কিভাবে এলো পারমাণবিক অস্ত্র? এটা কাজ করে কিভাবে?

মুবিনুর রহমান

বিজ্ঞানী আইনস্টাইন যত বৈজ্ঞানিক সূত্র আবিষ্কার করেছেন তার মধ্যে সবার উপরের দিকে যে সূত্রটি আছে তার নাম ভর শক্তি সমতা সূত্র। পারমাণবিক অস্ত্র বা পারমাণবিক শক্তি যাই বলি না কেন, দাঁড়িয়ে আছে এই সূত্রের ওপর। এই সূত্রটি হল E=mc2। এই সূত্র মতে যার ভর আছে তারই শক্তি আছে অথবা উল্টোটা। আজ আমরা লেখার চেষ্টা করব পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কে। জানার চেষ্টা করব এর অতীত, ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করব এর বিপুল শক্তি সম্পর্কে। আর এ জন্য আমাদের যেতে হবে সেই ১৯৪২ সালে।

ম্যানহাটন প্রকল্প

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এই প্রকল্প হাতে নেয়। একটিমাত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই প্রকল্প যাত্রা শুরু করে ১৯৪২ সালে। কি সেই লক্ষ্য? তা হল পৃথিবীর প্রথম আণবিক বোমার জন্ম দেয়া। পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার ছিলেন এই প্রকল্পের পরিচালক। অনেক বিজ্ঞানী একে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্ববৃহৎ পদ্ধতিগত, শৈল্পিক ও বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার ছদ্ম নাম ত্রিনিটি আসে এই প্রকল্পের মধ্য দিয়েই। এই বোমাটির পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ১৬ই জুলাই ১৯৪৫ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে। মানবজাতি প্রথমবারের মত জানতে পারে পারমাণবিক বোমার বিপুল শক্তি সম্পর্কে।

বিস্ফোরণের এক মুহূর্ত পর সেই ঐতিহাসিক মাশরুম মেঘ

এই ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে বিস্ফোরণের এক মুহূর্ত পর সেই ঐতিহাসিক মাশরুম মেঘ। সব পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর এমন অগ্নি গোলকের সৃষ্টি হয়। পরীক্ষামূলকভাবে পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশ সহস্রাধিক বার এই পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। যুদ্ধে এই বোমা ব্যবহৃত হয়েছে দুইবার- জাপানের দুটি শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে। মারা গেছে প্রায় দুইলাখ মানুষ। যা মানব ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে।

স্নায়ু যুদ্ধ ও পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নতি

পারমাণবিক অস্ত্রের সবচেয়ে উন্নতি ও ক্ষমতা মানুষ দেখেছে স্নায়ু যুদ্ধের সময়। যখন ক্ষমতার মেরুকরণ নিয়ে উন্মত্ত হয়ে ওঠে পৃথিবীর পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলো। তখনই সামনে আসতে থাকে একের পর এক শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র। বদলে যায় এর ব্যাপ্তি, উৎক্ষেপণের কৌশল, লক্ষ্যে আঘাত হানার সক্ষমতা। প্রাথমিক অবস্থায় পারমাণবিক বোমা উড়োজাহাজ থেকে নিক্ষেপ করা হত এর নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে। এরপর আসে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংক্ষেপে আইসিবিএম। যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এই দৌড়ে সবসময়ই এগিয়ে ছিল। একই সময়ে আবিষ্কার হয় এমন সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ, যা পানির নিচে থেকে পারমাণবিক বোমা বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে সক্ষম। ডুবোজাহাজের এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বলে এসআইবিএল।

আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র

বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মারণাস্ত্র হল এই আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্র ১৬ হাজার কিঃমিঃ দূরের লক্ষ্যে নির্ভুল আঘাত আনতে সক্ষম। একবার ছুড়ে দিলে ধ্বংস অনিবার্য। এক একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ১০টি করে ওয়ারহেড বহন করে। এই ওয়ারহেডই মূল পারমাণবিক বোমা। তারমানে একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আসলে ১০টি আলাদা লক্ষ্যে আঘাত করবার মত বোমার সমষ্টি।

এই ছবিতে যে আলোকিত আকাশ দেখা যাচ্ছে তার পুরোটাই পিসকিপার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের সময়। যে আটটি আলোর রেখা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোই হল আটটি আলাদা আলাদা ওয়ারহেড। আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার এই প্রক্রিয়াকে বলে রি-এন্ট্রি বা পুনপ্রবেশ। কারণ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রথমে মহাকাশে ছুড়ে দেয়া হয়। তারপর এর ওয়ারহেডগুলো আলাদা হয়ে আবার পৃথিবীতে প্রবেশ করে এবং এদের পূর্ব নির্ধারিত লক্ষ্যে আঘাত করে। এটিই হল রি-এন্ট্রি বা পুনপ্রবেশ পদ্ধতি।

পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষমতা

একটা ছোট্ট কিন্তু বাস্তব উদাহরণ দিলে এর ক্ষমতা সম্পর্কে একটু ধারণা পাওয়া যাবে। পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার যে পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ওই জায়গা আজও তেজস্ক্রিয় হয়ে আছে। সেখানে আজও মানুষের বিচরণ নিরাপদ নয়। ওই জায়গাকে বলে গ্রাউন্ড জিরো। এই গ্রাউন্ড জিরো থেকে ৫০০ কিঃমিঃ দূরের বাড়ির জানালার কাঁচ ভেঙ্গে পড়েছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক বোমার নাম জার বোম্বা। রাশিয়ার তৈরি এই বোমাই মানব সৃষ্ট সবচে শক্তিশালী বোমা। রাশিয়া এই বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় ৩০শে অক্টোবর ১৯৬১। এর ক্ষমতা ছিল ৬০ মেগাটন টিএনটির সমান।

ছবিতে এই বোমার ধ্বংসযজ্ঞ বোঝানোর জন্য একটি উদাহরণ দেয়া হয়েছে। মাঝের হলুদ বৃত্তে জার বোম্বা আঘাত করলে এই লাল বৃত্তটি ভেতরের সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। এ থেকে সহজেই বোঝা যায় পারমাণবিক বোমার ক্ষমতা।

শক্তির যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তুরুপের টেক্কা হিসেবে কাজ করে। সব দেশই তাই পারমাণবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ হতে চায়। কিন্তু এখানে মিশে আছে পরাশক্তি রাষ্ট্রের চোখ রাঙ্গানী। কারণ যে দেশগুলোর কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে ক্ষমতার সুঁই তাদের দিকেই বেঁকে যায়। বাংলাদেশও অচিরেই পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। আমরাও নাম লেখাবো এই দৌড়ে। পারমাণবিক অস্ত্রে না হোক পারমাণবিক শক্তিতেই না হয়।