নগন্য মজুরিঃ তিনবেলা খাবার পাননা পোশাক শ্রমিকরা

দেশের বেশিরভাগ তৈরি পোশাকশিল্পের কর্মীরা তিনবেলা খাবার খেতে পারছেন না নামমাত্র মজুরির কারণে, এমনটাই জানা গিয়েছে অক্সফাম, অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায়।

এই গবেষণার প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা গিয়েছে যে, এখানে প্রতি ১০ জনের ভেতরে ৯ জন শ্রমিকই তাদের পরিবারের জন্য তিনবেলা খাবার জোগান দিতে পারেন না। ফলস্বরূপ তাদেরকে প্রায়ই উপোস দিতে হয়। তারা হয় পেট ভরে খেতে পান না অথবা তাদের মাথায় চেপে বসে ঋণের বোঝা”।

অক্সফাম অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট ফর লেবার স্টাডিস এবং ভিয়েতনামের ইন্সটিটিউট ফর ওয়ার্কার্স অ্যান্ড ট্রেড ইউনিয়ন সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের ও ভিয়েতনামের ৪৭০ জন শ্রমিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের সাক্ষাতকারের প্রেক্ষিতে একটি রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে যার শিরোনাম ‘মেড ইন পভার্টিঃ দ্য ট্রু প্রাইস অফ ফ্যাশন’।

সাক্ষাৎকার যারা নিয়েছেন তারা সকলেই অস্ট্রেলিয়ার পোশাক সাপ্লাই চেইন এর অংশ ছিলেন অর্থাৎ তারা সেখানকার কোন না কোন গার্মেন্ট কারখানায় কর্মরত ছিলেন এবং তারা অস্ট্রেলিয়ার যেকোন একটি বড় পোশাক ব্র্যান্ডে সরবরাহ করতেন। সম্প্রতি এই গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল প্রকাশ করেছে অক্সফাম অস্ট্রেলিয়া। জানা গেছে নিউ এইজ-এর একটি প্রতিবেদন থেকে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট উৎপাদক ও রপ্তানীকারক এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ সিদ্দীকুর রহমান অবশ্য এসব কথা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন যে বাংলাদেশের কোন শ্রমিক খাদ্যের অভাবে নেই। তিনি বলেন, “গার্মেন্ট শিল্প একটি আন্তর্জাতিক শিল্প। এসব গবেষণা করা হয় এমন শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য”।

জনাব সিদ্দীক জানান যে এই ৪৭০ জন শ্রমিক সম্পূর্ণ শিল্পটিকে উপস্থাপন করেনা। তিনি জানান এর চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি শ্রমিক এই কাজের সাথে নিযুক্ত।

গবেষণার রিপোর্টে জানা যায়, অস্ট্রেলিয়াতে আমদানী করা কাপড়ের ১০ শতাংশ আসে বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনাম থেকে। এখানে বাজার বাড়ছে, কিন্তু এই বাজার গড়ার পিছনের কারিগর শ্রমিকেরা স্বল্প মজুরির ছোবলে জর্জরিত। গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে যে অস্ট্রেলিয়ার ফ্যাশন শিল্প বৃহত্তর হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনামের শ্রমিকেরা অন্যায় ও নানান বাধা বিঘ্নের শিকার হচ্ছে।

রিপোর্টে বলা হয়, “২০১৫ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটি বড় কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারেরা ফিরে আসায় অস্ট্রেলিয়াতে বিক্রয় বেড়েছে ৮১ শতাংশ। কেমার্ট এবং কটন অন এর মত বড় ব্র্যান্ডগুলো তাদের বাৎসরিক আয় বাড়িয়েছে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এধরণের কোম্পানির হাতেই ক্ষমতা ও সামর্থ আছে এমন অসম মজুরি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করার”।

গবেষণায় দেখা যায় যে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বড় ব্র্যান্ডের কাছে পণ্য বিক্রয় করা কোম্পানিগুলোর মাঝে বাংলাদেশের ৭২% এবং ভিয়েতনামের ৫৩% শ্রমিক অসুস্থ হলে বা আহত হলে চিকিৎসা সেবা পাননা।

আরো জানা যায় যে, বাংলাদেশী শ্রমিকদের মধ্যে ৭৬ শতাংশের বাড়িতে সরাসরি পানি সরবরাহ নেই। ভিয়েতনামের প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমিক পানির জন্য কুয়া কিংবা বৃষ্টির উপরে নির্ভরশীল।

বাংলাদেশে সাক্ষাৎকার দেওয়া প্রতি তিনজন শ্রমিকের মধ্যে একজন তার স্ত্রী-সন্তানদের থেকে দূরে থাকেন। এর মধ্যে ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই কারণ হিসেবে বলেছেন অপর্যাপ্ত আয়ের কথা।

রিপোর্টে আরো জানা যায় যে এই সাক্ষাতকারে অংশ নেওয়া বাংলাদেশী শ্রমিকদের সকলে এবং ভিয়েতনামের শ্রমিকদের ৭৪% শ্রমিক প্রয়োজনের তুলনায় কম আয় করছেন।

বাংলাদেশের শ্রমিকদের ৯১% বলেছে যে তারা যা আয় করে তা দিয়ে তাদের এবং তাদের পরিবারের পুরো মাসের খাবারের খরচ উঠে আসেনা। তাদের খাদ্য তালিকায় থাকে ভাত, ডাল আর আলু। অনেক দিন তারা কেবল মরিচ দিয়ে পান্তাভাত খেয়ে পার করে দেয়। এতে করে সারাদিন ক্ষুধা কম লাগে।

এই গবেষণা বলছে যে ব্র্যান্ডগুলো দর কষাকষি করে পণ্যের মূল্য কম দেওয়ার কারণে কারখানা মালিকেরা শ্রমিকদেরকে পর্যাপ্ত মজুরি দিতে সক্ষম হননা। এই রিপোর্টে কয়েকজন কর্মীর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়। তিন সন্তানের জননী চামেলী চাকরি করেন এমন এক গার্মেন্টে যারা অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বিগ ডাব্লিউ-তে রপ্তানী করে। চামেলীর মাসিক আয় মাত্র ১৩,৫০০ টাকা। চামেলী, তার স্বামী আর তিন কন্যা সকলে মিলে একটি মাত্র ছোট রুমে বাস করেন। সেই রুমের আয়তন মাত্র নয় বর্গমিটার, তার মেয়েরা মেঝেতে ঘুমায়।

তার পরিবার বেশিরভাগ সময়ই বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা ধার করে থাকেন। চামেলির চার বছর বয়সী ছেলে দুর্ঘটনাবশত পানিতে ডুবে মারা যায় এবং স্বামী হার্ট এটাকের শিকার হয়েছিল।

মৌলিক চাহিদার কোনটিই সঠিকভাবে দেওয়া সম্ভব হয়না তিন মেয়েকে। চামেলী ও তার স্বামী মিলে এই তিন শিশুকে স্কুলে পাঠাতে পারেন না। সবচে বড় মেয়ের বয়স ১৪ বছর, তার মাকে অনুসরণ করে গার্মেন্ট কর্মী হবার পথেই এগোচ্ছে।

এই গল্প কোন একজনের গল্প নয়, বরং পুরো একটি সিস্টেমের চিত্র। বিশেষ করে নারীদের। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের মধ্যে ৯৯ শতাংশই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত সময় ধরে কাজ করেন। এদের মাঝে ৫৫% শ্রমিক নিয়মিত ৩ ঘন্টার বেশি ওভারটাইম করেন।