বিশ্বজুড়ে অভিনব সব প্রতিবাদ

প্রতিবাদ মানেই যে কেবল রাজপথ আটকে রেখে সহিংস কর্মকান্ড চালাতে হবে তা নয়, এমন উদাহরণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু অভিনব আন্দোলনের দ্বারা। তেমন সব প্রতিবাদের স্বরূপ থাকছে আজকের এই প্রতিবেদনেঃ

জাপানের বাসচালকদের প্রতিবাদ

জাপানের বাস চালকেরা রয়েছেন এক আন্দোলনের মাঝে, তবে তা কোন সাধারণ আন্দোলনের মত নয়। তারা আন্দোলন করতে গিয়ে কাজ থামিয়ে রাখেননি। প্রতিদিনের মতই তারা নির্ধারিত রুটে যাত্রীদেরকে নিয়ে যাচ্ছেন নির্দিষ্ট গন্তব্যে, কিন্তু বিনিময়ে নিচ্ছেননা কোন ভাড়া। চাকরীর নিরাপত্তা বৃদ্ধি, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিমালিকানায় না যাওয়ার প্রতিবাদে তারা যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, যার দ্বারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এই পন্থার বিপরীতে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কিন্তু তা সত্ত্বেও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন চালকেরা। তবে এমন সিদ্ধান্তের কারণে দাবি আদায়ে তারা পাশে পাচ্ছেন সাধারণ যাত্রীদেরকে, তারা সমর্থন দিচ্ছেন বাস চালকদের দাবিতে।

প্রাচীন গ্রীক থিয়েটারের আহ্বান

স্বার্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে নারীদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র তাদের যৌনতা, এমন ধারণা বেশ প্রাচীন। আর সেটি দেখানো হয়েছিলো অ্যারিস্টোফেনের গ্রীক হাস্যরসের নাটক লিসিস্ট্রাটায়।

পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধের রুক্ষ দিনগুলোতে প্রাচীন এথেন্স এর নারীরা অনেক গুরুদায়িত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে নিতেন পুরুষদেরকে যৌনতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দিয়ে। আর যৌনতার অস্ত্র ব্যবহার করেই তারা শান্তির চুক্তি করতেন, এমনটাই ফুটে ওঠে নাটকটির গল্পে।

নাটকটিতে দেখানো হয় আধুনিককালে কিভাবে একই রীতি প্রচলিত হয়ে আসছে বিশ্বজুড়ে। ২০০৩ সালে লাইবেরিয়ার লেইমাহ বাউই এর নেতৃত্বে এক আন্দোলন আশ্চর্যজনকভাবে দেশটির গৃহযুদ্ধ থামাতে সক্ষম হয়েছিলো। শুধু তাই নয়, নাটকের দ্বারা দেশে শান্তি ফিরে এসেছিলো এবং সেজন্য তিনি নোবেল পুরুষ্কারও পেয়েছিলেন। এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ এলেন জনসন-সারলীফ আফ্রিকার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন।

এক বছর বন্ধ আইস হকি খেলা

যেকোন ক্রীড়ার ক্ষেত্রে গোটা বছর কোন খেলা হবেনা, তা ভাবা খুবই কঠিন। কিন্তু নর্থ আমেরিকান ন্যাশনাল হকি লীগ (এনএইচএল) এর ২০০৪-২০০৫ বর্ষে এমনই ঘটেছিল।

এনএইচএল কর্তৃপক্ষের সাথে খেলোয়াড় এসোসিয়েশনের ভিন্নমতের জের ধরে শুরু হয়ে যায় দীর্ঘমেয়াদী এক আন্দোলন। ফলস্বরূপ সেই সিজনে ১২৩০টি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছিল।

ডাম্বোর প্রতিবাদ

১৯৪১ সালে ডিজনীর এনিমেটরেরা পারিশ্রমিক বৃদ্ধি এবং ইউনিয়নের স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনে নামেন। কিন্তু এই আন্দোলনে তারা হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন নিজেদের শৈল্পিক সৃষ্টিশীলতাকে।

বুরব্যাংক স্টুডিওসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় ডিজনীর বিখ্যাত সব চরিত্রকে প্ল্যাকার্ড হাতে দাড়াতে। পিনোকীয়র হাতের বোর্ডে লেখা ছিলো “আমি শিকলে বাধা নই”; প্লুটো বলছে “আমি তোমাদের খোস-পাচড়া হবার চেয়ে বরং রাস্তার কুকুরটাই হবো”; আর মিকি মাউস বলছে “আমরা মানুষ নাকি ইঁদুর আপনাদের চোখে?”

এই আন্দোলনটি পাঁচ সপ্তাহব্যাপী চলে, আর তার ফলে প্রভাবিত হয় নির্মানাধীন ‘ডাম্বো’ চলচ্চিত্রের কাজ। প্রকৃতপক্ষে ডাম্বো চলচ্চিত্রটিতে আন্দোলনকারীদেরকে দেখানো হয়েছে একদল সং হিসেবে, যারা বেতন বাড়ানোর দাবিতে নিজেদের বসকে আক্রমন করতে যায়।

হিউস্টনে আইন নেই

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে নিজেদের অতি নগন্য পারিশ্রমিকের বিরুদ্ধে একত্রিত হন ম্যাসেচ্যুসেটস এর পুলিশ সদস্যরা। তারা ১৯১৯ সালে নিজেদের অস্ত্র তথা আইন বর্জন করেন।

বেশিরভাগ পুলিশ এই আন্দোলনের পক্ষে থাকায় শহরটিকে সম্মুখীন হতে হয়েছিলো বেশ কয়েকটি নিরাপত্তাহীন রাতের। শহরে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে স্টেট গার্ডের ডাক দেওয়া হয়।

আন্দোলনকারী পুলিশ সদস্যদের গায়ে “দলত্যাগী” এবং “লেনিন এর এজেন্ট” তকমা জুড়ে দেওয়া হয় এবং তাদের সকলের চাকরী বাতিল করে দেওয়া হয়। তাদের জায়গায় নতুন করে যারা যোগ দিয়েছিলেন তারা সেই আন্দোলনের সুফল অবশ্য পেয়েছিলেন।

সকলে আমরা বস এর তরে

আধুনিক দিনের ম্যাসেচ্যুসেটস আরো একটি অভিনব আন্দোলনের সাক্ষী। কিন্তু এই আন্দোলন কোন বেতন বৃদ্ধি কিংবা কর্মক্ষেত্রে সুবিধা বৃদ্ধির দাবিতে নয়। আর এই আন্দোলনের ছিলো এক শুভ সমাপ্তি। মার্কেট বাস্কেট গ্রোসারি চেইনের কর্মচারীদের দাবি ছিলো মাত্র একটি- তাদের জনপ্রিয় বস আর্থার টি ডেমোলাসকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা। তাকে ২০১৪ সালের জুন মাসে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিলো পারিবারিক গোলযোগের কারণে।

এই আন্দোলন চলেছিলো সমগ্র গ্রীষ্মকালজুড়ে। এর ফলে কোম্পানীটির প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়। পরবর্তীতে শেয়ারহোল্ডারেরা জনাব ডেমোলাস এর কাছে শেয়ার বিক্রী করতে রাজি হলে সে আন্দোলন শিথিল হয়।