পশ্চিমারা কেন শুধু মালালাকে চেনায়, আহেদ তামিমীকে উপেক্ষা করে?

১৬ বছর বয়সী ফিলিস্তিনী কিশোরী আহেদ তামিমীকে সম্প্রতি তার নিজ বাড়িতে রেইড দেবার সময় গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়েছে ইসরাইলী বাহিনী। ইসরাইলী প্রশাসন জানিয়েছে, তার অপরাধ হলো সে এক ইসরাইলী সৈনিক এবং একজন অফিসারকে “আক্রমন” করেছে। গ্রেপ্তারের একদিন আগে আহেদ তামিমীর বাড়ির উঠানে ইসরাইলী সেনারা অবস্থান করলে তার প্রতিবাদ করে আহেদ। এই ঘটনার কিছুদিন আগে তার ১৪ বছর বয়সী মামাতো ভাইকে মাথায় রাবার বুলেট ছুড়ে হত্যা করেছিল ইসরাইলী সেনারা। আর সরাসরি তাদের বাড়ির ভিতরে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছিল তারা। পরবর্তীতে আহেদ এর মা এবং মামাতো বোনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তারা তিন জনই বর্তমানে কারাবন্দী আছেন।

পশ্চিমা নারীবাদী গ্রুপ, মানবাধিকার প্রতিনিধি কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা যারা নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে সোচ্চার এবং মানবাধিকার রক্ষায় কর্মরত, তারা আহেদের এমন পরিস্থিতিতে খুব বেশি চুপচাপ। তাদের কিন্তু বেশ কিছু প্রকল্প চলমান, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গার্ল আপ, গার্ল রাইজিং, জি-২০ সামিট, বিকজ আই এম এ গার্ল, লেট গার্লস লার্ন ইত্যাদি। এত কিছুর মধ্যে আহেদ তামিমীর নামটা খুব বেশি উচ্চারিত হয় না।

আরও পড়ুন:  ১৬ বছর বয়সী আহেদ তামিমীকে কেনো এত ভয় ইসরাইলের?

কিন্তু ২০১২ সালে যখন পাকিস্তানের ১৫ বছর বয়সী মালালা ইউসুফের মাথায় তেহরিক-এ-তালেবান-এর এক সদস্য গুলি করেছিল, তখন এসব পশ্চিমা দলগুলোর প্রতিক্রিয়া খুব বেশি অন্যরকম ছিলো। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এক আন্দোলন শুরু করেছিলেন “আই অ্যাম মালালা”নামে। এমনকি ইউনেস্কো থেকে “স্ট্যান্ড আপ ফর মালালা” শীর্ষক এক পেটিশন শুরু হয়েছিলো।

তাছাড়া মালালা আমন্ত্রিত হয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন-এর সাথে সাক্ষাত করার জন্য। টাইম ম্যাগাজিনে তাকে ১০০ জন প্রচাবশালী মানুষের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে তিনি নোবেল পুরুষ্কারের জন্য মনোনয়ন পান এবং ২০১৪ সালে তা জিতেও নেন।

হিলারী ক্লিনটন এবং জুলিয়া গিলার্ডের মতো প্রভাবশালী মানুষেরা, এমনকি প্রখ্যাত সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টফ মালালার সমর্থনে মিডিয়ার সামনে কথা বলেছেন। “মালালা দিবস” নামে একটি দিনও ঘোষিত হয়।

কিন্তু এখন খুব কাছাকাছি ঘটনায় “আই অ্যাম আহেদ” কিংবা “স্ট্যান্ড আপ ফর আহেদ” নামে কিছু কোন শিরোনামে নেই। কোন গতানুগতিক নারীবাদী সংস্থা এ নিয়ে কথা বলছেনা কিংবা কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আহেদের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসছেন না। কেউ “আহেদ দিবস” এর ডাক দেননি। এমনকি, বক্তব্য প্রদানের লক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে সফর করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র আহেদের ভিসা পর্যন্ত দেয়নি।

মালালার মতো আহেদও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক তরুনী। তিনি ইসরাইলী সেনাদের সকল অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। নিজেকে বিসর্জন দিয়ে বহু কষ্ট সহ্য করে এগিয়ে চলেছেন তিনি। নিজের মামা এবং মামাতো ভাইকেও হারিয়েছেন এই চলার পথে। তার বাবা-মা এবং ভাই-বোনকে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার মায়ের পায়ে গুলিও করেছে ইসরাইলী দখলদার বাহিনী। দুই বছর আগে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যায় আহেদ তার ছোটভাইকে তুলে নিয়ে যাওয়া ঠেকাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

আহেদ এর এই ভোগান্তি কেন তবে পশ্চিমা বিশ্বে সাড়া জাগাচ্ছেনা? কেন মালালা আর আহেদের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া খুব আলাদা?

এই নীরবতার পিছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম কারণ হলো রাষ্ট্র অনুমোদিত সহিংসতাকে বৈধ ভাবে গ্রহন করার মানসিকতা। বোকো হারাম বা তালেবানের মতো জঙ্গি সংস্থা যখন আক্রমন করে, তখন তা অবৈধ হলেও একই ধরনের অপরাধ যখন কোন রাষ্ট্র করে থাকে তখন তাকে উচিত বলে মনে করেন অনেকে।

এই বৈধতার তালিকার মধ্যে শুধু মানুষের উপরে সরাসরি আক্রমনই আছে তা নয়। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সময়ে ড্রোন হামলা, অকারণে গ্রেপ্তার কিংবা পুলিশের নির্মমতাকেও বৈধ বলেই ধরা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদেরকে রাষ্ট্রের জন্য বাধা বলে আখ্যা দিয়ে সেসব নির্মমতাকে বৈধতা দেয় রাষ্ট্র।

যখনই একজনকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকির কারণ হিসাবে ঘোষনা দেওয়া হয়, তখনই সে সমস্ত রাজনৈতিক মূল্য হারিয়ে ফেলে। একটি রাষ্ট্র যখন জোরপূর্বকভাবে দখল করে নেওয়া হয়, তখন সেখানকার আইন স্তব্ধ হয়ে যায়। বৈষম্যের শিকার হওয়া মানুষটি তখন “সার্বভৌম সহিংসতা”-র টার্গেট হয়ে যান। এই শ্রেণীতে কিন্তু জঙ্গিরাও পড়ে। জঙ্গিদেরকে যখন আইনী বিচার ছাড়াই হত্যা করা হয় তখন সাধারন মানুষের মাঝে তেমন হৈচৈ সৃষ্টি হয়না।

ইসরাইলী পুলিশও এই ধরনের পথেই হাটছে। তারা এক সশস্ত্র ইসরায়েলি সৈন্যকে কয়েকটি কিল-ঘুষি মারার অপরাধে আট মাসের জন্য কারাদণ্ড দিয়েছে আহেদকে। এই সময়ের শাস্তি একজন ইসরায়েলি সেনাও পেয়েছিলেন এক ফিলিস্তিনি শিশুর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করার জন্য। আর সামান্য কয়েকটি কিল-ঘুষির জন্য আহেদ হয়ে গেছেন ইসরাইলী সৈনিকদের জন্য “ক্ষতিকর” এবং রাষ্ট্রীয় শত্রু!।

আরও পড়ুন:  ইসরায়েলি সেনাকে কিল-ঘুষি, ৮ মাসের কারাদণ্ড ফিলিস্তিনের আহেদ তামিমীর

১৬ বছর বয়সী আহেদ নিজের পরিবারের রক্ষার্থে তার ছোট্ট হাত দিয়ে কতখানি ক্ষতি সাধন করতে পারেন একজন প্রশিক্ষিত পূর্নবয়ষ্ক সৈনিকের তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এই “অপরাধ” কে জঙ্গিবাদের সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া দুর্বোধ্য। এই ধরনের দোষারোপের স্বাধীনতা ভবিষ্যতে আরো অত্যাচারের রাস্তা সুগম করে দেয়। উদাহরনস্বরূপ, এমন ছাড় পেয়ে ইসরাইলের শিক্ষামন্ত্রী নাফতালী বেনেট দাবি জানিয়েছেন যেন আহেদ ও তার পরিবার তাদের জীবন জেলখানাতেই কাটিয়ে দেয় সেই ব্যবস্থা করতে।

আহেদের এই দুরবস্থা থেকে আরো ফুটে ওঠে পশ্চিমের সুনির্দিষ্ট ও বাছাইকৃত মানবাধিকার চর্চা। তারা বেছে বেছে নিজেদের সুবিধামতো মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসছেন যেন। নৃবিজ্ঞানী মিরিয়াম টিকটিন জানান, মানবাধিকার সংস্থাগুলো শুধুমাত্র তাদের নিয়েই কাজ করছে, যারা খুব বেশি শারীরিকভাবে নির্যাতিত অথবা ভয়াবহ কোন রোগে আক্রান্ত। এক্ষেত্রে শিশু শ্রম কিংবা শরীরের বিকৃতিসাধনকে তারা এড়িয়ে যায় কারন এগুলো তাদের “নীতিমালা” এর অধীনে পড়েনা।

বেকারত্বের সমস্যা, ক্ষুধা, সহিংসতার হুমকি, পুলিশ বর্বরতা, এবং সংস্কৃতির বিচ্ছিন্নতা মানবিক হস্তক্ষেপের যোগ্য বলে বিবেচিত হয় না। এ সকল ঘটনাকে দুঃখজনক ও অনিবার্য বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। আহেদ তাই সেসব সংস্থার সাহায্যের জন্য উপযুক্ত নন। আহেদ এর মতো যে সকল নারীরা দখলদারিত্ব এবং সাম্প্রদায়িকতায় আঘাতের প্রতিবাদ করে, তাদেরকে ঠিক “শক্তিশালী নারী” বলে গন্য করছেনা নারীবাদী সংস্থাগুলো। হয়তো আহেদ নিজেকে “শক্তিশালী নারী” হিসেবে গড়ে না তুলে অন্যায়ের প্রতিবাদকেই মূখ্য করে দেখেছেন, এটিই তার দোষ বা দুর্ভাগ্য।

আহেদ এর এমন দুরবস্থায় সময় এসেছে মানবাধিকার চর্চায় পক্ষপাতিত্বের অস্তিত্ব নিয়ে তদন্ত করবার। রাষ্ট্র যদি একজনের উপরে অন্যায় করে থাকে, তাহলে তার জন্য আইনী ব্যবস্থা গ্রহনের সাড়া জাগানোর সময় এখনই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *