৪০০০ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন ভারতীয় পর্যটকরা?

জীনগত আলামত থেকে ধারনা পাওয়া যায়, আজ থেকে ৪ হাজার বছর আগে একদল ভারতীয় পর্যটক অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন এবং সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন। কয়েক বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার কিছু আদিবাসীর শরীরের Y ক্রোমোজোম পরীক্ষা করে দেখা যায় সেই ক্রোমোজোমগুলোর বৈশিষ্ট্য ভারতীয় পুরুষদের মাঝে থাকা Y ক্রোমোজোমের সাথে খুব বেশি মিলে যায়। আর তা থেকেই মূলত এই প্রশ্নের উদয় হয়। এখন পর্যন্ত অবশ্য বিষয়টি আছে ধারণা পর্যায়ে। পাওয়া যায়নি কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য। ব্যাপারটি জানা গেছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একটি প্রতিবেদন থেকে।

তবে ‘ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইন্সটিটিউট ফর এভোলুশনারি অ্যান্থ্রোপলজি’ এর ইরিনা পুগাখ হয়তো হাজার বছরের এই প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য উত্তর খুজে পেয়েছেন। ৪,০০০ বছর আগে ভারতীয় পর্যটকদের একটি জাহাজ অস্ট্রেলিয়ার তীরে নোঙর ফেলে, তারা এখানেই থেকে যান। আর তাদেরকে বরন করে নেন অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় আদিবাসীরা।

একক নিউক্লিওটাইড পলিমরফিসমস (এসএনপি) নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষনের পরে এবং এগুলোর প্যাটার্ন পরীক্ষা করে ডঃ পুগাখ সেখানকার আদিপুরুষদের বিষয়ে অজানা তথ্যের একটি পর্দা উম্মোচন করেন।  এই গবেষনায় দেখা যায়, এই ধরনের এসএনপি কেবলমাত্র ভারতীয় মানুষদের জীনের মাঝে দেখা যায়। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, এমন জীনগত বৈশিষ্ট্য বহন করে থাকেন দক্ষিন ভারতের দ্রাবিড়ীয় মানুষেরা। তার এই পরীক্ষার ফল কয়েক বছর আগেকার Y ক্রোমোজোমের ব্যাপারে পাওয়া তথ্যের সাথে মিলে যায়। দুইটি পরীক্ষার ফলাফল একসাথে হিসাব করে তিনি জানালেন ঠিক কত আগে ভারতীয়রা অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন।

ডঃ পুগাখ এর ধারণা খ্রিস্টপূর্ব ২২১৭ সালের দিকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দেন কতিপয় ভারতীয় পর্যটক। সময়টা অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত উভয়ের জন্যই বেশ মজার। কারণ সে সময়ে ভারতীয় সভ্যতা সবে গঠিত হয়েছিল আর অস্ট্রেলিয়ান সংস্কৃতি তখন সংস্কারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল।

সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ সাল ও খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। এই সময়ে তারা সাগরে চলাচলে সমর্থ নৌযান তৈরি করতে সক্ষম হয়। এসব নৌকা ব্যবহার করে তারা প্রতিবেশী মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাণিজ্য করতো। এই নৌকাগুলোর একটি ব্যবহার করেই অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন সেই ভারতীয়রা।

সেই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় প্রযুক্তিগত এক পরিবর্তনের ঘটনার প্রমান পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা তখন নিজেদের অশোধিত প্রস্তরযুগীয় অবস্থা থেকে বের হচ্ছিলেন। সেসময়ে তারা তাদের ব্যবহার্য পাথরের যন্ত্রপাতি ছেড়ে শোধিত নবপ্রস্তরযুগীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে শুরু করেন। ভারতীয়রা যে সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিল, সে সময়ের মাঝে অস্ট্রেলিয়ায় খাদ্য সংগ্রহ আর রান্নার প্রক্রিয়ায় বেশ পরিবর্তন এসেছিল। বিশেষ করে সাইকাড বাদাম-এর বেলায়।

এই বাদামটি তখন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ন এক খাবারের উৎস ছিল। তবে এই বাদাম যথেষ্ট বিষাক্ত, বিষ আলাদা করার পরেই সেগুলো খাবার যোগ্য হতো। দেশীয় উপায় ছিল সেগুলো পুড়িয়ে বিষমুক্ত করা। তবে খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ানেরা সেই বাদাম পানিতে ডুবিয়ে পচানোর মাধ্যমে বিষমুক্ত করার উপায় বের করে ফেলে। একইভাবে ভারতের কেরালায় একই জাতের এই বাদামও বিষমুক্ত করা হতো শুকিয়ে কিংবা পুড়িয়ে। আর অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয়দের বসতি গড়ার সর্বশেষ কিন্তু বেশ গুরুত্বপূর্ন আলামতটি হলো সকলের প্রিয় ডিঙ্গো জাতের কুকুর।

ডিঙ্গো জাতটি সবসময়ই এক ধরনের ধাঁধা থেকে গিয়েছে। কেউ সঠিকভাবে জানেনা এই জাতের কুকুর অস্ট্রেলিয়ায় এলো কিভাবে। এই কুকুর সম্পর্কে আমরা যা জানি তা হলো, অস্ট্রেলিয়ার ভূখন্ড থেকে এরা তাসমেনিয়ান বাঘের বিলুপ্তি ঘটিয়েছিল এবং এরা অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় কোন জাত নয়। ভারতের বন্য কুকুরের সাথে ডিঙ্গোর খুব বেশি মিল রয়েছে। চার হাজার বছর আগে আসা সেই ভারতীয়দের সাথে একটি কুকুরও হয়তো চলে এসেছিল অস্ট্রেলিয়ায়।

তবে নিউ গিনি এবং দক্ষিন-পূর্ব এশিয়াতেও একই ধরনের জাতের কুকুর আছে তাই এটি একেবারে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছেনা ডিঙ্গোর আগমন ভারত থেকেই কিনা। ঘটনা যাই হোক না কেন, আধুনিক জীনতত্ত্ব সেখানকার আদিপুরুষদের ব্যাপারে না জানা এক বিরল তথ্য জানাতে সক্ষম হলো। আরো কি কি অজানাকে জানা যাবে ভবিষ্যতে তার অপেক্ষায় আমরা।