ভারত কেন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েও খেলেনি?

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ লোকের বাস দক্ষিণ এশিয়ায় । আরও নির্দিষ্ট করে বললে ভারতীয় উপমহাদেশে । কিন্তু এই বিপুল জনসংখ্যার এলাকা হওয়ার পরেও এই মহাদেশ থেকে কখনও কোনও দেশ বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি । অথচ তাদের কাছেও ছিল সুযোগ। ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে অংশ নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ সামনে আসলেও সেটাকে পায়ে ঠেলেছিল ভারত। কিন্তু কেন ভারত অংশ নেয়নি বিশ্বকাপে?

যেভাবে আসে সুযোগ

১৯৩৮ সালের পর টানা দুইটি বিশ্বকাপের আসর বিঘ্নিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারনে। এক যুগের ব্যবধানে, ১৯৫০ সালে আবার বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। সেবারের ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার কথা ছিল ১৬টি দেশের। স্বাগতিক দেশ ব্রাজিল এবং ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইতালী ছাড়া ৭টি দেশ আসে ইউরোপ থেকে, ৬টি আমেরিকা মহাদেশ থেকে এবং বাকি জায়গাটি জায়গা বরাদ্দ ছিল এশিয়ার জন্য। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার জন্য ফিফা এশিয়ার চারটি দেশকে আমন্ত্রণ জানায়। দেশ চারটি হলো: ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, বার্মা ( বর্তমান মায়ানমার) ও ভারত । এর মাঝে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও বার্মা আগেই ফিফাকে না বলে দিলে সুযোগ আসে ভারতের কাছে ।

তখন ভারতের ফুটবলের অবস্থা

বর্তমানে ভারতের ফুটবলের জীর্ন দশা হলেও সেসময় বেশ সমৃদ্ধই ছিলো ভারতের ফুটবল। ১৯৫০ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ছিল ভারতের ফুটবলের স্বর্নযুগ। এসময় এশিয়ার ফুটবলের অন্যতম বড় শক্তি ছিল ভারত। তবে ভারত প্রথম সারা বিশ্বের নজরে আসে ১৯৪৮ সালের অলিম্পিক আসরে। সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারত সেবারই প্রথম অলিম্পিকে অংশ নেয়। তারা ফ্রান্সের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায়। ম্যাচের ৭০ মিনিট পর্যন্ত তারা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে ম্যাচে ১-১ ব্যবধানের সমতা বজায় রেখেছিল।

কিংবদন্তি যা বলে

১৯৪৮ সালের অলিম্পিকে ভারত ফুটবল দল ভালো নৈপুণ্যের পাশাপাশি যে আরেকটি কারনে নজর কাড়ে তা হচ্ছে তাদের খেলোয়াড়দের খালি পায়ে খেলা। তবে ফিফা তাদেরকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেয়, খালি পায়ে কোনোভাবেই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া যাবে না। মানুষ এই গল্প বেশি বিশ্বাস করে যে, পর্যাপ্ত বুট না থাকার কারনে ভারত বিশ্বকাপে অংশগ্রহন করতে অস্বীকৃতি জানায়।

এছাড়া আরেকটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে যে, তখন এশিয়া থেকে ব্রাজিল যাওয়া সহজ কাজ ছিল না । দীর্ঘ জাহাজ ভ্রমন করে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত যাওয়া যেমন সহজ ছিল না, তেমনি ব্যয় সাপেক্ষও ছিল। তবে এই কথা ভিত্তি পায় না কারণ, ফিফা ভ্রমন খরচ দিতে রাজি ছিল। তবে একই কারনে বাকি তিন দেশও আমন্ত্রণ গ্রহন করেনি ।

প্রকৃত কারণ

ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের বিবৃতি অনুসারে “ দল নির্বাচনে মতঅনৈক্য এবং প্র্যাকটিস করার যথেষ্ট সময়” না থাকায় তারা বিশ্বকাপে অংশগ্রহন করার সিদ্ধান্ত নেয় । তবে ২০১১ স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে তৎকালীন ভারতীয় দলের অধিনায়ক শৈলেন মান্না বলেন , “ আমাদের বিশ্বকাপ নিয়ে কোনও ধারণা ছিল না । যদি থাকতো তাহলে আমরা নিজেরাই উদ্যোগ নিতাম যাওয়ার জন্য। সেসময় আমাদের জন্য অলিম্পিকই ছিল সবকিছু। কোনো কিছুই অলিম্পিক থেকে বড় ছিল না ।”

দুঃখের বিষয় হচ্ছে , ১৯৫০ সালে ফিফার আমন্ত্রণ পায়ে ঠেলার পর এশিয়ার এই চার দেশই পুড়ছে বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার আক্ষেপে। ভারত, মায়ানমার, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার ফুটবলে এখন যে অবস্থা তাতে ক্রীড়াবিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় এই টুর্নামেন্টে নিজেদের পতাকা উড়াতে আরও বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে তাদের।