সমকামী এই জুটি যেভাবে চার্চকে ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করেছিলেন!

সমকামী বিবাহ এই বছর কয়েক হলো বৈধ হওয়া শুরু হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এখনও এটি নিষিদ্ধ বিশ্বের বেশিরভাগ স্থানে। অনেকেই সমকামীদের প্রেম-বিয়েকে দেখেন বিকৃত আচরণ হিসেবে। তবে উন্মুক্ত না থাকলেও, লোকলজ্জার ভয় থাকলেও যুগে যুগে অনেক সমকারী জুটিই কিন্তু একসঙ্গে থেকেছেন। আর বিংশ শতকের শুরুতে এই সমকামী জুটি যে কাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন, তা অবাক করবে অনেককেই। তাঁরা ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করেছিলেন স্পেনের গোঁড়া রক্ষণশীল ক্যাথলিক চার্চে।

বিয়ের অনুষ্ঠানের সবকিছু ঠিকই ছিল, কিন্তু বরের চেহারায় ঠিক কি যেনো অস্বাভাবিক ছিল তা বোঝা যাচ্ছিলনা। স্পেনের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের সান জর্জ চার্চের ধর্মজাযক নিজে কিছু বিশেষ দেখতে পাননি, আর উপস্থিত আত্মীয়স্বজনও কিছু বলেননি। আসলে বর “মারিও” এবং তার হবু স্ত্রী, দুজনেই ছিলেন নারী।

সময়টি ছিলো ১৯০১ সাল। এলিসা ও মার্সেলা নামের এই দুই যুগান্তকারী সমকামী নারীর বিবাহবন্ধন আজও পর্যন্ত স্পেনের ক্যাথলিক চার্চের ইতিহাসে একমাত্র সমকামী বিয়ের ঘটনা। যদিও এই দম্পতির জয়ের সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরে তাদের বাকি জীবন কাটাতে হয়েছে দৌড়ের উপর, সমাজের নিপীড়নের ভয়ে।

এলিসা আর মার্সেলার এই গল্পের আদলে নির্মিত হতে যাচ্ছে একটি চলচ্চিত্র। এর নির্মাতা ইসাবেল কইক্সেট এর সর্বশেষ ছবি “দ্য বুকশপ” ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, “যখন আমি ঐ দুই নারীর কথা ভাবি, তখন মনে আসে তাদের অসামান্য সাহসের কথা। তাদের মধ্যে একজনের পুরুষ সেজে বিয়ে করে ফেলার ঘটনাটি খুবই সাহসের ছিল। তাদের পরিশেষে পরিনতি কি হয়েছিলো তা অজানা রয়ে গিয়েছে।তারা শেষ পর্যন্ত এটি নিয়ে পার পাবে কিভাবে তা নিয়ে কি ভেবেছিল তখন?”

এলিসা সানচেজ লোরিগা এবং মার্সেলা গ্রেশিয়া ইবিয়াস-এর প্রথম পরিচয় হয়েছিলো করুনা নামের শহরে স্কুল শিক্ষক হবার প্রশিক্ষন গ্রহনের সময়ে। তারা একে অপরের প্রেমে পড়ে যান।

তাদের সম্পর্ক নিয়ে পরিবারের আপত্তির কারণে মার্সেলার মা তাকে ব্যাগ-বস্তাসহ মাদ্রিদে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু, ইতিহাসবিদ নারকিসো ডে গ্যাব্রিয়েল এর তথ্যমতে, এই দম্পতি পরবর্তীতে কাছাকাছি দুটি গ্রামের  দুটি স্কুলে চাকরি পায়। তাদের মাঝে মাত্র কয়েক মাইল এর ব্যবধান ছিল, প্রতিদিনের ক্লাস শেষে এলিসা হেটে হেটে চলে আসতেন মার্সেলার বাড়িতে। এই সময়ের মধ্যেই তারা নিজেদের বিয়ের ফন্দি এঁটেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

প্রথমে তারা সবাইকে জানালেন যে, তাদের মাঝে ঝগড়া হয়েছে। এবং মার্সেলা এক অজ্ঞাতনামা পুরুষের সন্তান পেটে ধারন করে ফেললেন। তিনি ঘোষনা দিলেন যে, তিনি এলিসার এক চাচাতো ভাইকে বিয়ে করবেন।আবির্ভাব হলো বানানো চরিত্র “মারিও”-র, যে স্পেনে জন্ম নিয়েছিলো কিন্তু বড় হয়েছে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে এক নাস্তিক পরিবারে।

চুল ছোট করে কেটে এবং স্যুট-প্যান্ট পরে এলিসা চার্চে গিয়ে মারিও খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করেন। ঐ একই দিনে তাদের বিয়ে হয়। তাদের ঐ বিয়ে এখনো পর্যন্ত বৈধ এক বিয়ে বলে ২০১১ সালে জানিয়েছেন গ্যাব্রিয়েল।

দুঃখজনকভাবে তাদের বিয়ের ছবি ছাপা হয়ে যায় দৈনিক পত্রিকায়। সেখানে তাদের এই ফন্দির কথা ছাপা হয় “বর ছাড়া বিয়ে” শিরোনামে। এরপরে জনগণের উত্তাপে সেই এলাকায় থাকা দায় হয়ে যায় এই দম্পতির।তারা পালিয়ে চলে যান পর্তুগালে। সেখানে মার্সেলা এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন।

স্পেনে বিচার এবং হাজতবাসের ঝুকি থাকায় তারা আর সেখানে ফিরে গেলেন না। ১৯০২ সালে একটি জাহাজের বোর্ডিং এর ব্যবস্থা করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে তারা চলে যান আর্জেন্টিনায়।

এরপরে এলিসা এক ডেনমার্কের নাগরিককে বিয়ে করে বসেন, কিন্তু তার স্বামী তার মতলব বুঝতে পেরে তাকে তালাক দিয়ে দেয়। এর পরে সেই দম্পতির আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। তবে মেক্সিকোর এক সংবাদপত্রে ১৯০৯ সালে প্রকাশিত এক খবরে জানা যায়, এলিসা সে বছর আত্মহত্যা করেছিলেন।

এক দশক আগে স্পেনে সমকামীদের বিবাহ বৈধ ঘোষনা করা হলেও, এলজিবিটি আন্দোলনের অনেকে জানান, আজও অনেককেই সেই এলিসা আর মার্সেলোর মত ভুগতে হয় সমাজের বাধা আর অবজ্ঞার কারণে।