লাতিন আমেরিকান ফুটবল কি মৃত্যুপথযাত্রী?

এই পর্যন্ত সকল বিশ্বকাপের আসরের মধ্যে প্রায় অর্ধেক শিরোপাই বাগিয়েছিলো দক্ষিণ আমেরিকার তিনটি দল। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে। কিন্তু ২০০২ সালের পর থেকে এই মহাদেশীয় দলগুলোর পারফরম্যান্স হতাশাজনক। গত তিনটি আসরেই বিশ্বকাপ গেছে ইউরোপে। এবারের বিশ্বকাপের শুরুতেও কিছুটা টালমাটাল হয়েছে লাতিন আমেরিকান পরাশক্তিগুলো। ফলে সব মিলিয়ে প্রশ্ন জাগছে যে, দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের কি তবে মৃত্যু ঘটছে?

চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের অর্ধেক খেলা শেষ। দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো এরই মাঝে হেরে বসেছে চারটি ম্যাচ, যা বিগত তিনটি বিশ্বকাপের চেয়ে বেশি। রাশিয়া বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া পাঁচটি দক্ষিণ আমেরিকান দলের মধ্যে কেবল ব্রাজিল এবং উরুগুয়ে এখন পর্যন্ত অপরাজিত রয়েছে।

এরই মধ্যে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে পেরু। তাদের প্রথম দুটি ম্যাচেই হেরে গিয়েছিলো তারা। এদিকে আর্জেন্টিনা এবং কলম্বিয়া দ্বিতীয় রাউন্ডে যাবে কি যাবেনা তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। দুইবারের শিরোপাজয়ী আর্জেন্টিনা একটি ম্যাচে ড্র করার পর হেরেই গেছে দ্বিতীয়টিতে।

দক্ষিণ আমেরিকা এমন এক মহাদেশ যেখানে মিলবে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম প্রধান কিছু স্টেডিয়াম, হৃদয় উজাড় করা ফুটবল ভক্ত আর তিনজন খেলোয়াড়, যাদের প্রত্যেকের যথেষ্ট কারণ আছে নিজেকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড় বলে দাবি করার- পেলে, ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি।

কিন্তু রাশিয়ায় এমন বাজে প্রদর্শনী এটিই জানান দেয় যে, ইউরোপ, যেখানে বিশ্বের নামীদামী সব খেলোয়াড়েরা ভীড় জমাচ্ছেন, সেই ইউরোপ এখন লাতিনদেরকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে পারফরমেন্সের দিক থেকে।

নাকি এটা একটা সাময়িক ঝড়? মেক্সিকোর ডিফেন্ডার মিগেল লাইউন বলেন, “আমি জানিনা আমি ভুল বলছি কিনা, কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো এই আসরে খুব বাজে খেলেছে। কিন্তু ফুটবল এখন বেশ সমশক্তির এক খেলা। আগে যেমন বিভিন্ন দলের মাঝে শক্তির পার্থক্য ছিলো এখন আর তেমনটি নেই খুব একটা”। মিগেল আরো বলেন, “আজ যে কোন দল যে কোন দলকে শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। আমরা দেখছি যে ‘ফেভারিট’ ব্যাপারটি দিনে দিনে অর্থহীন হয়ে পড়ছে। যারা ভালো খেলবে তারাই জিতবে”।

ইউরোপিয়ান লিগে সারা পৃথিবী থেকে বাছাই করে খেলোয়াড় নিয়ে আসা হয়, তাই যেসব দেশে দলগত ফুটবলে তেমন দাপট নেই, তাদের ভেতর থেকেও উঠে আসছে প্রতিভাবান মাঠ কাপানো খেলোয়াড়। যারা এসে পৃথিবীর সর্বোচ্চ প্রতিযোগীতামূলক লিগগুলোতে খেলছে। সেই খেলোয়াড়েরা দেশে ফিরে তাদের অর্জিত জ্ঞান বিলিয়ে দিচ্ছে জাতীয় দলের সতীর্থদের মাঝে। আর তা যে বেশ কাজে আসছে, তার প্রমাণ রাশিয়া বিশ্বকাপের আসরের ফলাফলগুলো।

পর্তুগাল ভুগেছে মরক্কোকে হারাতে, বহু কষ্টে তারা ১-০ গোলে জয় পেয়েছে। স্পেন ১-০ গোলে ইরানকে হারালেও মাঠে ভালো খেলে মন কেড়েছে ইরান। উরুগুয়ে শেষ মূহুর্তের গোলে জয়ের দেখা পেয়েছে মিশরের বিরুদ্ধে। আর সেনেগাল পোল্যান্ডের বিপক্ষে পেয়েছে এক ন্যায্য জয়।

দক্ষিণ আমেরিকান দলগুলো ভুগেছে বেশ, বিশেষ করে পেরু, যারা হেরেছে একেবারে শুরুর দুটি খেলায়। ৩৬ বছর বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়া এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।

গত আসরের পরাজিত ফাইনালিস্ট আর্জেন্টিনা এবার ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে চুরমার হয়ে গিয়েছে আর আইসল্যান্ডের বাধা টপকাতে না পেরে ১-১ গোলে ড্র করেছে। কলম্বিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়েছে জাপান।

এ কেবল দক্ষিণ আমেরিকার হার তাই নয়, দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলের এমন মরণপ্রায় অবস্থার মাঝে উন্নয়নশীল দলগুলোর উত্থানও লক্ষণীয়।

জার্মানীর মার্কো রিউস বলেন, “এই বিশ্বকাপে এটা পরিষ্কার যে, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর মনোযোগ যে দলের আছে তারা অনেক বেশি অর্জন করবে। আর তাই তথাকথিত ছোটদলগুলো তথাকথিত বড়দলগুলোকে চমকে দিচ্ছে প্রতি ম্যাচে। এই বিশ্বকাপের বৈশিষ্ট্যই এটি, পদে পদে নতুন সব চমক”।