সুন্দরভাবে সাজিয়ে মরতে পাঠানো হয় যে নারীদের!

ফালমাতা নামের এক নারী রূপচর্চায় ব্যস্ত। গাঢ় করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মেহেদী দেওয়ায় শোভা পাচ্ছে তার পা। সেই মেহেদী শুকানোর সময়জুড়ে তিনি জটবাধা চুল আচড়ে সোজা করার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমরা চাইলে যেকোন স্টাইলে চুল সাজাতে পারতাম এবং আমাদের হাত, পা ও ঘাড়ের কাছে মেহেদী দিয়ে সাজানোর অনুমতি ছিলো”।

ফালমাতা জানতেন তাকে দিনশেষে দেখতে সুন্দর লাগলেও তার এই সাজ কেবলই মৃত্যুর জন্য বরাদ্দ। সাজগোজ শেষ হলেই তার শরীরে জুড়ে দেওয়া হবে এক আত্মঘাতী বোমা!

নাইজেরিয়ার জঙ্গিদের দ্বারা অপহৃত বহু নারী ও কিশোরীর মধ্যে ফালমাতা হলেন একজন। জঙ্গিরা তাদের জোরপূর্বক তুলে এনে নিজেদের বিভিন্ন অভিযানের স্বার্থে ব্যবহার করত। ঘটনাক্রমে তা থেকে বেচে ফিরেছিলেন ফালমাতা।

১৩ বছর বয়সে ক্যামেরুনের সীমান্তের কাছে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পথে দুই মোটরসাইকেল আরোহী তাকে তুলে নিয়ে যায়। কয়েক ঘন্টা ধরে চলতে থাকে সেই মোটরসাইকেল, দুই আরোহীর মধ্যে চেপে বসিয়ে রাখা হয় ফালমাতাকে। রাস্তা ছেড়ে গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে সেই মোটরসাইকেল।

তারা যখন গন্তব্যে পৌছালো, ফালমাতা দেখলেন একটি বিশাল ক্যাম্প। তিনি বুঝতে পারলেন না ঠিক কোথায় আছেন তিনি। তিনি বলেন, “সেখানে অনেক তাবু আর কুড়ে ঘর ছিলো। কমবয়সী মেয়েদের তাবুর ভিতরে রাখা হতো। আমাকে যে তাবুতে রাখা হয়েছিলো সেখানে মোট নয়জন ছিলাম আমরা। মেঝেতে একটা বড় পাটিতে ঘুমাতে দেওয়া হতো আমাদের”।

এই ক্যাম্পটি ছিল বোকো হারাম নামের একটি জঙ্গি সংগঠনের, যারা নাইজেরিয়ায় “ইসলামী স্টেট” প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্রোহ করে আসছে অনেক আগে থেকে।

ফালমাতা বলেন, “প্রথমদিকে আমি পালানোর কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু ঐ দলের সদস্যেরা ক্যাম্পের চারিদিকে পাহারায় থাকায় সে সুযোগ হয়নি কোনদিন।“

এর কিছুদিনের মধ্যেই ফালমাতাকে একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি করা হয়। হয় তাকে একজন জঙ্গির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে, নাহলে যেতে হবে একটি “অভিযান” সম্পন্ন করতে।

তখন ফালমাতা বিয়ে করার জন্য খুবই কম বয়সের ছিলেন। আর “অভিযান” বলতে ঠিক কি বোঝানো হয়েছে তা তিনি জানতেন না। তাই বিয়ে এড়াতে রাজি হয়ে গেলেন অভিযানে অংশ নিতে।

প্রথমের দিকে ক্যাম্প দেখে ফালমাতার ভয় লাগতো। জঙ্গি আর সরকারী বাহিনীর যুদ্ধের ভয়ে দিন কাটাতেন সেখানে বন্দী ছেলেমেয়েরা, বিশেষ করে নারীরা।কারণ তাদের ভয় ছিলো যে, সরকারী বাহিনী এসে তাদেরকে জঙ্গিদের সহধর্মিনী মনে করে সরাসরি হত্যা করে ফেলতে পারে।

আকাশে হেলকপ্টার বা প্লেন যেতে দেখলে বন্দীরা আতংকিত হয়ে যেতেন, কারণ তাদের মনে হতো এই বুঝি নাইজেরিয়ান বাহিনী বোমা ফেলবে ক্যাম্পের উপরে। অনেকেই আতংকে কেঁদে ফেলতেন।

ক্যাম্পের জীবন খুবই একঘেয়ে ছিলো। ঘুম থেকে ওঠা, নামাজ পড়া, খাওয়া, পরিষ্কার করা, খাওয়া, নামাজ পড়া, পরিষ্কার করা… এভাবেই কাটতো প্রতিটা দিন।

প্রতিদিন সকলকে ধর্মশিক্ষা দেওয়া হতো এবং কুরআন থেকে তিলাওয়াত করা হতো।

ফালমাতা জানান, সবকিছু নিয়ে তার নানান অভিযোগ থাকলেও ধর্ম চর্চার অংশটি তার খুব ভালো লাগতো।

এভাবেই একঘেয়ে নিয়মের জীবনের মাঝে হঠাৎ বাধা পড়ে ফালমাতার। একদল সশস্ত্র জঙ্গি তাকে এসে জানায় একটি গুরুত্বপূর্ন কাজের জন্য তাকে প্রস্তুতি নিতে হবে।

তার চুল সোজা করা হবে, গায়ে মেহেদী দিয়ে আলপনা করা হবে, এমনটা শুনে ফালমাতা ভেবে বসলেন যে, তার বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বোধহয়। তাদের এক সহবন্দী এর আগে এক জঙ্গিকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলেন। তখন তার উপরে অনেকেই মনোক্ষুন্ন হয়েছিলো, ফালমাতা নিজেও রাগ করেছিলেন সেই মেয়েটির উপরে। তিনি বলেন, “এখন বুঝি সে খুব দুঃখে আছে। কেবলমাত্র বেঁচে থাকার স্বার্থেই সে বিয়েতে রাজি হয়েছিলো। সে আজও পালিয়ে যাবার কথা ভাবে”। ক্যাম্পের অন্য নারীরা ফালমাতাকে সাজিয়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

তিনি বলেন, “আমি শুধু ভাবছিলাম যে আমাকে বিয়ে করিয়ে ফেলানো হচ্ছে নাকি অন্য কিছু। কিন্তু তা জিজ্ঞাসা করা নিষেধ ছিলো তখন। বন্ধুরা কেবল সান্ত্বনা দিতে থাকলো আর ধৈর্য ধারন করার পরামর্শ দিচ্ছিলো”।

দুইদিন পরে, এক দল জঙ্গি এসে জোরপূর্বক তার শরীরে বেধে দেয় বোমা। তাকে বলা হয়, সে যদি নাস্তিকদের মেরে ফেলতে পারে, তাহলে সে সরাসরি বেহেশতে চলে যাবে। তার টার্গেট হবে বাজার কিংবা একই রকম অন্য কোন ভীড়ওয়ালা জায়গা।

তিনি বলেন, “ভয়ে আমি কাদছিলাম। তারা আমাকে শান্ত হতে বললো এবং বললো যে, সেটিকেই নাকি আমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে মেনে নিতে হবে। তারা আরো বললো যে, স্বর্গে যাওয়ার পরে সব কষ্ট মুছে যাবে।“

ক্যাম্পের আরো দুজন নারীর শরীরেও বোমা বাধা হয়েছিলো। তারপর তাদের তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হলো একটি গ্রামের সীমানার বাইরে। তাদের নির্দেশ দেওয়া হলো মানুষের ভীড় আছে এমন কোন স্থানের দিকে হেটে যেতে। তাদেরকে দূর থেকে কেউ একজন দেখতে থাকবে বলে জানানো হয়। তাদের হাতে দিয়ে দেওয়া হয় বোমা ফাটানোর ছোট্ট রিমোট।

হাটতে হাটতে এই তিনজন আলোচনা করছিলো যে তারা এই অভিযান সম্পন্ন করবে নাকি পালিয়ে যেতে চেষ্টা করবে। তাদের কি হুকুম মেনে চলা উচিত?নাকি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করা উচিত? তারা সিদ্ধান্ত নিলেন এই হামলায় তারা সহায়তা করবেন না।

একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে তিনি বোমার বেল্টটি দেখিয়ে তা খুলতে সহায়তা করতে বলেন। তা সম্পন্ন হলে তিনি একটি ছোট্ট ধুলিময় রাস্তা দিয়ে এগোতে লাগলে বেশিদূর যেতে না যেতেই তার সাথে দেখা হয় দুই ব্যক্তির। ফালতামা জানতেন না যে, সেই দুই ব্যক্তি বোকো হারামেরই সদস্য। ফালতামাকে দ্বিতীয়বারের মতো অপহরন করা হলো।

সানা মেহায়দালীকে আধুনিক সময়ের প্রথম আত্মঘাতী নারী বোমা হামলাকারী হিসেবে ধারণা করা হয়। ১৬ বছর বয়সী এই কিশোরী ১৯৮৫ সালে দক্ষিন লেবাননে নিজেকে এবং দুজন ইসরাইলো সেনাকে হত্যা করেছিল।

তখন থেকে হেজবুল্লাহ, কুর্দিশ পিকেকে, শ্রীলংকার তামিল টাইগার্স, হামাস এবং চেচনিয়ার ব্ল্যাক উইডো এর মত জঙ্গি সংস্থাগুলো নারীদের ব্যবহার করে আসছে জঙ্গি হামলার জন্য।

কিন্তু এই সব সংগঠনকে নির্মমতার দিক দিয়ে হার মানিয়েছে বোকো হারাম। নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, চাদ ও নাইজারে গত তিন বছরে শত শত নারীদের দিয়ে হামলা করেছে সংগঠনটি।

২০১৭ সালের শেষ পর্যন্ত ২৩২টি ঘটনায় ৪৫৪ জন নারী হয় মারা গিয়েছেন না হয় গ্রেফতার হয়েছেন। সেসব হামলার ঘটনায় ১,২২৫ জন মানুষ মারা গিয়েছেন এখন পর্যন্ত।

সংগঠনটি নারী ব্যবহার করে তাদের প্রথম হামলাটি করেছিলো ২০১৪ সালের জুন মাসে। ২৭৬ জন স্কুলগামী মেয়েকে অপহরনের পরপরেই ঘটেছিলো একটি সেনা ব্যারেকে হামলার ঐ ঘটনা।

এই হামলায় বোকো হারাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করে এবং চিন্তার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর তার পর থেকেই তারা হামলার অভিযানে ব্যবহার করে আসছে নারীদের।

আসা যাক ফালমাতার ঘটনায়। দ্বিতীয়বার অপহরনের পরে তাকে আবারও জঙ্গলের গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এবার তাকে আনা হয় একটি ভিন্ন ক্যাম্পে।কিন্তু এইখানের জঙ্গিরা সম্ভবত জানতো না যে সে একটি আত্মঘাতী হামলা পরিত্যাগ করে পালিয়েছেন, জানতে পারলে তখনি তাকে মেরে ফেলা হতো।

এই ক্যাম্পের চিত্র আগেরটির চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। সেই পুরাতন চক্রাকার রুটিন- খাওয়া, প্রার্থনা, পরিষ্কার করা।

নীম ফাউন্ডেশন নামের একটি সংস্থা জানায়, জঙ্গিদের হাত থেকে উদ্ধার করা নারী ও শিশুরা উদ্ধার হওয়ার পরেও বোকো হারামের বিশ্বাসগুলোকে নিজেদের মাঝে আগলে রাখে। বোকো হারামের হাতে বন্দীদের অনেকেই অশিক্ষিত। অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো পরিচিত হয়ে থাকে কুরআনের সাথে। জঙ্গিরা শতাধিক মানুষ ক্যাম্পে আটকে রাখে। তাদের সারাদিন তেমন কিছু করার থাকেনা বলে দিনে চার-পাঁচ ঘন্টা তাদেরকে ধর্মের চর্চা করানো হয়। ধর্মের ব্যবহার জঙ্গিদের একটি চমৎকার পন্থা।

এক মাস নতুন ক্যাম্পে থাকার পরে ফালমাতার সামনে আবার হাজির করা হলো সেই পুরাতন সিদ্ধান্ত- বিবাহ অথবা অভিযান। এবারেও তিনি বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালেন। পার্থক্য হলো, এবারে তিনি জানেন যে সেই অভিযানে আসলে কি হতে যাচ্ছে।

আবার তাকে মেহেদী দিয়ে রাঙ্গিয়ে সুন্দর জামা পরিয়ে গায়ে বোমা বেধে দিয়ে প্রস্তুত করা হলো। কিন্তু এবার জঙ্গিরা তাকে ছেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে তিনি দৌড়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়েন।

তিনি জানান, “আমার কিছু কৃষকের সাথে দেখা হলো। আমি তাদের জানালাম আমাকে জোর করে এক অভিযানে পাঠানো হয়েছে, আমি তা করতে চাইনা।তাদের কাছে বেল্টটি খুলতে সহায়তা চাইলাম আমি। তারা শুরুতে ভয় পেলেও পরে তাদের মনে মায়া জন্মে এবং তারা সেই বেল্ট খুলে দেন।“

ফালমাতা সেই কৃষকদের কাছ থেকে চলে গিয়ে আবারো জঙ্গলে অবস্থান করতে থাকেন এবং মাইদুগুরিতে নিজের পরিবারের কাছে কিভাবে ফিরে যাবেন তা ভাবতে থাকেন।

তার দেখা মেলে একদল শিকারীর, যারা তাকে জঙ্গল এলাকা পাড়ি দিতে সহায়তা দিতে রাজি হয়। কিন্তু সেই শিকারিরাও বোকো হারামের সদস্যদের হাতে মারা গেলে ফালমাতা আবারও জঙ্গলে ঢুকে যায়। তিনি জানান, “জঙ্গলের সাথে আমার তেমন পরিচিতি ছিল না। একটু শব্দ হলেই আমি ভয় পেতাম। রাতে কোন গাছে উঠে ঘুমাতাম”।

“আমি মনে হয় পুরো এক সপ্তাহ কোন খাবার ছাড়াই বেচে ছিলাম। মাঝেমাঝে একটু পানির দেখা পেলে তা পান করতাম এবং অযু করে নামাজ পড়তাম।দিনে তুই বা তিনবার নামাজ পড়তাম পানি খুজে পেলেই। আমি খুবই ভয়ে ছিলাম। কিন্তু আল্লাহ মুখ তুলে চাইলেন, আমি একটি ছোট শহরে পৌছাতে সক্ষম হলাম।“ স্থানীয় একটি পরিবার তাকে আশ্রয় দিয়েছিলো। তারাই তাকে মাইদুগুরি পৌছে দিতে সাহায্য করেছিলো।

পালানোর পরে কয়েক মাস পর্যন্ত ফালমাতা লুকিয়ে ছিলেন। তার ধারনা ছিলো প্রশাসনের মানুষেরা জানতে পারলে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে। ফালমাতা তারপরে তার মায়ের সাথে বসবাস করতে থাকলেন।

ফালমাতার মতো অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাওয়া মেয়েরা অনেক কঠিন সময়ের সম্মুখীন হয়ে থাকে। যারা নিজেদের বোমা বিস্ফোরন না করে ফিরে আসে,তাদেরকে নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে যায় “ডির‍্যাডিকালাইজেশন সেন্টার” এ। এই সংস্থাগুলো সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত। এর ভেতরে আসলে কি হয় তা সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায়নি।

জানুয়ারির মাঝামাঝি সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে তারা তাদের ঐ সংস্থা থেকে একদল মানুষকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু তারা এখন কোথায় তা কেউ জানে না। যারা খুব গোপনে তাদের পরিবারের কাছে ফিরতে সক্ষম হন, তারা নিজেদেরকে আড়ালেই রাখেন।

কোন মেয়ে বোকো হারামের সাথে দিন কাটিয়েছে জানতে পারলে তাদেরকেও জঙ্গিই মনে করে অনেকে। তাদের মনে হতে থাকে সেই মেয়েটি হয়তো তাদেরকে বোমা মেরে উড়িয়ে দিতেই এসেছে। ফালমাতা ১৪ বছর বয়সেই এমন বীভৎসতা দেখে ফেলেছেন।

বিস্ফোরনে অংশ না নিয়ে পালানোর পরে মুক্তির স্বাদ পেলেও তা প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘমেয়াদী হয়নি। সমাজের হাতে আজও সে বন্দীই থেকে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *