প্রশ্নোত্তরে রহস্যময় মহাশূণ্যের কথা

মুবিনুর রহমান

অসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে কত চিন্তা কত প্রশ্নই না আসে আমাদের মাথায়। আমরা যখন পরিবার থেকে দূরে কোন কাজে বের হই তখন একা হয়ে যাই। অথচ আমাদের সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪০৫ কিলোমিটার ওপরে এক কৃত্রিম উপগ্রহের ভেতর বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যস্ত। বলছি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কথা। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে যুগান্তকারী সৃষ্টি এই কৃত্রিম উপগ্রহ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর এক অবিস্মরণীয় একাত্বতা।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে থেকেই শুরু এক ভয়ংকর বৈরি মহাশূন্য। আজ এই মহাশূন্য নিয়ে কিছু
প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব আমরা।

১. কোন রকম সুরক্ষা ছাড়া মহাশূন্যে গেলে কি হবে মানব শরীরের?
অনেকের মতে কোন রকম প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়া মহাশূন্যে গেলে ততক্ষণাত মারা যাব আমরা। কিন্তু বাস্তবতা এর চেয়েও ভয়ানক। কারণ আমাদের বায়ুমণ্ডল সূর্যের অনেক ক্ষতিকর রশ্মি প্রতিহত করে আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই কোন কারণে যদি কেউ সরাসরি সূর্যের এই অপরিশুদ্ধ আলোর সামনে পরে তার পরিণতি কিন্তু খুবই ভয়াবহ। এছাড়া মহাশূন্যে যেখানে সূর্যের সরাসরি আলো পড়ছে সেখানে তাপমাত্রা +২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর যেখানে আলো সরাসরি পড়ছে না সেখানে তাপমাত্রা -২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তারমানে একইসাথে আমাদের শরীর ঠাণ্ডায় জমে যাবে তার সাথে শরীরের সবকিছু ফুটতে শুরু করবে।
২. মহাশূন্যে গেলে সব মানুষ কিছুটা লম্বা হয়ে যায়?
মজার ব্যাপার হল এটা সত্যি, যে বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যায় তাদের উচ্চতা পৃথিবীর উচ্চতা থেকে কিছুটা বৃদ্ধি পায়। তবে হ্যাঁ এটা একদমই ক্ষণস্থায়ী। পৃথিবীতে ফিরে আসলেই সব আবার আগের মত হয়ে যায়। কেন এই উচ্চতা বৃদ্ধি? এর কারণ হলো মাধ্যাকর্ষণ। মহাশূন্যে কোন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নেই। তারমানে বিজ্ঞানীরা ভেসে থাকে। আমাদের শরীরের প্রতিটা হাড়ের সংযোগে যে তরুণাস্থি থাকে তা মাধ্যাকর্ষণের চাপে সঙ্কুচিত হয়ে থাকে। যেহেতু মহাশূন্যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নেই তাই হাড়ের এই সংযোগগুলো একটু প্রসারিত হয়। আর তাই নভোচারীদেরকে যে পোশাক পরানো হয় সেটিও আকারে নভোচারীর চেয়ে বড় করে বানানো হয়।
৩. আলোর গতিতে ভ্রমণ করলে বয়স/সময় স্থির হয়ে যায়?
বহুল প্রচলিত ধারণা আছে কেউ যদি প্রচণ্ড গতিতে (প্রায় আলোর গতিতে) পৃথিবী থেকে কোথাও ভ্রমণ করে তবে তার বয়স বাড়বে না। তার জন্য সময় স্থির হয়ে যাবে। এই ধারনাটি ঠিক নয়। কারণ সময়ের তারতম্যের এই ব্যাপারটি বিজ্ঞানী আইনস্টাইন আবিষ্কার করেছেন। তিনি এর নাম দেন আপেক্ষিকতা। এর মানে হল কোন কিছুই স্থায়ী বা পরম নয়। সবকিছুই পরিবর্তিত হয়।এমনকি সময়ও। এই পরিবর্তন মাপা হয় সাপেক্ষে। তিনি এই বিষয় বোঝানোর জন্য একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন।
মনে করুন আপনি একটি ট্রেনে বসে আছেন। প্ল্যাটফর্মে একটি ঘড়ি আছে যেখানে দুপুর ১২.০০টা বাজে। এই সময় আপনার ট্রেন আলোর গতিতে যাত্রা শুরু করল। আপনি ঘড়িতে কত দেখবেন? ঘড়ি থেকে আলো আপনার চোখে এসে পড়ে তাই আপনি ঘড়ি দেখতে পান। আপনি ঘড়ি থেকে আলোর গতিতে সরে যাচ্ছেন। তাহলে আপনার জন্যে অনন্তকাল ঘড়িটিতে দুপুর ১২.০০টাই বেজে থাকবে। কিন্তু ওই মুহূর্তে প্ল্যাটফর্মে ঘড়িটির পাশে যে দাড়িয়ে থাকবে তার জন্য ঘড়ি চলতে থাকবে।তার মানে সময় দুজনের জন্যই চলছে। কিন্তু এই চলার হার দুরকম। এই দুজনের সাপেক্ষে দুরকম ঘটনাই হল আপেক্ষিকতা।
৪. মহাশূন্যে কোন বিস্ফোরণ হলে কি কোন শব্দ সৃষ্টি হয়?
এর উত্তর খুব সহজ আমাদের পৃথিবীর মত মহাকাশেও কোন বিস্ফোরণ হলে শব্দ হয়। প্রশ্ন হল সেই শব্দ কি আমরা শুনতে পাই। এর উত্তর হল, মহাশূন্যে হওয়া কোন কিছুর শব্দ আমরা শুনতে পাই না। আমাদের সৌর জগতে সূর্য হল এক অবিরত পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ। কিন্তু এর কোন শব্দই আমাদের কানে এসে পৌঁছায় না। এর কারণ হল মহাশূন্য ফাঁকা। শব্দকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হলে মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। কঠিন, তরল বা বায়বীয় মাধ্যম। মহাশূন্যে এর কোনটাই নেই। তাই মহাশূন্যের কোন শব্দ আমাদের কর্ণ কপটকে কাঁপাতে পারে না।
৫. অনেক সায়েন্স ফিকশন মুভিতে দেখানো হয় ইন্টার স্টেলার (এক নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্র) ভ্রমণে বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে ঠাণ্ডায় জমিয়ে ফেলা হয়। যাকে বলা হয় ক্রায়স্লীপ। বিজ্ঞান কী বলে?
বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার মত কিছু আবিষ্কার করতে পারেনি। কারণ পানি বরফ হলে আয়তনে বেড়ে যায়। আমাদের শরীরের বেশীরভাগই পানি। তাই একে বরফ করলে তা বরফের ক্রিস্টালে পরিনত হবে। একে আবার নমনীয় অবস্থাতে আনা সম্ভব না। এজন্যই প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ফ্রস্টবাইট বা হাইপোথার্মিয়া হলে আক্রান্ত অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান এর কোন সমাধান এখন পর্যন্ত বের করতে পারেনি।

বিচিত্র আর রহস্যে ঘেরা মহাশূন্য নিয়ে কতই না প্রশ্ন আমাদের। এখনো বাকি অনেক উত্তরের। বিজ্ঞানীরা জট খোলার চেষ্টা করছেন এই অসীম রহস্যের। রাতের আকাশে মিট মিট করে জ্বলে থাকা তারাগুলো আমাদের ডাকে হাতছানী দিয়ে। যেতে চাই আমরাও, আলোকবর্ষ দূরে।