কেমন হবে যদি সহকর্মীর সঙ্গে কোনো দিন দেখা না হয়?

সপ্তাহে ৪০ ঘন্টা কাজ করবেন, কিন্তু আপনার কোনো সহকর্মীর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ হবে না। ব্যাপারটা অদ্ভুতুরে মনে হলেও বাস্তবে সত্যিই ঘটছে এমন ঘটনা।

অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কিন্তু এখনই এরকম অনেক মানুষ আছেন যাদের সহকর্মীদের সাথে সরাসরি পরিচয়ের ঘটনা ঘটেনি। তারা পুরো একদিন কারো সাথে কথা না বলে নিজ মনে অফিস করে বাড়ি ফিরে যান। কিন্তু এই আত্মকেন্দ্রিক অফিস প্রক্রিয়াই কি ভবিষ্যতে অফিস পরিচালনার নিয়ম হয়ে দাড়াতে পারে?

যুক্তরাষ্ট্রে এক গবেষনায় দেখা যায়, ২০০৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে টেলিফোনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আলাপ সেরে নেওয়ার হার বেড়েছে ১১৫%।২০১৫ সালের শুরুর দিক থেকে প্রায় ৫ লাখ মানুষ “স্ল্যাক” নামের একটি লাইভ চ্যাটরুম প্রোগ্রাম ব্যবহার করে যোগাযোগ সেরে নিয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ সেই প্রোগ্রামের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গিয়েছে।

২০১৭ সালে গ্যালাপ এর একটি জরিপে অংশ নেওয়া ১৫ হাজার মার্কিন নাগরিকের মধ্যে ৪৩% নাগরিক জানান, তারা তাদের দিনের বেশ কিছুটা সময় একান্তই নিজে নিজে কাজ করে থাকেন। এই হার ২০১২ সালের চেয়ে ৪% বেশি। আর ২০১৫ সালের ইউগভ-এর এক গবেষনা থেকে জানা যায়, যুক্তরাজ্যের ৩০% কর্মজীবি মানুষ মনে করেন, অফিসের বাইরে কাজ করার সুযোগ পেলে তাদের কর্মক্ষমতা আরো বেড়ে যায়।

যদি সত্যিই কারো সাথে মত বিনিময় না করে চাকরী করা যেত, কেমন হতো সে অভিজ্ঞতা? আমাদের কি আদৌ কিছু আসে যায় তাতে? অবস্থা কি আসলে এতটাই খারাপ যে, মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ না হওয়ার ব্যাপারটা আমরা অনুভবই করতে পারব না?

একাকী কাজ করার এই উদ্যোগ আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। সেই সাথে প্রভাব পড়বে আমাদের কোম্পানীগুলোর পরিচালনা ব্যবস্থা এবং সেই সাথে আমাদের শহর ব্যবস্থাপনার ওপর। বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।

মানুষবিহীন কর্মক্ষেত্রগুলো কেমন হতে পারে?

২০১৮ সালে এরই মধ্যে যেন শুরু হয়ে গিয়েছে বাড়ি বসে কাজ করার যুগ। আধুনিক মানুষেরা আসন্ন বছরগুলোতে সাইন্স ফিকশনে বর্ণিত অত্যাধুনিক কর্মক্ষেত্রগুলোর আদলে পরিচালিত এক ব্যবস্থায় কাজ করার কথা ভাবছেন মনে মনে। যেমন, একটি কার্যদিবসের শুরুতে নিজের দিনের কর্মসূচি এবং লক্ষ্য নির্ধারন করে নিজে অফিসে না গিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে এমন কোন উপায়ে অনলাইনে সভাগুলোয় অংশ নেওয়ার কোন ব্যবস্থা।

‘ইন্সটিটিউট ফর গ্লোবাল ফিউচার’-এর প্রধান জেমস ক্যানটন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজের তিনটি প্রশাসনকে এমনই কর্মক্ষেত্র তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।তিনি বলেন, “আমার ডিজিটালভাবে তৈরি করা এক স্বরূপ আমার হয়ে কর্মচারী আর ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ করবে এবং সেই সাথে বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের মতামতও শুনবে। কিছুদুর পর্যন্ত এটি স্বক্রিয় হলেও বড় কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি আমার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হবে সত্ত্বাটি”।

জেমস ক্যান্টন এই অনলাইন বট তৈরির জন্য বিজ্ঞানীদের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জানান, “এইসব বট-এর আড়ালে থাকবে বিশাল ক্ষমতাধারী সুপার কম্পিউটার এবং ক্লাউড এর শক্তি। তবে প্রত্যক্ষভাবে এগুলোকে ব্যবহারকারীরা নিজেদের মতন করে সাজাতে পারবেন”।

একাকী কাজ করা আপনার মানসিকতায় কিরকম প্রভাব ফেলে?

অনেকে বিশ্বাস করেন, টেলিকমিউটিং এর প্রসার কর্মজীবিদের মানসিক ক্লান্তি আরো বাড়িয়ে দেবে এবং তাদের ভেতরের বিষন্নতাকে আরো খারাপ পর্যায়ে নিয়ে যাবে।

সাধারণত অফিসে কাজ থেকে সাময়িক বিরতি নিতে কর্তৃপক্ষ কর্মীদের গান শোনা, ইউটিউব দেখার জন্য সময় বরাদ্দ করে দেন। মাঝেমধ্যে ছোট পরিসরে অফিসের সকলে মিলে ভ্রমণে যাওয়ার মাধ্যমেও মন চাঙ্গা করার একটি সুযোগ আসে। কিন্তু অফিসবিহীন কর্মজীবনে এইসব কিছু একজন মানুষ এমনিতেই পেয়ে থাকবে এবং অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। তাই তাদের অভ্যাস থেকে মুক্তি নিয়ে মানসিক অসাড়তা কাটাতে হলে নির্ভর করতে হবে কল্পনার জগতের উপরে।ফলে অনেকেই দীর্ঘ সময় কর্মবিরতি নিয়ে থাকবেন। এছাড়াও ভার্চুয়াল রিয়ালিটি যন্ত্রে নির্ভরযোগ্যতা বেড়ে যাবে, যা ক্রমে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত করে তুলতে পারে একজন মানুষকে।

তাছাড়া এই ব্যবস্থায় মানুষের ফরমাল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে এবং নিজের তৈরি জগতেই সে সীমাবদ্ধ থাকবে। যার ফলে অনেকেই ঠিকমতো গুছিয়ে কাজ করে যেতে পারবেনা।

হলোগ্রাফিক চিত্র দিয়ে নিজেদের কৃত্রিম সত্ত্বা তৈরি করে অন্যদের সাথে যোগাযোগ করার ব্যাপারটি শুনতে মজার মনে হলেও এটি ব্যবহার করে একেবারেই একা একা কাজ করার অভিজ্ঞতা তেমন মজার নাও হতে পারে। কর্মী ও তাদের ম্যানেজারের মাঝে সম্মিলিতভাবে একটি কাজ করা বরং আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

মুখোমুখি যোগাযোগের আসলেই কোন বিকল্প নেই। একজন মানুষের সাথে সরাসরি কথা বললে ব্যক্ত তথ্য ছাড়াও তাদের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি, কথা বলার সুর এবং সেগুলো থেকে মানসিক অবস্থা বুঝতে পারার একটি জায়গা থাকে। তাই কেউ কথা বললে বোঝা যায় সে ভালো মনে কথা বলছে নাকি বিরক্তি নিয়ে বলছে।প্রযুক্তির ব্যবহারে এসব সুবিধা হারিয়ে যাবে মানুষের জীবন থেকে।

বাড়িতে বসে কাজ না করার পিছনে যুক্তি

অফিসে কাজ না করা লাগলে কোম্পানীগুলো অনেক অর্থ বাঁচাতে সক্ষম হবে। ‘গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস এনালিটিক্স’ এর মতে, অফিসে কাজ না করা হলে গড়ে একটি কোম্পানী প্রতি বছর কর্মীপ্রতি ১১,০০০ মার্কিন ডলার সাশ্রয় করতে সক্ষম হবে। কারণ তখন অফিস ভাড়া, ফার্নিচার খরচ, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য অনেক খরচ আর থাকবেনা।

কিন্তু গভীরভাবে দেখলে দেখা যাবে, প্রত্যক্ষ খরচ কমে গেলেও, পরোক্ষভাবে বেশ কিছু খরচ বেড়েই যাবে। আইবিএম তাদের ২০০৭ সালে ঘোষিত বাড়িতে বসে কাজ করার প্রক্রিয়া গত বছর তুলে নিয়ে কর্মীদের পুনরায় অফিসে আসার আহ্বান জানিয়েছে। কোম্পানীটি জানায়, এরপর তাদের ৪ লাখ কর্মীর মধ্যে প্রায় ৪০% কর্মী ঐতিহ্যবাহী অফিসে যোগদান করতে পারেনি আর। ২০১৩ সালে আরেক বড় কোম্পানী ইয়াহুও একই রকম এক সিদ্ধান্তে গিয়েছিলো। ইয়াহুর এক কর্মকর্তার একটি গোপন নথি ফাঁস হয়ে গেলে সেখান থেকে জানা যায়, তাদের নেওয়া অন্যতম ভালো সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনাগুলো এসেছিলো অফিসের বারান্দা কিংবা ক্যাফেটেরিয়ায় আলাপ করতে করতে, নতুন মানুষদের সাথে পরিচিতির মাধ্যমে এবং নিয়মিত টিম মিটিং এর পরে।

বাড়িতে বসে কাজ করার সুযোগ দিলে কোম্পানীর কি উপায়ে বেশি অর্থ খরচ হতে পারে তা নিয়ে অবশ্য নির্দিষ্ট কোন হিসাবনিকাশ হয়নি এখনো। তবে এর ফলে যে কর্মীরা আরো অলস হয়ে যেতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে অবিশ্বস্তও হয়ে যেতে পারে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। যতই হোক না কেন, অফিসের ঘড়ির সাথে সময় মিলিয়ে কাজ করার মত চাঞ্চল্য বাড়িতে বসে আসার কথা না।

ম্যানেজারদের আসন্ন পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করা

যত বেশি মানুষ বাড়িতে বসে কাজ করবে, তাদের কাছ থেকে সময়মত কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা ততটাই কমতে থাকবে, সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যান তাই বলছে।আর নতুন এই পরিস্থিতিতে কাজ এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বেশি হিমশিম খাবেন ম্যানেজার পদের কর্মকর্তারা।

আজকের দিনেও শিল্প বিপ্লবের সময়ের মত করেই অফিসগুলোতে কর্মীদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে থাকেন একজন ম্যানেজার। সারিবদ্ধভাবে কর্মরত একদল মানুষ যখন তাদের ম্যানেজারকে সশরীরে উপস্থিত হতে দেখেন, তাদের মধ্যে কর্মক্ষমতা নিজ থেকেই বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে কাজ করা শুরু হলে তাদের নিয়ন্ত্রন করা কঠিন হয়ে পড়বে একজন ম্যানেজারের জন্য।

২০১৫ সালে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-য়ে বলা হয়েছে, যে কোম্পানীগুলো টেলিকমিউটিং এর দিকে পা বাড়িয়েছে, তারা তাদের কর্মপন্থা বাদ দিয়ে প্রযুক্তি নিয়েই বেশি চিন্তিত। বলতে গেলে, একটি ক্রীড়া দলকে ট্রেনিং-এ মনোযোগ দিতে না বলে ভালো ভালো সরঞ্জাম কিনে দিয়ে কোন খেলায় উন্নত ফলাফলের আশা করার মতই ব্যাপার কিছুটা।

ভালো যোগাযোগ নিশ্চিত না হলে ম্যানেজারেরা তাদের অধীনস্তদেরকে জটিল কোন পরিকল্পনার কথা বোঝাতে পারবেন না। তাছাড়া সকল কর্মী যাতে চাওয়ামাত্রই ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ করতে পারে সেই সুযোগও থাকা চাই।

মোটকথা, বাড়িতে বসে কাজ করার ক্ষমতা প্রদান করা হলে মূলত “কাজ” আর “বিরতি”র মাঝের বিভাজনকারী রেখাটি ধীরে ধীরে উধাও হয়ে যাবে। যখন তখন যেখানে ইচ্ছা সেখানে কাজ করার ব্যাপারটি আকর্ষনীয় মনে হলেও, মনে রাখতে হবে কোম্পানীও আপনাকে যখন তখন কিংবা যেখানে ইচ্ছা সেখানে কোন একটি দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে পারে। তাই সত্যিকার অর্থে বিরতি নেওয়ার সুযোগ কমে আসার আশঙ্কা দেখা দেবে প্রায়ই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *