ফ্রান্সের যে গ্যাং টক্কর দিত বর্ণবাদীদের সঙ্গে

ফিলিপ চ্যান্সেলের বয়স যখন মাত্র ২০ বছর। সেসময়ই তিনি জীবনে প্রথমবারের মতো পরিচিত হয়েছিলেন কোনো গ্যাংয়ের সঙ্গে। ১৯৮০ সালের দিকে প্যারিসের রাস্তায় “দ্য ভাইকিংস” নামক এই দলটির তরুনদের তিনি আড্ডা দিতে দেখতেন। ১৯৫০ এর দিককার রক অ্যান্ড রোল ব্যান্ডের তারকাদের মতো ফ্যাশনে জড়ো হওয়া এই কিশোরদের দেখে তার প্রথম দেখাতেই তার মনে আগ্রহ জন্মায়। এই দলের ছেলেরা পরতো চেক শার্ট, ট্রাউজার আর চুলে ছিলো ভিন্ন ধরনের সাজ। আর মেয়েরা পরেছিলো টপ্স, গোলাকারের কানের দুল আর পোলকা ডট ডিজাইনের মাথায় পরার স্কার্ফ।

চ্যান্সেল তাদের প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট হন কারণ সেই সময়ে প্যারিসের প্রায় সব গ্যাং-এর সদস্যরা সাধারণত ছিল শ্বেত বর্ণের যুবক-যুবতী যারা প্রচন্ডভাবে ডানপন্থী মতবাদে বিশ্বাস করত। তাদের থেকে ভাইকিংস নামক এই গ্যাংটি একদমই আলাদা। সেখানে ছিল নানা বর্ণ-গোত্রের সদস্য।

চ্যান্সেল বলেন, “সেই সময়ে দ্য ভাইকিংস ছিল বেশ আলাদা, কারণ তাদের মাঝে কালো, ব্লাঙ্ক, বেয়ার (উত্তর আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া ফরাসী মানুষ) ইত্যাদী সকল গোত্রের মানুষই ছিলো। এই ব্যাপারটি আমার মনে কৌতহল সৃষ্টি করে। আমি তাদের খুব কাছ থেকে ছবি তুলতে চেয়েছিলাম। তারাও আমার স্বল্প বয়স এবং অগাধ আত্মবিশ্বাস দেখে আমাকে কাছে টেনে নিয়েছিলো। আমি তখন জীবনের মানে খুজছিলাম, বিপদ আর নানামুখী অ্যাডভেঞ্চারের তৃষ্ণায় রক্ত টগবগে ছিলো। তাই ফটোগ্রাফিকে বেছে নিয়েছিলাম মাধ্যম হিসেবে।”

৮০-র দশকে ফ্রান্সের বিপরীত সংস্কৃতিমুখী এক পত্রিকা “একচুয়েল”-এ চ্যান্সেল এর তোলা ভাইকিংস ও এর মিত্র গ্যাং “প্যান্থার” এর ছবিগুলো প্রকাশিত হয়। কিন্তু তখন থেকে খুব বেশি আলোর দেখা পায়নি ছবিগুলো।তবে এই মাসের শেষার্ধে লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য “এনাদার কাইন্ড অফ লাইফঃ ফটোগ্রাফি অন দ্য মার্জিন্স” নামক একটি প্রদর্শনীতে এই ছবিগুলো পুনরায় প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে। এই প্রদর্শনীতে বিখ্যাত ফটোগ্রাফার জিম গোল্ডবার্গ, ল্যারী ক্লার্ক, ম্যারী এলেন মার্ক এবং পিটার হিউগোসহ বেশ কিছু ফটোগ্রাফারের কাজ প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে।

১৯৮২ সালের পুরোটা জুড়ে ভাইকিংস ও প্যান্থার গ্যাংয়ের ছবি তুলেছেন চ্যান্সেল। তার তোলা বেশিরভাগ সাদাকালো ছবিতে অবশ্য তাদের সুখের সময়গুলো ধারণ করা হয়েছিলো। অতীতের পপ কালচারকে পুনরায় ফিরিয়ে এনে সেই আদলে নাচগান, ক্লাবিং আর আড্ডার মুহূর্তগুলো ধারণ করেছিলেন তিনি।

কিন্তু এক সময় ফ্রান্সে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে শুরু করলো তৎকালীন বেপরোয়া বামপন্থী সরকার। ১৯৮৩ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতা পরিবর্তন হলে দেখা দিলো নতুন এক প্রবনতার,ফ্রান্সের সকল সমস্যার মূল হিসেবে দোষী করা শুরু হলো প্রবাসীদেরকে। তারপর থেকেই ভাইকিংস আর প্যান্থার সংগঠন হিসেবে আরো সক্রিয় হয়ে উঠলো।

