সারাক্ষণই আগুনের শঙ্কায় আছে পুরান ঢাকা

অল্প কয়েকদিন আগেই পুরান ঢাকার চকবাজারে মর্মান্তিক এক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে ৭০ জনেরও বেশি মানুষ। এর আগে ২০১০ সালে নিমতলি অগ্নিকাণ্ডেও প্রাণ গিয়েছিল শতাধিক মানুষের। তবে শুধু এই বড় অগ্নিকাণ্ডই না, অসংখ্য রাসায়নিক গুদাম, প্লাস্টিক ও অন্যান্য কারখানার কারণে সারাক্ষণই আগুনের আশঙ্কা নিয়ে দিনযাপন করছে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা। গত এক বছরে লালবাগ, হাজারিবাগ, সদরঘাট, সিদ্দিকবাজার ইত্যাদি এলাকায় অন্তত ৪৬৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই এলাকাগুলোতে ৫০০টিরও বেশি রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা চলছে বেআইনিভাবে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য থেকে দেখা যায়, গত বছরে গড়ে প্রতিদিন অন্তত একটি করে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে পুরান ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে। সেখানে হতাহতের ঘটনা অবশ্য কম। গত বছর একজন মারা গিয়েছিলেন আর দুজন আহত হয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য সামগ্রী ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ টাকার হিসেবে প্রায় সাত কোটি।

গত বছর পুরান ঢাকায় সবচেয়ে বেশি আগুনের ঘটনা দেখা গেছে সিদ্দিক বাজারে। সেখানে ১৬৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় দুই কোটি টাকা। এরপর আসে হাজারিবাগের নাম। সেখানে ১৬০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা।

ফায়ার সার্ভিসের ডিরেক্টর জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি আহমেদ খান বলেছেন, ‘এরকম ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা থেকে বোঝা যায় পুরান ঢাকা কতটা বিপদের মুখে আছে। আপনি সেখানে হাঁটলেই দেখতে পাবেন আবাসিক ভবনে বিভিন্ন রাসায়নিক, প্লাস্টিক, কসমেটিকস, রাবার ও নেইল পালিশের গুদাম বা কারখানা। যে কারণে এই জায়গায় অগ্নিকাণ্ড ঘটার আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি হয়।’

পুরান ঢাকাকে চারটি অঞ্চলে বিভক্ত করে গত বছর একটি জরিপ পরিচালনা করে ফায়ার সার্ভিস। যা থেকে দেখা যায় সেখানে ৫৩৭টি রাসায়নিক গুদাম আছে। অঞ্চলগুলো হচ্ছে লালবাগ, হাজারিবাগ, সদরঘাট ও সিদ্দিকবাজার।

এর মধ্যে সদরঘাটে আছে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ রাসায়নিক গুদাম। ৩৭৯টি। এরপর লালবাগে আছে ৮৭টি। বেশ কয়েকবার এসব এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়েছে ও মোবাইল কোর্টের সহায়তায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আলি আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিরোধীতার মুখে আমাদের সেসব পদক্ষেপ স্থগিত করতে হয়েছে।’

২০১০ সালের নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে পুরান ঢাকা এলাকায় আর কোনো রাসায়নিক গুদাম বা কারখানা স্থাপনের লাইসেন্স ইস্যু করেনি ফায়ার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট। গত বছরের এই জরিপের পর কিছু পরামর্শ ও সুপারিশনামা হাজির করা হয়েছিল ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে। কিন্তু কিছুই বদলায়নি।

সম্প্রতি চকবাজার, উর্দু রোড, আগামসি লেন, সিদ্দিকবাজার, শহীদনগর, ইসলামবাগ ঘুরে দেখা গেছে অনেক আবাসিক ভবনে রাসায়নিক গুদাম আছে। কিছু ভবনে প্লাস্টিক ও রাবার কারখানা আছে। কিছু ভবনে আছে জুতার কারখানা। সাম্প্রতিক সময়ে চকবাজার অগ্নিকাণ্ডের জন্যও দায়ী করা হয়েছে আবাসিক ভবনে রাসায়নিক দ্রব্যাদি রাখার ব্যাপারকে। সেই সঙ্গে ভবনের ধরন, সরু রাস্তা, আশেপাশে প্রাকৃতিক কোনো পানির উৎস না থাকা ইত্যাদি কারণেও পুরান ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে আগুন নেভাতে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল ফায়ার সার্ভিসের জরিপে।

শহরের কোনো এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ভালোভাবে মোকাবিলার জন্য এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলার কথা বলেছেন নগর পরিকল্পনাকারী খন্দকার নিয়াজ রহমান। তাঁর মতে, এজন্য তিনটা জিনিস দরকার। এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী, তাদেরকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য উপকরণ প্রদান ও এলাকায় ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন করা। তাহলে যে কোনো অগ্নিকাণ্ডের সময় এই স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীই সবার আগে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করবে।

আরও পড়ুন: নিমতলী মনে রাখলে চকবাজার ট্রাজেডি এড়ানো যেত: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক গুদাম থাকার কারণে শুধু অগ্নিকাণ্ড আর জানমাল হারানোর আশঙ্কাই না। এর সঙ্গে পরিবেশ দূষণ, বিভিন্ন অসুখবিসুখ ইত্যাদি ব্যাপারও জড়িত।

সূত্র: Old Dhaka at grave fire risk