বার বার শুধু প্রতিশ্রুতি; কাঙ্ক্ষিত বেতন-বকেয়া পাচ্ছেন না পাটকল শ্রমিকরা

২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন দেয় মন্ত্রীসভা। সেবছরের জুলাই থেকে এটি কার্যকর হয়েছে প্রায় সব সরকারী অফিস ও কর্পোরেশনে। কিন্তু চার বছর পরও দেশের ২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ৬০ হাজার শ্রমিক এই বেতন স্কেল কার্যকরের অপেক্ষায় আছেন। অথচ পাট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ জুট মিল কর্পোরেশনের অধীনে সব কর্মকর্তা-কমর্চারী নতুন স্কেলেই বেতন তুলছেন।
এগুলোরও বাইরে, শ্রমিকরা গত ছয় থেকে ১২ সপ্তাহ কোনো বেতনই পাচ্ছে না। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদক খুলনা ও রাজধানীর ডেমরা অঞ্চল সরেজমিন করে দেখেছেন যে, আক্ষরিক অর্থেই অনেকে না খেয়ে আছেন। কারখানার অন্যান্য কর্মকর্তারাও গত দুই থেকে চার মাস যাবত বেতন পাচ্ছেন না।

এমন একটা পরিস্থিতিতে ১৩ মে থেকে সব রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডেকেছেন শ্রমিকরা। অষ্টম বেতন স্কেল কার্যকর ও সব বকেয়া পরিশোধসহ নয় দফা দাবি তুলে ধরেছেন তারা। এছাড়াও দিয়েছেন প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ অবরোধের কর্মসূচিও। ডেমরার লতিফ বাওয়ানি জুট মিলের এক শ্রমিক বলেছেন, ‘আমরা মজুরি পাচ্ছি না। নতুন বেতন স্কেলে বেতন পাচ্ছি না। এটা কি আমাদের ন্যায্য দাবি আর মানবাধিকারের প্রশ্ন না? আমরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও হাই কোর্টকে বলছি যেন তারা সরকারকে বলে আমাদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে।’

গত ১৫ এপ্রিল শ্রমিক নেতারা একটা বৈঠক করেছিলেন বিজেএমসি সভাপতি ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। সেই বৈঠকের পর শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে একটা নির্দেশ জারি করা হয়েছিল ২৫ এপ্রিলের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ করার জন্য। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ এখনও সেটা পরিশোধ করেনি।

সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এখন কোনো প্রতিশ্রুতিতেই আস্থা পাচ্ছেন না শ্রমিকরা। পাট শ্রমিক লীগের সভাপতি সরদার মোজাহার উদ্দিন বলেছেন, ‘অনেক হয়েছে প্রতিশ্রুতি। বকেয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত আমরা রাস্তা ছাড়ছি না।’

২০১৫ সালে নতুন বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল পাঁচ বছর পর। কয়েক মাসের মধ্যেই দেখা গেছে যে প্রায় ২৩ লাখ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন স্কেলে বেতন পাচ্ছেন। কিন্তু পাটকল শ্রমিকদের কাছে কিছুই আসেনি। অনেক প্রতিবাদ, রাস্তায় নামার পর গত বছরের অক্টোবরে এই নতুন বেতন স্কেল নিশ্চিত করার নির্দেশ এসেছিল শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে। তারা পাট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। কিন্তু পাট মন্ত্রণালয় থেকে কিছুই করা হয়নি।

বিজেএমসির এক কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে বলেছেন যে, বেতন-বকেয়া পরিশোধের কাজটা এই মাসের মধ্যেই শেষ হবে আর আগামী মাস থেকে এটা কার্যকর হবে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বকেয়া বেতনের মোট ১৬০০ কোটি টাকা দুই দফায় পরিশোধ করা হবে। প্রথমটা এই অর্থবছরে। আর দ্বিতীয়টা পরের অর্থবছরে। নতুন স্কেলে শ্রমিকদের নুন্যতম মজুরি ৪,১৫০ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৮,৩০০ টাকায়।

কিন্তু লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে ১৪ বছর ধরে কাজ করা শ্রমিক রিতা রানী এরকম ‘ফাঁকা প্রতিশ্রুতি’ অনেক শুনেছেন, ‘ম্যানেজার আর কর্মকর্তাদের বেতন অনেক বেড়েছে। কিন্তু আমাদের জন্য কি করা হয়েছে? আমাদেরকে এমনকি বেতনটাও দেয় না। আমরা খাবো কী?’ গত আট সপ্তাহ ধরে বেতন পাচ্ছেন না রিতা রানী।

ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার পাটকল শ্রমিকরা

৪৫ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগম এর আগে কখনো বেতনের দাবিতে রাস্তায় নামেননি। কিন্তু এবার আট সপ্তাহ বেতন না পাওয়ায় নিরুপায় হয়ে তাকে নামতে হয়েছে। কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না কিভাবে পাঁচ সদস্যের পরিবারকে খাওয়াবেন। আনোয়ারা বলেছেন, ‘সেহরিতে পান্তা ভাত আর আলুসেদ্ধ খেয়েছি। ইফতার করেছি ভাত আর কলমি শাক দিয়ে।’ শুধু তিনি একা নন, পাট শ্রমিকদের অনেকেই বলেছেন একই রকম অভিজ্ঞতার কথা। কেউ কেউ সেহরি করতে পারেননি জন্য রোজাও রাখতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।

পাট কল কর্তৃপক্ষ বলছে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা লাভ করতে পারছেন না। গত বছর এই সেক্টরে লোকসান ছিল ৪৬৬ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যবস্থাপকদের ব্যর্থতার ভার শ্রমিকরা কেন নিতে যাবে আর কেন দুর্ভোগ সহ্য করবে? জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন যে, তেমনটা করাও উচিৎ না, “পাট শিল্প খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে। কিন্তু এটাই শ্রমিকদের আয়ের উৎস। তারা যদি বেতন না পায় তাহলে কিভাবে বাঁচবে? সরকারের উচিৎ শ্রমিকদের সব বকেয়া বেতন পরিশোধ করা এবং তারা যেন কাজে ফিরে যায়- সেটা নিশ্চিত করা।”