এক বিস্ময়কর ফ্রি-কিক ও এক স্বৈরশাসকের গল্প!

ফুটবল সংক্রান্ত যে কোনো মজার ভিডিওতে প্রায়ই একটা দৃশ্য দেখা যায়। ব্রাজিলের কিংবদন্তি রিভেলিনো আর জোয়ারজিনহো ফ্রি-কিক নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন ডি-বক্সের সামনে। বল জায়গামতো বসানো হয়েছে। তাদের সামনে প্রতিপক্ষ জায়ারের খেলোয়াড়রা দেওয়াল তুলে দাঁড়াচ্ছেন।

হঠাৎ কোনও পুর্বাভাস ছাড়াই দেয়াল ভেঙ্গে এক জায়ারিয়ান খেলোয়াড় বলে দুম করে শট মেরে দিলেন। আশেপাশে সবাই বিস্মিত চোখে ঘটনা দেখলেন। বিবিসি ধারাভাষ্যকার ঘটনাটিকে বর্ননা করলেন, “ আফ্রিকান অজ্ঞতার এক বিদঘুটে মুহুর্ত”। কিন্তু আসলেই কি অজ্ঞতা ছিল? নাহ, সেটা ছিলো জায়ারিয়ান খেলোয়াড়দের জীবন-মরণ প্রশ্ন। নিজেদের জীবন বাঁচানোর অসহায় কিন্তু মরিয়া চেষ্টা!

মবুতু বেলজিয়ামে আশ্রয় নেওয়া জায়ারের ফুটবলারদের ডেকে পাঠান। তাদেরকে দেশের বাহিরে যাওয়া নিষিদ্ধ করেন এবং ফুটবলের পেছনে প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করেন। জায়ারেতে ফুটবল জোয়ার আসে এবং অনেক মেধাবী খেলোয়াড় তৈরি হয়। এর ফলও পাওয়া যায় হাতে নাতে। জায়ারে ১৯৬৮ ও ৭৪ সালে আফ্রিকান নেশন্স কাপ জিতে নেয়। বিশ্বকাপ কোয়ালিফাই করার পর মবুতু আরও উতফুল্ল হয়ে ওঠেন।

খেলোয়াড়দের রাজকীয় সম্মান দেন তার বিলাস বহুল প্রাসাদে।  প্রত্যেক খেলোয়াড়কে তিনি দামী বাড়ি এবং একটি সবুজ ভক্সয়াগন গাড়ি উপহার হিসেবে দেন। মবুতু নিজে পশ্চিম জার্মানী ( ১৯৭৪ এর বিশ্বকাপ আয়োজক)  যাননি তবে দলের সাথে তিনি তার মন্ত্রীসভার সদস্যদের পাঠান, সাথে প্রচুর সশস্ত্র বাহিনী এবং কালোজাদু জানা ওঝাদের।

প্রথম ম্যাচে জায়ারে স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হয় এবং ২-০ গোলে হেরে যায়। এই হার মবুতুকে ক্ষুদ্ধ করে। তিনি জানিয়ে দেন খেলোয়াড়দের কোনও টাকা পয়সা দেওয়া হবে না। এই কথা শুনে জায়ারের খেলোয়াড়রা পরের ম্যাচে মাঠে নামার ব্যাপারে অনীহা দেখায়। বিশ্বকাপের ইমেজ বাঁচাতে স্বাগতিকরা পরের ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দেরকে ৩০০০ দয়েচে মার্ক দেয় যেন তারা খেলে। জায়ারে মাঠে নামলেও তাদের যে খেলায় মন ছিলো সেটা যুগোস্লাভিয়ার সাথে তাদের হারের ধরণ দেখেই বোঝা যায়। সে ম্যাচে ৯-০ গোলে হারার পর ক্ষিপ্ত মবুতু প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডদের পাঠিয়ে খেলোয়াড়দের হুমকি পাঠান, পরের ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে ৪-০ গোলে হারলে আর তাদেরকে জায়ারে ফিরতে দেওয়া হবে না।

ভীতসন্ত্রস্ত জায়ারের খেলোয়াড়রা জীবনবাজি রেখে ব্রাজিলের সাথে লড়াই করতে থাকে। কিন্তু ব্রাজিলকে আটকে রাখা কি আর সম্ভব। ৬৬ মিনিটের মধ্যেই ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া জায়ারে দল মরিয়া চেষ্টা করে আর গোল না খাওয়ার। এই অবস্থায় ব্রাজিল ফ্রি-কিক পেলে জায়ারের খেলোয়াড় মাভুবা বলে লাথি মেরে উড়িয়ে দিয়ে সময় নষ্ট করার চেষ্টা করেন। ৭৯ মিনিটে ব্রাজিল আরও একটা গোল করে। পরবর্তিতে তারা আর গোল করতে না পারলে জায়ারে ৩-০ গোলে ম্যাচ হারে এবং নিজেদের রক্ষা করতে পারে। খেলোয়াড়দের দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত সেটিই জায়ারের একমাত্র বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ হয়ে আছে।

পরবর্তীতে মবুতু ফুটবলের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং অন্য খেলায় মনোযোগ দেন। তার উদ্যোগে মোহাম্মদ আলী এবং জর্জ ফোরম্যানের বিখ্যাত বক্সিং ম্যাচ “ রাম্বল ইন দা জাঙ্গল” জায়ারেতে অনুষ্ঠিত হয়। জায়ারে ফুটবল দল দেশে ফিরতে পারলেও তাদের পরিনতি ভালো হয়নি। দ্রুতই তারা দরিদ্রতায় পতিত হোন।

গোলরক্ষক ১৯৯৬ সালে কর্পদকশুন্য অবস্থায় মারা যান। মভুবা রিফিউজি হিসেবে ফ্রান্সে আসেন এবং সেখানেই তিনি মারা যান ১৯৯৭ সালে। আর মবুতু এর স্বৈরাশাসনের পতন হয় ১৯৯৭ সালে, সে বছরেই মুত্রথলির ক্যান্সারে মরক্কোতে মৃত্যুবরণ করেন তিনি ।