সহিংসতার বলি এক কাশ্মীরী কবি, হারিয়েছেন ৩০ বছর ধরে লেখা কবিতা

প্রতিবেশীর বাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে নিজের বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যেতে দেখেছেন গুলাম মুহাম্মদ ভাট। আর সেই আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে তাঁর ৩০ বছর ধরে লেখা অজস্র কবিতা। ভারত শাসিত কাশ্মীরের বল্লমা গ্রামে বিপ্লবী আর ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার দুই দিনব্যাপী বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার বলি হয়েছেন এই কবি। হারিয়েছেন তাঁর সারা জীবনের সৃজনশীল কর্ম। জানা গেছে আল জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে।

৫২ বছর বয়সী ভাট একজন জনপ্রিয় কাশ্মীরী কবি। অপ্রকাশিত অসংখ্য কবিতা হারাবার কষ্টে মুষড়ে পড়েছেন তিনি। কাশ্মীরের শ্রীনগর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের নিরিবিলি একটি গ্রাম, বল্লমা। অধিকাংশ সময়ই এখানে তেমন কোন বন্দুকযুদ্ধ হয়নি এর আগে। গোলাগুলির ঘটনা মূলত কাশ্মীরের দক্ষিন অংশেই হয়ে থাকে।

২০১৬ সালে বিপ্লবী কমান্ডার বুরহান ওয়ানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মারা যাবার পর থেকে উত্তাল হয়ে আছে দক্ষিণ কাশ্মীর। এরপর থেকে প্রায় ২০০ জন বিদ্রোহী সেখানে বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন এবং শত শত মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন।

পড়ুন কাশ্মীরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি: উত্তাল কাশ্মীর, সংঘর্ষে নিহত ২০

মার্চ মাসের ১৫ তারিখে ভাট ও তাঁর স্ত্রী বাড়ির আঙ্গিনায় সময় কাটাচ্ছিলেন আর গরুকে পানি খেতে দিচ্ছিলেন। এর মধ্যে হঠাৎ তিন বিদ্রোহী দৌড়ে এসে তাদের ঘরের ভিতরে আশ্রয় নেন। তারা সেখানে আটকা পড়ে যায় আর তা থেকে শুরু হয় বন্দুকযুদ্ধ।

ভাট জানান, “তারা পালাতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু ভারতীয় সেনারা তার আগেই বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছিল। তারা আমার কাছে ক্ষমা চায় এবং আমাকে ঘর ছেড়ে বের হয়ে যেতে বলে”।

এই বাড়িটি ভাটের বাবা নিজ হাতে বানিয়েছিলেন ১৯৬৫ সালে। তিনি আরো বলেন, “তারা যে ঘরটিতে আশ্রয় নিয়েছিল সেই ঘরে আমার ৩০ বছরের সমস্ত কাজ জমা ছিল। আমার তিনিটি প্রকাশিত বই আছে। কিন্তু বাকি সব কাজ অপ্রকাশিত। বন্দুকযুদ্ধ শুরু হবার তিন ঘন্টা পরে ভারতীয় সেনারা বাড়িটি পুড়িয়ে ফেলে। দুইদিন ধরে সেখান থেকে ধোয়া বের হতে থাকে। সেই ধোয়ায় ভেসে আসছিলো চাল-ডাল, কাঠ আর কাপড় পোড়া গন্ধ, একসময় যাকিছু আমাদের সম্পত্তি ছিল, সবকিছুর পোড়া গন্ধ নাকে এসে লাগছিল”।

আরও পড়ুন:  কাশ্মীরে ভারত শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শিল্প দিয়ে

নতুন করে সহিংসতা সৃষ্টি

ভাটের স্ত্রী জানান, তাঁর স্বামী জীবনে বেশ কয়েকবার হাজতে গিয়েছেন বিদ্রোহীদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে নিজের কবিতা আবৃত্তির দায়ে। তিনি জীবনে অনেক কঠিন সময় পার করেছেন। ভাট জানান, “আমি ১৯৯৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত জেলখানায় ছিলাম। মানুষ আমাকে শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করতে ডাকতো। সেই কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো আমাকে”।

আক্রান্ত এই হিমালয় অঞ্চলে গত দুই-তিন বছরে সহিংসতা বেড়ে গিয়েছে। কাশ্মীরকে নিজেদের বলে দাবি করা দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যের অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে সেখানে বিদ্রোহীদের সশস্ত্র আন্দোলন আরো বেড়েছে। কবি ভাট জানান, তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। তিনি গত এক দশক ধরে কাশ্মীরের চলমান সহিংসতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন আর মাধশ বল্লমী ছদ্মনামে লেখালেখি করে গিয়েছেন।

তিনি বলেন, “আমার বেশিরভাগ কাজের বিষয়বস্তু কাশ্মীরকে ঘিরে। এখানকার ইতিহাস, অস্থিরতা আর ধর্ম নিয়ে লিখেছি। ১৯৮২ সালে আমি কলেজ থেকে ড্রপ আউট হয়ে গিয়েছিলাম ফার্স্ট ইয়ার সমাপ্ত করার পরপরই। তখন থেকেই কবিতা আমার প্রেরনা আর আমার ভালোবাসা”। ভাট এর প্রধান আয়ের উৎস হলো কৃষিকাজ। এর আগে ২০০০ সাল থেক ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি একজন প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে চাকরিও করেছেন একটি স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী দলের হয়ে।

ভাটের সব কাজ উর্দু আর কাশ্মীরী ভাষায় লেখা। তিনি জানান, তিনি কাজ গুছিয়ে রেখেছিলেন প্রকাশ করার লক্ষ্যে। তার সেখানে কমপক্ষে ৮০০ পৃষ্ঠা কবিতা লেখা ছিল। তিনি জানান, বাড়ি হারাবার কারণে কষ্ট নেই তার, তার সকল কষ্ট কবিতাগুলো হারানোকে ঘিরে।

আরও পড়ুন:  ভারত প্রজাতন্ত্র দিবস: কাশ্মীরের জন্য এক শোকাবহ দিন

লেখা ছেড়ে দেব না

চারদিন ধরে ভাট একাই পোড়া বাড়ির ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করে গেছেন। নিজের ক্ষতির কথায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বন্দুকযুদ্ধের পরে হাজার হাজার মানুষ ঘটনাস্থল দেখতে এসেছে, কিন্তু আজ আমি একাই ধ্বংসাবশেষ কুড়িয়ে বেড়াচ্ছি”।

তার স্ত্রী ফাজি জানান তিনি বিদ্রোহীদেরকে ঘরে ঢুকতে বাধা দিয়েছিলেন। তিনি জানান স্বামীর কাজ হারানোতে দুঃখ পেয়েছেন তিনি। ফাজি বলেন,“সে দিন রাত কষ্ট করে লিখে যেত। একজন তার জন্য আমারো কষ্ট হচ্ছে। সব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। তার কঠোর পরিশ্রমের সাক্ষী আমি। সে লিখতে লিখতে অসুস্থ হয়ে যেত, আমি মানা করলেও না থেমে লেখা চালিয়ে যেত”। লেখক জানান, নিজের লেখা ছাড়াও তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে ছিল বিরল সব বই যা বাজারে আর পাওয়া যায় না।

অতীতের সব কাজ হারিয়ে ফেললেও অবশ্য হার মানতে রাজি নন কাশ্মীরের এই কবি। বরং দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি, “আমি লিখেই যাব। আমি আমার এই আসক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাব”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *