বিশ্বকাপ ২০১৮: রাশিয়ার সামারা শহর, ফুটবল আর মহাকাশ জয়!

আগে যেখানে স্পুতনিক স্টেডিয়ামটা ছিলো এখন সেখানে আছে একটি হাউজিং ব্লক আছে। অরবিটা নামের মাঠের জায়গাটি এখন পতিত জমি, আর একটি মহাকাশগামী রকেটের নামে নামকরণ করা পুরাতন ভস্কহোড গ্রাউন্ড এখন ধ্বংসপ্রাপ্তির দিকে।

এই সবগুলোই রাশিয়ার বিশ্বকাপ আয়োজক শহর সামারা এর কয়েকটি পুরাতন ফুটবল মাঠের নাম। এই শহর সোভিয়েত ইউনিয়নকে পুরোদমে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মহাকাশ বিচরণের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিয়ে যেতে।

মস্কো থেকে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ভোলগা নদীর তীরে অবস্থিত সামারা শহরে এখন পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাশিয়ার দলের বিপক্ষে উরুগুয়ে জয় পেয়েছেও এই মাঠেই।

এই সামারায় কারখানায় তৈরি রকেটে করেই ১৯৬১ সালে প্রথম মানুষ হিসেবে মহাশূন্যে যান ইউরি গ্যাগারিন।

এই শহরে প্রায় ১.২ মিলিয়ন মানুষের বসবাস। এটিই রাশিয়ার মহাকাশ এবং উড্ডয়ন শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু ১৯৯১ সালে সাম্যবাদের বিলুপ্তির পরে যে দলগুলো এসব কারখানাগুলোর প্রতিনিধিত্ব করতো আর সেই দলগুলো যেখানে তারা খেলতো ফুটবল সেসবই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

ধরা যাক ভস্কহোড এর কথা। এই শব্দটির মানে হলো সূর্যোদয় কিংবা ঊষা। আবার এটি একটি রকেটের সিরিজের নামও বটে, যেগুলোর সাহায্যে মহাকাশে জেনিট রেনেসাঁ স্যাটেলাইট পাঠানো হয়েছিলো। সেই স্যাটেলাইটগুলো শীতল যুদ্ধের সময় পশ্চিমা দেশগুলোর উপরে নজরদারী করতো।

সোভিয়েত মহাকাশ প্রকৌশল কোম্পানী মোটরস্ত্রইটেল এর কারখানার ফুটবল দলের নামও ছিলো এটি। মোটরস্ত্রইটেল এখন আরেকটি বড় এন্টারপ্রাইজ জেএস্পস কুজনেটসভ এর অংশ। তারা এখনো রকেট ইঞ্জিন নির্মান করলেও আর ফুটবল খেলেনা। যেখানে ভস্কহোড দল খেলতো এখন তার থেকে ২০০ মিটার দূরে যাভোদস্কায়া শোসে তে সেই কোম্পানীর হেডকোয়ার্টার অবস্থিত।

একগাদা ময়লা আবর্জনার স্তুপ পেরিয়ে পরিত্যক্ত গাড়ি আর অনেক দিন না কাটা ঘাসের মাঝে হারিয়ে আছে সে মাঠ। ভঙ্গুর কংক্রীটের গ্যালারি, যেখানে রয়েছে ভাঙ্গা কাচের টুকরা, শ্যাওলা আর আবর্জনা।

মাঠের গোলপোস্টগুলো আজও আছে। কিছু শিশু সেখানে বল নিয়ে খেলা করে, আর অনেকে অন্যান্য খেলায় মাতে এই মৃত মাঠে। পূর্ণবয়ষ্করা মাঠের এক কোণায় বসে বিয়ার খেতে খেতে নানান প্রসঙ্গে আলাপে মাতেন।

অরবিটা স্টেডিয়ামে মাঠের আউটলাইন দেখা যায় কোনরকমে। ঢোকার মুখে যে কংক্রীটের সিড়ি ছিলো তা ভঙ্গুর আজ। সেই সিড়ির শেষ প্রান্তে এখন ঝোপঝাড়। বাজেভাবে বেকে গিয়েছে সেখানকার গোলপোস্টগুলো।

কিন্তু এটি গল্পের একটি দিক মাত্র। একই শহরে কাল্পনিক ইউএফও এর আদলে গড়ে তোলা হয়েছে ঝকঝকে নতুন স্টেডিয়াম। সেই স্টেডিয়ামে গত সোমবার রাশিয়া সমর্থকেরা মেতেছিলেন নিজ দেশের খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে। উরুগুয়ের কাছে ৩-০ গোলে হারলেও সমর্থকদের ভালোবাসায় কমতি ছিলোনা।

পরবর্তী সিজনে ৪৫,০০০ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই স্টেডিয়ামের দখল নিতে যাচ্ছে ক্রিলিয়া সোভেতভ নামের একটি দল। তাদের নামের মানে হলো সোভিয়েতের ডানা। এই দলটি গঠিত হয়েছিলো সেসব ফুটবলারদের দ্বারা যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাজিদের দখলে থাকা পশ্চিম রাশিয়া থেকে পালিয়ে এসেছিলো।

এমনকি যুদ্ধে যদি মস্কোর দখল হারিয়ে যেত, তাহলে রাশিয়ার রাজধানীও হতো এটি। সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিন এখানে একটি গোপন বাংকার বানিয়েছিলেন। সে সময় ডনবাস, মিন্স্ক, বাল্টিক স্টেটসহ অন্যান্য জায়গা থেকে এখানে অনেক নারী পুরুষ চলে এসে শহরের জনসংখ্যা প্রায় দুই লাখে উন্নীত হয়। তারা অনেক উড়োজাহাজও নির্মাণ করেছিলো।

ক্রিলিয়া নামের এই দলের সাথে মহাকাশ এবং উড্ডয়নশিল্পের কি ধরনের সম্পর্ক ছিলো তা জানার কৌতুহল জাগে। স্থানীয় ফুটবল জাদুঘর, যা কিনা কোন এক অদ্ভূত কারণে বন্ধ আছে, সেখানে দুইজন পরিচালকের মাঝে একজনের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। সার্গেই লেইব্রাড নামের সেই ব্যক্তির অবশ্য ফুটবলের প্রতি তেমন ভালোবাসা আছে বলে মনে হয়না। তিনি এবং আলেক্সি শেরনিশেভ মিলে ২০০৭ সালে জাদুঘরটি স্থাপন করেছিলেন কিন্তু তারা এমন সব মূল্যবান জিনিস সংগ্রহ করেছিলেন যেগুলো আজ থেকে আরো অনেক বছর আগের।

সেখানে আছে লেভ ইয়াশিন এর চিঠি, লুইস ভ্যান গাআল এর স্বাক্ষরিত ছবি, জ্যান কলারের অতিরিক্ত বড়মাপের দৌড়ের প্রশিক্ষণ যন্ত্র, আর আন্দ্রে কাঞ্চেস্কিস এর স্বাক্ষর করা টিশার্ট।

তাছাড়া রয়েছে সাবেক স্ট্রাইকার বোরিস কাজাকভ এর অনেক ছবি। তিনি ১৯৭৮ সালে এক মারাত্মক দুর্ঘটনায় মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন।

সার্গেই বলেন, “বর্তমানে মহাকাশ সংক্রান্ত কারখানা এবং ফুটবল দলগুলোর মাঝে কোন সম্পর্ক নেই। সাম্যবাদের বিলুপ্তির সময় সেটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। তখন বেশ খারাপ অর্থনৈতিক মন্দা হয়েছিলো। সব স্টেডিয়ামগুলোও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এটি অবশ্যই লজ্জার, কারণ ফুটবলের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেক। সামারা ১.২ মিলিয়ন জনসংখ্যার একটি শহর। কিন্তু এই শহরে পেশাদার ফুটবল দল আছে মাত্র একটি”।

সামারা শহরটির আরেকটি নামও ছিলো এক সময়। ১৯৯১ সালে এর নাম ছিলো কুইবিশেভ। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই শহর বিদেশীদের অগোচরে রাখতো।

এই সপ্তাহে এই শহর ভরে গিয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া সমর্থকদের দিয়ে। ডেনমার্কের কিছু সমর্থকও আগের ম্যাচ শেষে থেকে গিয়েছিলো। তবে সবচেয়ে বেশি বিদেশী সমর্থক ছিলো উরুগুয়ের।

এ শহর আজও ফুটবল ভালোবাসে। শহরের ছোট একটি ফুটবল দলের খেলোয়াড় সার্গেই ম্যারিশকো বলেন, “শহরে ছোটখাটো প্রায় ১৮০ টি দল আছে। নিয়মিত আরো নানান দল গঠিত হচ্ছে। এই বিশ্বকাপে রাশিয়া ভালো খেলছে, আর তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো বাড়বে সেই দলসংখ্যা”।

এটি সব জায়গার ক্ষেত্রে সত্যি। রাশিয়ার যেখানেই যাওয়া হোক, সকলেই ফুটবল নিয়েই আলোচনায় মগ্ন।

মজার ব্যাপার হলো, সেই ১৮০ টি দলের মাঝে ভস্কহোড দলও আছে। যারা শহরের নিম্ন পর্যায়ের টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে। তবে তাদের কারখানার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে এই নাম কেন দেওয়া হলো ক্লাবটির?

ম্যারিশকো বলেন, “কেবল ভালো লাগা থেকেই এমন নামকরণ”।