কেন ধুঁকছে পাটশিল্প? বিজেএমসি কেন লোকসানে চলছে?

বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি) যেন পড়ে গেছে অন্তহীন খাদে। অর্থনৈতিক সংকট মেটানোর জন্য গত এক দশকে বিজেএমসি-কে ৭,৪৭৭ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। তারপরও হাত পাতা বন্ধ হয়নি। সম্প্রতি পাটকলগুলোর ৩২,৭৪০ শ্রমিক ও কর্মকর্তার বেতনভাতা পরিশোধের জন্য সরকারের কাছে ৩৩৭ কোটি টাকা চেয়েছে বিজেএমসি।

২০১৫ সালে বাস্তবায়ন হলেও পাটকল শ্রমিকদের জন্য কার্যকর করা হয়নি অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল। এছাড়াও মাসের পর মাস বেতন না পাওয়ায় দেশজুড়ে আন্দোলনে নেমেছেন পাটকল শ্রমিকরা। সরকারের কাছ থেকে এই টাকাটা পাওয়া গেলে এই শ্রমিক আন্দোলনের অবসান হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিজেএমসির চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ নাসিম। তিনি এও জানিয়েছেন যে, ২০১৫ সালের জুন থেকে নতুন বেতন স্কেল কার্যকর করে বকেয়া পরিশোধ করার জন্য বিজেএমসি আরও ১৬০০ কোটি টাকা চাইতে পারে সরকারের কাছে।

বার বার শুধু প্রতিশ্রুতি; কাঙ্ক্ষিত বেতন-বকেয়া পাচ্ছেন না পাটকল শ্রমিকরা

তারপরও ২২টি পাটকল ও ৩টি অন্যান্য কারখানা নিয়ে গঠিত বিজেএমসি স্বনির্ভর হতে পারছে না। দুর্নীতি, পুরোনো প্রযুক্তি, অদক্ষতা, প্রতিযোগী মনোভাবের অভাব ইত্যাদি বিবেচনা করা হয় পাট শিল্পের এই দুরাবস্থার জন্য। ২০১০-১১ অর্থবছর বাদ দিলে ১৯৮০-র দশক থেকে আর একটি অর্থবছরেও লাভ দেখাতে পারেনি বিজেএমসি। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই এর লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৯৫ কোটি টাকা। গত বছরের পুরোটা সময়ে যা ছিল ৪৬৬ কোটি টাকা।

পুরোনো যন্ত্রপাতি
বিজেএমসির অধীনে থাকা কারখানাগুলোতে ১০,৮৩৫টি মেশিনের মধ্যে কর্মক্ষম অবস্থায় আছে ৪,৪৫২টি মেশিন। সেগুলোরও কর্মক্ষমতা দিন দিন কমছে। কারণ এগুলোর অধিকাংশই কেনা হয়েছে স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে। আর তারপর থেকে কোনো রকম আধুনিকীকরণ ঘটেনি। ফলে বিজেএমসির কারখানাগুলোর কার্যকারীতা ৫০ শতাংশেরও কম।

উচ্চমূল্যে পাট ক্রয়

বিজেএমসি প্রধানত অনেক বেশি পরিমানে কেনে তুলনামূলক নিম্নমানের জুট। বিজেএমসির জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সাদেক জানিয়েছেন, ৩০ শতাংশ কেনা হয় কিছুটা ভালোমানের টোসা সি-গ্রেড পাট, ৪১ শতাংশ কেনা হয় মধ্যম মানের আর ১৫ শতাংশ নিম্নমানের এসএমআর ক্যাটাগরির পাট। বাকি ১৪ শতাংশ কেনা হয় অন্যান্য ধরনের পাট। এই ক্রয়মূল্যও বাজারে পাটের যে গড় দাম, তার চেয়ে বেশি হয়।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিজেএমসি এক কুইন্টাল (১০০ কেজি) পাট কিনেছে ৪,৮১৯ টাকা দরে। কিন্তু পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে জানা যায়, সেসময় সবচেয়ে ভালো মানের পাটের গড় বাজারমূল্য ছিল ৪,৪১৬ টাকা। পরের বছরও একই চিত্র। এবার এক কুইন্টাল পাট বিজেএমসি কিনেছে ৪,৭১৩ টাকা দরে। অথচ সবচেয়ে ভালো মানের পাটের দর ছিল ৪,০০০ টাকা।

বিজেএমসির জেনারেল ম্যানেজার সাদেক এজন্য দোষ চাপিয়েছেন মধ্যসত্ত্বভোগীদের ওপর। তার ভাষায়, ‘অনেক সময় এমন সব পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন আমরা অর্থ সংকটের কারণে পাট কাটার মৌসুমে সেটা কিনতে পারি না।’ কিন্তু ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরের অডিট থেকে দেখা গেছে পাট ক্রয়ের সময় বিজেএমসির কিছু কর্মকর্তার দুর্নীতি জড়িত আছে।

উৎপাদন কমছে কিন্তু বেড়েই চলেছে উৎপাদনের খরচ

বিজেএমসির তথ্য থেকে দেখা যায়, কারখানায় উৎপাদন ক্রমেই কমছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে, টনপ্রতি ৯০,২০১ টাকা দরে ১.৬৬ লাখ টন পাট পণ্য উৎপাদন করেছে বিজেএমসি। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১.৩৪ লাখ টন। কিন্তু সেটা টনপ্রতি ১২৬,২৮৬ টাকা দরে।

বিজেএমসির কর্মকর্তারা এজন্য দায়ী করেছেন যন্ত্রপাতির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া এবং ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কারখানার চেয়ে অনেক বেশি বেতন দেওয়ার ব্যাপারটিকে। ২০১০ বেতন স্কেলে নুন্যতম মজুরি ছিল ৪,১৫০ টাকা। সেই জায়গায় ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কারখানায় সেটা ২,৭০০ টাকা। ২০১৫ সালের বেতন স্কেল (নুন্যতম মজুরি ৮,৩০০ টাকা) কার্যকর করলে সেই খরচটা আরও বাড়বে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দের সময় যেন জুলাই থেকে নতুন স্কেলে বেতন-বকেয়া পরিশোধ করা যায়- সেই বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করার অনুরোধ জানাবে সরকারকে। বিজেএমসির এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘সরকার নিজেই নতুন বেতন স্কেল ঘোষণা করেছে। এখন তারা যদি বিজেএমসি চালাতে চায়, তাহলে বাজেটে এই বরাদ্দ দিতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’

বিক্রয় উৎপাদন খরচের কম

বিজেএমসির উৎপাদন খরচ ৪০ শতাংশ বেড়েছে, তাই তারা সামগ্রিকভাবে পাট পণ্যের মূল্যও এই সময়ে ১১ শতাংশ বাড়িয়ে করেছেন টনপ্রতি ৯৫,৭১৩ টাকা। রপ্তানীর ক্ষেত্রেও সাত বছরে ৯ শতাংশ মূল্য বাড়িয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে করা হয়েছে টনপ্রতি ৮৬,৫৪৫ টাকা। আর দেশের অভ্যন্তরীন বাজারে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাট পণ্য বিক্রি হয়েছে টনপ্রতি ১২৮,০২০ টাকা দরে। যেটা সাত বছর আগের চেয়ে ১১.৫৭ শতাংশ বেশি। এত দাম বাড়ানোর পরও ২০১০-১১ অর্থবছরের পর থেকে বিক্রয়ের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি হচ্ছে।

রপ্তানি কমছে

উৎপাদন খরচের অনেক কম দামে বৈশ্বিক বাজারে বিক্রি করলেও বিজেএমসির রপ্তানীর পরিমান কমছে। ২০০০-০১ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমান ছিল ২.২৩ লাখ টন। সেটা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নেমে এসেছে ৮৬,৭৪০ টনে। ভারত, সুদান, থাইল্যান্ড, ইরান ও সিরিয়া ছিল বিজেএমসির পাট পণ্যের বড় পাচটি বাজার। সুদান ছাড়া অন্য সব জায়গাতেই রপ্তানির পরিমান কমেছে।

ভারত, সিরিয়া, ইরান, মিশর ও ইন্দোনেশিয়াতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানীর পরিমান ছিল ৪৯,৪০৭ টন। সেটা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নেমে এসেছে ১৩,৩০১ টনে।

কারখানার যন্ত্রপাতির কর্মদক্ষতা কমে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয় না এবং বায়ারদের অন্যান্য চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হয় না বলে উল্লেখ করা হয়েছিল ২০১৭-১৮ সালের বিজেএমসির বাৎসরিক প্রতিবেদনে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে। এরপর ভারতে বিজেএমসির রপ্তানীর পরিমান নেমে এসেছে ৮,৯৮৭ টনে। যেটা ২০১২-১৩ অর্থবছরে ছিল ৪৮,১৪০ টন।

বিক্রি কমেছে দেশের বাজারেও

পাটের ব্যাগ ব্যবহারে বাধ্যতামূলক আইনের পর ২০১৫-১৬ সালে এটা বিক্রি হয়েছিল ৪৪,৩২০ টন। কিন্তু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এসে এই অঙ্কটা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫,৪১৮ টনে। বিজেএমসি চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘আমাদের লোকসান অনেকখানি পুষিয়ে নেওয়া যাবে যদি দেশের বাজারে চাহিদা বাড়ে।’

ব্যবস্থাপনায় অ-ব্যবস্থাপনা

বিজেএমসির দুরাবস্থার পেছনে আরেকটি কারণ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অভিজ্ঞতার অভাব। ব্যবস্থাপনা পর্ষদ, চেয়ারম্যান ও ডিরেক্টরদের সাধারণত নিয়োগ দেওয়া হয় সিভিল সার্ভিস থেকে। যার মানে দাঁড়ায় তাদের এই শিল্প সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান নেই।

বিজেএমসির এক কর্মকর্তা বলেছেন যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যে কর্মকর্তারা থাকেন তাদের বেশিরভাগই অন্য বিভাগ থেকে এখানে এসেছেন। আর বেশিরভাগ জৈষ্ঠ্য কর্মকর্তাই এক বছরের কম সময় থাকেন। তিনি বলেছেন, ‘কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বিবেচনায় এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। এখানে কাউকে জবাবদিহিতার অধীনে আনার সুযোগ থাকে না। আর অদক্ষতা তৈরি হয়।’ ২০১৫ সালে বিজেএমসি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তৎকালিন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দোষারোপ করেছিলেন এটার ব্যবস্থাপনায় সরকারের দুর্বলতাকে। তিনি বলেছিলেন, ‘বর্তমান ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি না বদলিয়ে শুধু টাকা দিতে থাকলে এই লোকসানের ভার আরও বাড়তে থাকবে।’

ভুতে বেতন নিচ্ছে!

পাটকলগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভুতুরে কার্যকলাপও হয় বলে জানিয়েছেন এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। ২০১১-১২ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে দেখা যায়, কার্পেন্টিং জুট মিলে ২.২৮ কোটি টাকা বাড়তি পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে শ্রমিকদের বেতন দেখিয়ে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পুরো ব্যাপারটি নিয়ে একটা বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন বিজেএমসির চেয়ারম্যান নাসিম। তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এই লোকসান হচ্ছে। আর রাতারাতিই এটাকে একটা লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব না।

সরকারের কাছ থেকেও অর্থবরাদ্দটা একবারে পাওয়া যায় না বলে আক্ষেপ করেছেন বিজেএমসির চেয়ারম্যান। তিনি বলেছেন, ‘ফান্ডটা যদি একবারে পাওয়া যায় তাহলে অনেক কিছু করা যায়। আমাদের সমস্যা হলো যা দরকার তার চেয়ে আমরা পাই অনেক কম। ফলে আমরা আবার লোকসানে পড়ে যাই।’

তথ্যসূত্র: BJMC burdened with losses