ভাইকিংস তাদের নাম পরিবর্তন করে রাখল ‘দেল ভাইকিংস’। ১৯৫০ এর দশকের জনপ্রিয় এক রক অ্যান্ড রোল ব্যান্ডের আদলে। আর প্যান্থার তাদের নাম ব্ল্যাক প্যান্থার রাখে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিপ্লবকে সম্মান জানাতে।ব্ল্যাক প্যান্থার দলের তরুণেরা পোষাক হিসেবে বেছে নিয়েছিলো পুরাতন বিমান বাহিনীর জ্যাকেট আর ক্যাপ। তারা মার্শাল আর্টস চর্চা করতো। তাদের আক্রমণাত্মক স্বভাবের কারণে প্যেরিসের বামপন্থী গ্যাংগুলোর মধ্যে সামনের সারিতে উঠে আসে তারা। তাদের অগ্রগতির এক পর্যায়ে জনগন তাদের ‘অ্যানটিফা’ (ফ্যাসিবাদী বিরোধী) এবং ‘চ্যাসিউর্স ডে স্কিন্স’ (স্কিনহেড শিকারী) বলে ডাকতো।

চ্যান্সেলের ছবির এই সিরিজের মূল আকর্ষনের জায়গাটা হলো, কিভাবে একটি হাস্যোজ্জ্বল কিশোর-কিশোরীর দল ফুর্তি করার দিনগুলো থেকে ধিরে ধিরে ভয় জাগানো একটি গ্যাং এ পরিনত হলো তা ফুটিয়ে তোলা। তিনি তাদের সাথে তাদের বিভিন্ন রাত্রিকালীন অভযানে অংশ নিতেন এবং সেগুলোর ছবি তুলতেন। চ্যান্সেল জানান, “আমি তাদের সাথে বেশ বন্ধুর মত ছিলাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি ছিলাম এক প্রকারের শত্রুও। আমাকে তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার স্বার্থে কূটনীতিক ক্ষমতা ঝালিয়ে নিতে হয়েছে বেশ খানিকটা। যতই দিন পার হলো, তাদের সাথে আমার থাকা ততই কঠিন হতে লাগলো। আমি ফ্ল্যাশ ব্যবহার করে ছবি তুলতাম। গোপনে কোন অভিযান চালাতে ফ্ল্যাশ ব্যবহার খুব একটা ভালো উপায় নয়। মাঝেমধ্যে সেই কারণে তারা আমাকে হুমকি-ধামকি দিতো”।

৮০-র দশকে ভাইকিংসের প্রায় ১০০ জন সদস্য ছিলো। তারা ও প্যানথার গ্যাং মিলে বেশ বড় একটি এলাকার নিয়ন্ত্রন রেখেছিলো নিজেদের হাতে। তাদের প্রতিপক্ষ গ্যাং-এর সাথে মারামারি আর গণ্ডগোলের উত্তাপ ছড়াতে লাগলো সংগীত ক্লাব, বাজার ও বারসহ সারা শহরের বিভিন্ন স্থানজুড়ে। চ্যান্সেল বলেন, “আমি সবসময়ই সতর্ক থাকতাম। তাদের সাথে যথেষ্ট পরিচিত হলেও তাদের মধ্যে অনেকেরই মতিগতি বোঝা কঠিন ছিলো।আমি ক্যামেরাসহ তাদের সাথে ঘুরে বেড়াই, এই বিষয়টি অনেকেরই পছন্দ ছিলোনা”।

অনেক গ্যাং সদস্যের কাছে অবৈধ বঙ্গুক ছিলো। এই বিষয়টি চ্যান্সেলের ভয়ের একটি জায়গা ছিলো। তিনি বলেন, “আমি শুরুতে মনে করতাম, শুধুমাত্র ভাব দেখানোর জন্য পিস্তল সাথে রাখতো তারা, কিংবা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে। কিন্তু এখনকার অবস্থা দেখে আর তা মনে হয়না। প্যারিসের বর্তমান নিরাপত্তার মাঝে এরকম কথা কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব”।

১৯৮৩ সালের শুরুর দিকে মন্টমার্ট্রের রাস্তায় ভাইকিংস এবং প্যানথার নিজেদের মধ্যে মারামারি করে। সে সময় আসার আগেই সেখান থেকে সরে এসেছিলেন চ্যান্সেল। তিনি জানান, তার ক্যামেরায় বন্দী অনেক মানুষ এখন আর বেচে নেই। দুর্ঘটনা, মাদক আর অতিরিক্ত বিপদজনক জীবনযাপনের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে তারা। তাদের পতনের ঠিক আগ মুহূর্তের সংক্ষিপ্ত আনন্দঘন সময়টুকু চমৎকারভাবে ধরে রেখেছেন চ্যান্সেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *