বল কাহিনী: কোন বিশ্বকাপ খেলা হয়েছে কোন বলে

দুই দল। ২২ খেলোয়াড় আর তিন রেফারি। ১২০ মিটারের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে থাকা দুই গোলপোস্টের মাঝে টানা ৯০ মিনিট অবিরাম ‘ছোটাছুটি’। অথচ গ্যালারি-ভর্তি দর্শকের নজর দুলতে থাকে কেবল একটি বস্তুকে কেন্দ্র করে। শুধুই কি গ্যালারি? ক্যামেরার চোখে বিশ্বের শত কোটি মানুষের দৃষ্টি আটকে থাকে ওই একটি জিনিসেই। আর তা হলো, ফুটবল। আর সেটা যদি হয় বিশ্বকাপ, তবে তো কথাই নেই।

অবশ্য শুরুর দিকে ফুটবল খেলাটা এত উন্নত এবং দৃষ্টিনন্দন ছিল না। দিনে দিনে খেলাটি উঠে এসেছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এরই সঙ্গে এসেছে ফুটবলের উন্নত সংস্করণ। উন্নত ফুটবল তৈরির জন্য যুগের পর যুগ গবেষণা হয়েছে। এখনও চলছে। সেই ১৯৩০ সালের উরুগুয়ে বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে আসন্ন রাশিয়া বিশ্বকাপ পর্যন্ত বিবর্তিত হয়েছে ফুটবল। ভিন্ন নামে, ভিন্ন ঢংয়ে, আধুনিক এবং খেলার আরও উপযোগী করে তোলা হয়েছে এই ফুটবলকে।

ফুটবল তৈরির বিষয়টি উঠলেই সবার আগে আসে অ্যাডিডাসের নাম। ১৯৬৩ সাল থেকে ফুটবল তৈরি করে আসছে ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী এই জার্মান কোম্পানিটি। আর ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপের জন্য বল তৈরি করছে তারা, যা আজ অবধি চলছে। রাশিয়া বিশ্বকাপেও খেলা হবে অ্যাডিডাসের তৈরি বলেই।

বিশ্বকাপের বলের নাম ও ডিজাইনে সাধারণত আয়োজক দেশের ঐতিহ্যের ছাপ থাকে। যে ধারায় ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ‘জাবুলানি’ এবং ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে ‘ব্রাজুকা’ তৈরি করা হয়েছিল। তবে এবার আর সে পথে হাটেনি অ্যাডিডাস। বরং রাশিয়ার রঙিন ক্যানভাসে ফিরিয়ে এনেছে ৪৪ বছর আগের সেই সাদা-কালো টেলস্টারকে। যার অফিসিয়াল নাম দেয়া হয়েছে ‘টেলস্টার ১৮’। মূলত টেলস্টার তৈরির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ঐতিহাসিক বলটিকেই নতুন করে ফিরে এনেছে অ্যাডিডাস। আধুনিকতা আর প্রযুক্তির প্রতীক হিসেবে এর কালো প্যানেলে যুক্ত হয়েছে পিক্সেল।

১৯৬৮ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম খেলা হয়েছিলো টেলস্টার বলে। ১৯৭০ এবং ১৯৭৪ বিশ্বকাপেও খেলা হয়েছে এই বলেই। ১৯৭০ এর আগেও ৮টি বিশ্বকাপ হয়েছে। অ্যাডিডাস পূর্ববর্তী সেই যুগে কেমন ছিল বিশ্বকাপের বল?

১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে বিরতির আগে এবং পরে ভিন্ন ভিন্ন বলে খেলা হয়েছে। অবাক করার মতো বিষয় হলেও এটাই সত্যি। দুই ফাইনালিস্ট আর্জেন্টিনা ও স্বাগতিক উরুগুয়ে খেলেছে নিজেদের পছন্দ করা বল দিয়ে। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার পছন্দের বলে এবং দ্বিতীয়ার্ধে খেলা হয়েছে উরুগুয়ের বলে। এরপর অবশ্য এমন ঘটনা আর ঘটেনি। তখন থেকে অ্যাডিডাস যুগের আগ পর্যন্ত স্বাগতিক দেশই বল সরবরাহ করতো।

প্রথম বিশ্বকাপে খেলা ‘টি-মডেল’ নামের বলগুলো তৈরি হয়েছিল ইংল্যান্ডে। সে সময় অবশ্য ইংল্যান্ডই বেশিরভাগ বল তৈরি করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতো। এরপর আস্তে আস্তে আরো কিছু দেশ ফুটবল তৈরি শুরু করে। ১৯৩৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বকাপে মুসোলিনির ইতালি দাবি করে যে, বিশ্বাপের বল ইতালিতেই তৈরি হবে। সেবার ‘ফেডারেল ১০২’ নামে ১৩টি প্যানেলের বল সরবরাহ করে ইতালি। ১৯৩৮ সালে ফ্রান্স তৈরি করে ‘অ্যালেন’।

১৯৩০ সালে তোসোলিনি নামে একটি আর্জেন্টাইন কোম্পানি ফুটবল তৈরিতে ব্রেক থ্রু নিয়ে আসে। তারা একটি বল তৈরি করে, যেটির ভেতরে লুকায়িত থলি থাকে। যাতে বাতাস ঢুকিয়ে বলের প্রকৃত আকৃতিতে নিয়ে আসতে হতো। তবে এই বলটিকে বিশ্বকাপের উপযুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিতে দুই দশক সময় নেয় ফিফা। শেষ পর্যন্ত ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ‘ডুলপোট’নামের ওই বলে খেলা হয়।

প্রথম দিকের বলগুলোতে ছিলো ১২ অথবা ১৩টি প্যানেল। ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে প্রথম ব্যবহার করা হয় ১৮ প্যানেলের বল। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ট্রায়ালের মাধ্যমে বল নির্বাচন করে ফিফা। ১০০টি বলের মধ্যে নির্বাচিত হয় স্বাগতিক সুইডেনের কোম্পানি সিডসভেন্সকা লিডারোস রেমফাব্রিকেন-র তৈরি ‘টপ স্টার’ বলটি। এর বিশেষ গুণ ছিল জলরোধক মসৃণ উপরিভাগ।

মূলত প্রথম বিশ্বকাপের পর থেকে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে নিখুঁত ফুটবল তৈরির জন্য লাগাতার চেষ্টা চলেছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭০ সালে আলোর মুখ দেখাল অ্যাডিডাস। প্রথমবারের মতো নাম পেল বিশ্বকাপের বল, ‘টেলস্টার’। এর ফলে নতুন যুগে প্রবেশ করল বিশ্বকাপের বল। ৩২টি বিশেষ লেদার প্যানেল দ্বারা তৈরি বলটির বিশেষত্ব অনেক।

৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপই প্রথম টিভিতে সম্প্রচারিত বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা। আর সাদাকালো টিভিতে টেলিভিশনে সুস্পষ্ট দেখা যায় বলটি। কারণ, এতে ছিলো ১২টি কালো প্যানেল আর বাকিগুলো ছিলো সাদা। ‘টেলস্টার’ নামটিও এসেছে মূলত ‘টেলিভিশন’ এবং ‘স্টার’ শব্দ দুটি থেকে।

১৯৭৪ সালের জার্মানি বিশ্বকাপেও খেলা হয় ‘টেলস্টার’ বলে। যার অফিসিয়াল নাম ছিলো ‘টেলস্টার ডারলেস্ট’। এরপর টেলস্টারের জায়গা নেয় ‘ট্যাঙ্গো’। যা খেলা হয়েছে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা এবং ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপে। এটি সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল। ৮০ এবং ৯০ এর দশকে যারা ফুটবল দেখেছেন বা খেলেছন তাদের এই বলটি চিনতে মোটেও ভুল হবার কথা নয়।

এরপর মেক্সিকো, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং জার্মানি বিশ্বকাপে আধুনিক থেকে আধুনিকতর বল নিয়ে এসেছে অ্যাডিডাস। এরমধ্যে কিছু হয়েছে প্রশংসিত আবার কিছু বলের কারণে সমালোচিত হতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। সর্বশেষ ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের জন্য তৈরি ‘ব্রাজুক’ নিয়েও কিছু সমালোচনা ছিল।

তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে সমালোচিত বল ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের ‘জাবুলানি’। ফুটবল সংশ্লিষ্ট প্রায় সব পক্ষ থেকেই এসেছিলো সমালোচনা। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ফুটবলারদের মধ্যে অনেকেই দাবি করেছিলেন, খেলার মাঠে বলটির গতিবিধি অস্বাভাবিক।

তবে এবার আর কোনো সমালোচনা নয়, নয় কোন দেশ কিংবা ঐতিহ্যের ছাপ। রাশিয়াতে নিজেদের সেই টেলস্টারকেই আনছে অ্যাডিডাস। যেটির মাধ্যমে প্রথমবার লাখো কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর কেড়েছিল।

বিশ্বকাপের বল:

১৯৩০ উরুগুয়ে, টি মডেল

১৯৩৪ ইতালি, ফেডারেল ১০২

১৯৩৮ ফ্রান্স, অ্যালেন

১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ হয়নি

১৯৫০ ব্রাজিল, ডুলপোট

১৯৫৪ সুইজারল্যান্ড, সুইস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন

১৯৫৮ সুইডেন, টপ স্টার

১৯৬২ চিলি, ক্র্যাক

১৯৬৬ ইংল্যান্ড, স্লেজেঙ্গার চ্যালেঞ্জ

১৯৭০ মেক্সিকো, টেলস্টার

১৯৭৪ জার্মানি, টেলস্টার ডারলেস্ট

১৯৭৮ আর্জেন্টিনা, টাঙ্গো ডারলেস্ট

১৯৮২ স্পেন, টাঙ্গো স্পানা

১৯৮৬ মেক্সিকো, আজট্যাকা

১৯৯০ ইতালি, এতরুসকো উইনিকো

১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র, কুইস্ট্রা

১৯৯৮ ফ্রান্স, ট্রিকোলোর

২০০২ দক্ষিণ কোরিয়া/জাপান, ফেভারনোভা

২০০৬ জার্মানি, টিমগেইস্ট

২০১০ দক্ষিন আফ্রিকা, জাবুলানি

২০১৪ ব্রাজিল, ব্রাজুকা

২০১৮ রাশিয়া, টেলস্টার ১৮