পরবর্তী অগ্নিকান্ডের মোক্ষম জায়গা কি মিরপুর?

ঢাকা শহরে অগ্নিকান্ডের কথা চিন্তা করলেই প্রথমে আসে পুরান ঢাকার কথা। বিশেষজ্ঞেরা এই তালিকায় যুক্ত এবার করেছেন মিরপুরকে। তারা বলছেন, ঢাকার ঝুকিপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে মিরপুর অন্যতম। জানা যাচ্ছে ঢাকা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদন থেকে।

১৪টি সেকশন নিয়ে গঠিত এলাকা মিরপুরকে নিয়ে যদি এখন থেকেই সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে এই এলাকাটি থেকে যাচ্ছে বড় ধরণের ঝুকির মাঝে।

দমকল বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করেন, ঘনবসতির মিরপুর এই ঝুকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় অন্যতম, কারণ এখানে অপরিকল্পিতভাবে হচ্ছে নগরায়ন, চিন্তাভাবনা ছাড়াই গড়ে উঠছে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভবন যেমন গার্মেন্ট, শিল্পকারখানা, মার্কেট এবং অন্যান্য অফিস। খালসহ অন্যান্য জলাধার ভরাট করে এসব ভবন নির্মিত হচ্ছে। অনুমোদন ছাড়াই সুউচ্চ ভবন গড়ে তোলা হচ্ছে যেখানে সেখানে।

অগ্নিকান্ড ঘটার পিছনে যেসব কারণ আছে তার ভিতরে রয়েছে সরু রাস্তাঘাট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দোকানে অগ্নি নির্বাপনের ব্যবস্থার অভাব, অবৈধ বৈদ্যুতিক লাইন ইত্যাদি। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী এ্যাসোসিয়েশনের (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “যদিও মিরপুরের বাসিন্দারা নতুন শহরের অনেক সুবিধা ভোগ করছেন কিন্তু একই স্থানে একই সাথে আবাসিক ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন ঝুকিপূর্ণ”।

এর পাশাপাশি মিরপুরে বেশ কিছু বস্তি এলাকা রয়েছে যেগুলোতে আগুন লাগার ঝুকি রয়েছে। মিরপুর ১৪ নম্বরের এক বস্তিতে এর আগে আগুনে এক হাজার বাড়ি পুড়ে গিয়েছিল, লাশ পাওয়া গিয়েছিল দুটি শিশুর।

২০১০ সালে নিমতলী ট্রাজেডির পরে সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিলো যারা ১৭টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিল গুদামঘর জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরিয়ে অনাবাসিক কোন এলাকায় নিয়ে যেতে। তারা নতুন কিছু আইনও প্রনয়ন করেছিল। তারা বলেছিলো শহরের বিভিন্ন স্থানে ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন করার জন্য। এছাড়া স্কুল কলেজের পাঠ্যসূচীতে অগ্নি দুর্ঘটনার ব্যাপারে সচেতনতামূলক বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত করতে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে হয়তো চকবাজারের এই মর্মান্তিকতা এড়ানো সম্ভব হত।

রিজওয়ানা বলেন, “এ থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে আমাদের শিক্ষা হয়নি এবং আমরা কোন ঘটনা থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করিনা”। তিনি আরো বলেন, “মিরপুরের উন্নয়ন ঘটেছে খাল ও অন্যান্য পানির উৎস ভরাট করে। যখন কোন জরুরি অবস্থা সৃষ্টি হবে তখন পানি পাওয়া কঠিন হবে”।

মিরপুরে যদি এখন কোন অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে তাহলে দমকল বাহিনীর বড় ট্রাকগুলো সেখানকার সরু গলিগুলোর ভেতর দিয়ে ঢুকতে পারবেনা। ফলে মৃত্যু ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাবে। প্রখ্যাত নির্মাণ প্রকৌশলী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেছেন সারা শহরেই অগ্নিকান্ডের ঝুকি রয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত জনবসতি বৃদ্ধি ও নগরায়নের কারণে মিরপুর এই তালিকার সবচেয়ে উপরে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান বলেন, “মিরপুরে অবৈধ রাসায়নিক গুদামঘর রয়েছে। এগুলো অপসারনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন এবং রাজউকের।” তার মতে তাদের পর্যাপ্ত লোকবল নেই এই সংকট মোকাবেলা করার মত।

রাজউক সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, “মিরপুরে এখনো কিছু পানির উৎস আছে। কিন্তু এর বেশিরভাগই ব্যক্তিমালিকানাধীন। তারা সেখানে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলে তারা আমাদেরকে আদালতে নিয়ে যাবে”।

তিনি আরো বলেন, “রাজউক চেষ্টা করেছে গুদামঘরগুলো উচ্ছেদ করার। কিন্তু উচ্ছেদ করার কিছুদিন পরে বাড়িমালিকদের সহায়তায় আবারো সেসব ফিরে আসে”।