ক্ষেত্রেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে যে, নিম্ন মধ্যবিত্ত দেশগুলোর মধ্যে মিশরে পানি দূষনের কারনে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘ ধারনা করছে যে ২০২৫ সালের মধ্যে সেখানে সৃষ্টি হবে ব্যাপক জলশূন্যতা।

৫. জাকার্তা

সমুদ্র উপকূলবর্তী অনেক শহরের মত ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তাও রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকির মুখে। তবে জাকার্তায় এই সমস্যা কিছু মানবসৃষ্ট কারনে আরো খারাপের দিকে গিয়েছে। ১০ মিলিয়ন মানুষের এই শহরে সাপ্লাই-এর পানির সুবিধা পাননা সেখানকার অর্ধেক মানুষ, আর তাই যেখানে সেখানে অবাধে কুয়া খননের ঘটনা বেশ প্রচলিত। ফলস্বরূপ, জাকার্তার ৪০% এলাকা এখন সমুদ্র স্তরের নিচে, এমনটা জানিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক।

ব্যাপার আরও খারাপের দিকেই গড়িয়েছে কারণ এসব কুয়া তারা সিমেন্ট দিয়ে বাধাই করার কারণে এগুলো বৃষ্টির পানি আবার ভূগর্ভে ফিরিয়ে দিতে পারছেনা।

৬. মস্কো

পৃথিবীর বিশুদ্ধ পানির চার ভাগের এক ভাগ রাশিয়ায় থাকলেও, সোভিয়েত যুগের শিল্প সমৃদ্ধির রেশ ধরে আজও সেখানে দূষনের মহামারী চলে আসছে।

ঘটনাটি মস্কোর জন্য আরো বেশি হুমকির, কারণ সেখানকার ৭০% পানি আসে ভূপৃষ্ঠ থেকে। জানা যায়, সেখানকার ৩৫% থেকে ৬০% খাবার পানি বিশুদ্ধতা হারিয়েছে।

৭. ইস্তাম্বুল

তুরস্কের সরকারি নথিপত্রে জানানো হয়েছে যে, ২০১৬ সালে ইস্তাম্বুলের মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল জনপ্রতি ১,৭০০ কিউবিক মিটার বিশুদ্ধ পানি। স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংকট আরো খারাপ অবস্থায় পৌছাবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে ইস্তানবুলের মত ঘন জনবসতির শহরগুলো ভুগছে পানি স্বল্পতায়।

৮. মেক্সিকো সিটি

মেক্সিকোর রাজধানীর ২১ মিলিয়ন মানুষের মাঝে পানি স্বল্পতা নতুন কিছু নয়। প্রতি ৫ জনের মাঝে ১ জন তাদের পানির ট্যাপ থেকে দিনে কেবল ১ ঘন্টা পানি সরবরাহ পেয়ে থাকেন। মোট জনসংখ্যার ২০% মানুষ দিনে একটি নির্দিষ্ট সময়জুড়ে কেবল পানি পান।

শহরটি নিকটবর্তী উৎসগুলো থেকে পানি আমদানী করলেও ব্যবহৃত পানিকে পুনরায় কাজে লাগানোর কোন ব্যবস্থা নেই শহরটিতে। তাছাড়া পানির লাইনে সমস্যার কারণে ৪০% পানি নষ্ট হয়ে যাওয়া তো আছেই।

৯. লন্ডন

পানি সংকটের কথা চিন্তা করলে লন্ডনের নামটি হয়তো অনেকের মাথায়ই আসবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। লন্ডনে বছরে মাত্র ৬০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা প্যারিসের গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে যথেষ্ট কম এবং নিউ ইয়র্কের বৃষ্টিপাতের মাত্রার অর্ধেক। লন্ডন এর পানির ৮০% সংগ্রহ করে থাকে নদী থেকে।

লন্ডনের কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৫ সালের মধ্যে সেখানে শুরু হয়ে যেতে পারে সমস্যা এবং ২০৪০ সাল নাগাদ খুব বড় সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে শহরটি।

১০. টোকিও

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল-এর মতো চমৎকার বৃষ্টিপাত উপভোগ করে জাপানের রাজধানী টোকিও। কিন্তু সমস্যা হলো, তা স্থায়ী বছরের মাত্র চার মাস জুড়ে।

যদি কোন বর্ষাকালে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত ঘটে, তবে খরা কবলিত হয়ে যায় সেই এলাকা। তাই জাপানকে যথেষ্ট পরিমানে পানি সংরক্ষন করে রাখতে হয়। টোকিওর কমপক্ষে ৭৫০টি ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সরকারী ভবনে রয়েছে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা।

৩০ মিলিয়ন মানুষের শহর টোকিও তাদের ব্যবহার্য পানির ৭০% পেয়ে থাকে নদী, খাল ও গলিত বরফ থেকে।

১১. মায়ামি

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা প্রদেশে বেশ ভালোই বৃষ্টিপাত ঘটে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানকার বিখ্যাত শহর মায়ামিতে ধিরে ধিরে দানা বাধছে পানি সংকট।

২০ শতকে আশেপাশের ডোবার পানি সেচে ফেলার ফলাফল টের পাওয়া যাচ্ছে বর্তমান দিনগুলোতে। আটলান্টিক মহাসাগরের পানির কারণে শহরের প্রধান বিশুদ্ধ পানির উৎসটি দুষিত হচ্ছে।

১৯৩০ সালের দিকে এই সমস্যা খুজে পাওয়া গেলেও তার সমাধান হয়নি আজও। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সেখানকার বিশুদ্ধ পানিতে প্রায়ই মিশে যাচ্ছে সমুদ্রের পানি।

মায়ামিসহ এর আশেপাশের শহরগুলোও ভুগছে এই সমস্যায়। হ্যালানডেল বীচ, মায়ামির কয়েক মাইল উত্তরে অবস্থিত একটি শহর, লবনপানির এই মিশ্রনের কারণে তাদের আটটি কুয়ার ছয়টি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *