কেন ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক?

পার্থ প্রতীম দাস

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ, খাদ্যে অর্জন করেছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। আর এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে বছরজুড়ে কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফলে। কিন্তু সেই সোনালী ধান কেটে ঘরে তোলার মৌসুমে শুরু হয়েছে কৃষকের হাহাকার। ধানের নায্য মূল্য না পেয়ে পাকা ধানে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে কৃষক। ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে দিন কাটাচ্ছে নিদারুণ কষ্টে। কেন কৃষক ধানের দাম পাচ্ছেন না? কেন লোকসান মাথায় নিয়ে ধান উৎপাদন করতে হচ্ছে কৃষককে?

চাল আমদানী
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সরকারি-বেসরকারিভাবে গত ১০ মাসে ২ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। আমদানির অপেক্ষায় রয়েছে আরও ৩ লাখ ৮০ হাজার টন চাল। ২০১৭ সালের মে মাসে হাওরে আগাম বন্যায় ফসলহানির পর সরকার চালের আমদানি শুল্ক উঠিয়ে দেয়। সরকার থেকে বলা হয়েছিল, এই ক্ষতির ফলে ঘাটতি হবে ১০ লাখ টন চালের। কিন্তু গত দুই বছরে দেশে প্রায় ৬০ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। গত নভেম্বরে সরকার ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনর্বহাল করে। এতে চাল আমদানি কমলেও বন্ধ হয়নি। অথচ বলা হচ্ছে যে, দেশে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত রয়েছে। তাহলে চাল আমদানী কেন? শুধুমাত্রই আমদানীকারকদের লাভের জন্য নয় কি?
২০১৬ সালে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ অর্থ পাচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩-১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে যত চাল বিদেশ থেকে আনা হয়েছে, তার আমদানি মূল্য ছিল টনপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার ডলার। অথচ এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের গড় মূল্য ছিল টনপ্রতি প্রায় ৫০০ ডলার। ওই বাড়তি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে সিপিডির প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়।

সরকারিভাবে ধান-চাল কেনায় শুভঙ্করের ফাঁকি
দেশে মোট যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়, তার মাত্র ৭-৮ শতাংশ সরকারীভাবে কেনা হয়। খুলনায় এবছর বোরো ধানের উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিকটন। সরকার খুলনা থেকে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে মাত্র ১ হাজার ৯০০ মেট্রিকটন! দেশের অন্যান্য জায়গাতেও পরিসংখ্যানটা কাছাকাছি।
সেই ধানটাও সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কেনার সময় চলে নানা দুর্নীতি-অনিয়ম। আর সরকারিভাবে যে শস্য সংগ্রহ করা হয়, সেখানেও ধানের পরিমাণ খুবই নগণ্য।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে এ বছর বোরো মৌসুমে ১ কেজি চাল উৎপাদনে ৩৬ টাকা খরচ পড়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ১০ লাখ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল, দেড় লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল এবং দেড় লাখ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করবে। কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা দরে সেদ্ধ চাল, ৩৫ টাকা দরে আতপ চাল এবং ২৬ টাকা দরে ধান সংগ্রহ করা হবে।
দেখা যাচ্ছে যে বেশি সংগ্রহ করা হচ্ছে চাল। বলতে গেলে সিংহভাগটাই। ধান মাত্র দেড় লাখ টন। চালটা কিন্তু সংগ্রহ করছে মিল মালিকদের কাছ থেকে। কৃষকের তাতে কোনো অংশগ্রহণ নাই। লাভ যা হওয়ার মিল মালিকদের হচ্ছে। এবং সেটা বেশ বিপুল পরিমাণেরই।
এবছর সারাদেশে কৃষকরা কমবেশি ১২ টাকা দরে ধান বিক্রি করেছেন। সর্বত্রই কৃষকের বিঘাপ্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে তিন থেকে চার হাজার টাকা। আর অন্যদিকে অনেক মিলমালিক এখন খুবই কমদামে ধান কিনে সেটা গুদামজাত করছেন। যা ধীরে ধীরে চাল করে বাজারে ছাড়া হবে।

ধানের কি হবে? চালকল মালিকদের মর্জি
আমদানি বেশি করার কারণে এখন নতুন ধান ওঠার পর কৃষকদের কাছ থেকে সেটা কেউ কিনছে না। ১৬ হাজার চালকলের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে প্রায় ১ হাজার চালকল। কারণ হিসেবে চালকলমালিকেরা বলছেন, তাঁদের কাছে থাকা পুরোনো চালই বিক্রি হয়নি। ফলে তাঁরা আর নতুন করে ধান কিনছেন না। কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, রংপুর, নওগাঁসহ বেশির ভাগ বড় মোকামে ধান-চাল কেনা প্রায় বন্ধ রয়েছে। চালকলমালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা পুরোনো চাল তাঁরা সরকারি গুদামে দিচ্ছেন। ফলে অন্যান্য ঋণ-দেনা শোধ ও খেয়েপড়ে বেঁচে থাকার তাগিদে সারা বছর ধরে কষ্টে ফলানো ধান কম দামেই বিক্রি করে দিতে হচ্ছে কৃষককে।

যে কৃষক সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসলটা উৎপাদন করছেন, তার সংশ্লিষ্টতা শুধু ধান পর্যন্তই। তারপর ‘কত ধানে কত চাল’ সেটা আমাদের বোঝায় মিলমালিক, গুদামমালিক, ফরিয়া-বেনিয়াদের সিন্ডিকেট। এই মধ্যসত্ত্বভোগীরা যতদিন আছে, ততদিন কৃষকদের-ভোক্তাদের কোনো ফায়দা হবে না।

আরও পড়ুন: কৃষকের ধান সংকট সৃষ্টিতে দায়ী মধ্যসত্ত্বভোগীরা