কবে শুরু? কিভাবে এলো বর্তমান রূপে? পহেলা বৈশাখের আদ্যোপান্ত

পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। বাংলা ক্যালেন্ডার এর প্রথম পাতার প্রথম তারিখ। নতুনের আগমনী বার্তা, চৈত্রের দাবদাহ থেকে সকলের মুক্তি আর কৃষকের ঘরে নতুন ফসলের আনন্দের নাম পহেলা বৈশাখ। বাংলাদেশের সাথে ত্রিপুরা আর পশ্চিমবঙ্গে একসঙ্গে এই উৎসব পালন করা হয়। এপার ওপার দুই বাংলাতেই পহেলা বৈশাখ সরকারি ছুটির দিন। পৃথিবীর কোথাওই এত গভীর আবেগে নববর্ষ উদযাপনের রেওয়াজ দেখা যায় না।

বাংলা একাডেমি প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উদযাপনের জন্য দিন নির্ধারন করে। ১৯৭২ সালে (বাংলা ১৩৭৯) পহেলা বৈশাখ বাংলার জাতীয় পার্বণ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে প্রতি বছর চারুকলা ইনস্টিটিউট কর্তৃক আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রা ২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর ইউনেস্কোর মনগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বর্তমানে পহেলা বৈশাখ বিশ্বব্যাপী বাঙালির প্রাণের উৎসব হলেও এটি মুলত একটি লোকজ উৎসব। কৃষকের ফসল ঘরে তোলা, রাজার খাজনা আদায় আর দোকানির বকেয়া পরিশোধের দিনক্ষণ নির্ধারন করা হতো বাংলা বর্ষপঞ্জি দেখে। বাংলা ক্যালেন্ডার মূলত ফসলি ক্যালেন্ডার।

মোঘলরা ভারতবর্ষের ক্ষমতায় এলে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হতো ইসলামি বা হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। বাঙালির সংস্কৃতি আর আবহাওয়ার সাথে হিজরি ক্যালেন্ডার ছিল অনেকটাই অসংগতিপূর্ণ। তাই ইসলামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রাজা যখন খাজনা আদায়ে ব্যস্ত হতেন তখন অথবা ইসলামি উৎসবের সময়গুলোতেই মূলত সমাজে সমস্যাগুলো ধরা পরে। কারণ হিজরি ক্যালেন্ডার গননা করা হতো চাঁদ দেখে আর এই চাঁদের হিসাব প্রতি নিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই কৃষক সঠিক সময়ে খাজনা দিতে ব্যর্থ হতো আর সমাজে তৈরি হতো অসংগতি। আর এই খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য মোঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। কিন্তু উল্লেখ্য আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত এই ক্যালেন্ডার একদম আনকোরা নতুন ছিল না বরং বাংলার আদি বা প্রাচীন ক্যালেন্ডার সংস্কার করে নতুন ভাবে হাজির করা হয়।

সম্রাট আকববের নির্দেশে তার যোগ্যতম জোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সিরাজী নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করেন। এই নতুন বর্ষপঞ্জি মুলত প্রাচীন সৌর পঞ্জি শকাব্দ আর আরবি সনের ওপর ভিত্তি করে বাংলা নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরি করেন। শকাব্দ থেকে আসে বঙ্গাব্দ আর হিজরি তারিখ এর সাথে মিল রেখে শুরু হয় গণনা।

বাংলা সন গণনা শুরু হয় ৯৯৩ হিজরির ৮ই রবিউল আওয়াল বা ইংরেজি ১০ই মার্চ ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে। কিন্তু নতুন এই ক্যালেন্ডারকে মহিমান্বিত করতে তা কার্যকর করা হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহনের দিন ১৫৫৬ সালের ৫ই নভেম্বর থেকে। সেসময় চন্দ্র বা আরবি ক্যালেন্ডারে ৯৬৩ সাল হওয়ায় সেটাকেই বাংলা সনে রূপান্তর করা হয়। অর্থাৎ বাংলা ক্যালেন্ডার এর প্রাতিষ্ঠানিক প্রথম দিনেই এর বয়স ৯৬৩ বছর। আর নামকরণ করা হয় ফসলি সন, পরবর্তীতে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সেই হিসেবে বাংলা বর্ষপঞ্জির বর্তমান বয়স আসলে ৪৬৩ বছর।

বাংলা বার মাসের ধারণা বা নাম সৌর ক্যালেন্ডার বা শক বর্ষপঞ্জি শকাব্দ থেকেই আসে। এই কথা থেকে অবশ্য এটা প্রমাণিত হয় যে বাংলার বার মাস অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। যা এই অঞ্চলের আবহাওয়া আর সংস্কৃতির সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ। শকাব্দের প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু বাংলা তারিখ চালুর দিন অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরীতে চদ্র বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম মাসে ছিল বাংলা বৈশাখ মাস। তাই তখন থেকে বৈশাখ মাসকেই বাংলার প্রথম মাস হিসেবে আর বৈশাখের প্রথমদিন পহেলা বৈশাখকে বছরের প্রথমদিন হিসেবে গণনা শুরু হয়।

তখন খাজনা আদায়ের নিয়মটা করা হয় এমন যে বছরের শেষ দিনের মধ্যে অর্থাৎ চৈত্রের শেষ তারিখের মধ্যে সকল প্রজাকে খাজনা পরিশোধ করতে হবে। তাই প্রজাদের বছরের শেষ দিকে খাজনার চাপ মাথায় নিয়ে দিন পার করতে হতো। সবাই সকল খাজনা পরিশোধ করে এই বছরের মত নিষ্কৃতি পাওয়া গেছে উপলক্ষে মাসের শেষদিন নিজেরা একটা উৎসব করত, সেটাই বর্তমানে চৈত্র সংক্রান্তি।আর খাজনা পরিশোধ করা উপলক্ষে বছরের প্রথমদিন রাজ্যের সবাই জমিদার এর মেহমান হতেন। জমিদার তাদের মিষ্টি মুখ করাতেন আর পুরো রাজ্য জুরে চলত উৎসব।

নববর্ষ উদযাপনে বাংলা খাবারের আয়োজন

রাজার খাজনাতো দেয়া হয়েছে, এবার দোকানির বাকি পরিশোধ করার পালা, বছরের প্রথমদিনেই দোকানিরা উৎসবের অংশ হিসেবে হালখাতার আয়োজন করতেন। সবাই তাদের বকেয়া পরিশোধ করতেন আর দোকানির পক্ষ থেকে পেটপুরে মিষ্টি আর অন্যান্য মজাদার খাবার খেতেন। সব মিলে পুরো বাংলা জুড়ে চলত উৎসব। আধুনিক এই সময়ে এখন হিসাবপত্রের জায়গা অনেকটাই চলে গেছে কম্পিউটার-ল্যাপটপ-মোবাইলের দখলে। তবে লাল রঙের সালু কাপড়ে মোড়ানো টালি খাতায় নতুন বছরের হিসাব খোলার দীর্ঘ দিনের বাঙালি ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছেন অনেক ব্যবসায়ী। পুরনো বছরের দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতায় হিসাব খুলে তারা পালন করেন হালখাতা। দোকানিরা এখনো লাল রং এর যে খাতায় হিসেব লিখে রাখেন তার ওপরে লেখা থাকে এলাহী ভরসা। এই এলাহী শব্দটা এসেছে সম্রাট আকবরের প্রচারিত সমন্বয় মূলক ধর্ম (দীন-ই-ইলাহি বা উচ্চারণভেদে) দ্বীন-ই-এলাহী থেকে

ষাটের দশকে রমনার বটমূলে ছায়ানটের পয়লা বৈশাখ উদযাপন

আধুনিক যুগে ১৯১৭ সালে প্রথম বাংলা নববর্ষ উৎযাপন প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে বাংলাদেশে নববর্ষ উৎযাপন করা হয় সেটির পেছনে আছে একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরণে সাংস্কৃতিক জাগরণ। আইয়ুব সরকার রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ করলে ১৯৬৭ সালে ছায়ানট সাংস্কৃতিক এই চর্চার বিরুদ্ধাচারণ এর প্রতিবাদ স্বরূপ ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এসো হে বৈশাখ গানটি দিয়ে নতুন বছর উদযাপনের সূচনা করে।

আধুনিক যুগে ১৯১৭ সালে প্রথম বাংলা নববর্ষ উৎযাপন প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে বাংলাদেশে নববর্ষ উৎযাপন করা হয় সেটির পেছনে আছে একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরণে সাংস্কৃতিক জাগরণ। আইয়ুব সরকার রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ করলে ১৯৬৭ সালে ছায়ানট সাংস্কৃতিক এই চর্চার বিরুদ্ধাচারণ এর প্রতিবাদ স্বরূপ ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এসো হে বৈশাখ গানটি দিয়ে নতুন বছর উদযাপনের সূচনা করে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট এর উদ্যোগে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। আর এর পর থেকে এই আয়োজনের ব্যাপ্তি প্রতি বছরের চেয়ে প্রতিবছর বেড়ে চলেছে। আর এবছর মঙ্গল শোভা যাত্রা ৩০ বছরে পা রাখছে।

আগে একদম অজ পাড়াগাঁয়ে দেখা যেত মুসলমানদের ধর্মীয় বড় উৎসব ঈদের সময় মানুষ উৎসবে না মাতলেও পহেলা বৈশাখ বা নতুন বছরের অপেক্ষায় থাকত। নতুন বছরে ভাল রান্না করা, প্রতিবেশীদের সাথে উপহার বিনিময় করা, নতুন পোশাক কেনা, জামাই এনে আপ্যায়ন করা আর সবাই মিলে মেলায় যাওয়া তো আছেই। বর্তমানে পহেলা বৈশাখের উৎসব আর লোকজ সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং কর্পোরেট রূপ পেয়েছে। আর এই কর্পোরেট নববর্ষ উৎযাপনে স্থান করে নিয়েছে পান্তা ইলিশ।

কিন্তু বাংলার মুষ্টিমেয় সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বার বার বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি বলে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, আঘাত হানছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশে মঙ্গল শোভাযাত্রা জাতিসংঘের স্বীকৃতি যেমন পেয়েছে তেমনই এই উৎসব শুধুমাত্র রমনার বটমূল বা চারুকলা আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় উৎসবে পরিণত হয়ে উঠছে। ঈদ পূজার পাশাপাশি সরকারি কর্মজীবিরা এখন নববর্ষের উৎসব ভাতা পায়। ইংরেজি নববর্ষ আর বিদেশি আচার পালনে বাঙালি যখন হাঁপিয়ে উঠছিল তখন আত্মপরিচয়ে পরিচিত হতে পারার এই উৎসবে মানুষ কেন যোগ দেবে না? আত্মপরিচয় তো মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।