ব্ল্যাক হোল ( কৃষ্ণ গহ্বরের ইতিকথা) পর্ব- ২

মুবিনুর রহমান


গত পর্বে আমরা ব্ল্যাক হোল কি তা নিয়ে বলার চেষ্টা করেছি। আজ আমরা স্পেসটাইমে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করবো। শুরুতেই যেহেতু স্পেস্টাইমের কথা চলে এলো তাই স্পেসটাইম নিয়েই শুরু করা যাক।

কী এই স্পেসটাইমঃ
পদার্থবিজ্ঞানে স্পেসটাইম হল এমন একটি গাণিতিক মডেল যেখানে স্থানের তিনটি মাত্রার সাথে সময় যোগ করে একটি চতুর্মাত্রিক ধারণার জন্ম দেয়। স্পেসটাইম বোঝার জন্য খুব সহজ একটা উদাহরণ আছে। তাহলো স্পেসটাইমকে কল্পনা করতে হবে কাপড়ের সাথে। কাপড়ের সুতার বুননের মত স্পেসের সাথে সময় একীভূত হয়ে আছে। দুটোকে আলাদা করার কোন উপায় আমাদের নেই। কোন একটিতে প্রবেশ করলেই আর একটিও সাথেই থাকবে। মজার ব্যাপার হলো ব্ল্যাক হোলের প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় শক্তি সময়কে প্রায় স্থির করে দিতে পারে।

স্পেস্টাইমে বস্তুর ভরের প্রভাবঃ
যেহেতু স্পেসটাইম কাপড়ের মত তাই এর উপর ভারী কিছু রাখলে তার চারপাশে বক্রতা তৈরি হয়। ভর আছে এমন সবই এই বক্রতা সৃষ্টি করে। যেমন আমাদের সূর্যের ভরে স্পেসটাইমে যে বক্রতা তৈরি হয়েছে আমাদের পৃথিবীসহ সৌরজগতের সব গ্রহ এ কারণেই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। একই কারণে চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

স্পেসটাইমে ব্ল্যাক হোলের প্রভাবঃ
ব্ল্যাক হোলের সংজ্ঞা থেকেই আমরা জানি এর ভর অসীম কিন্তু অসীম ক্ষুদ্র এর আয়তন। তাহলে অসীম
ক্ষুদ্র ও অসীম ভর এর কিছু যদি আমরা কোন কাপড়ের উপর রাখি কী হবে তার প্রভাব? স্পেসটাইমের
বক্রতাও অসীমে চলে যাবে। বিজ্ঞানীদের মতে স্পেসটাইম ওই জায়গায় বিকৃত হয়ে যাবে। এই বিকৃতির শেষ হল সিঙ্গুলারিটি আর শুরু হল ইভেন্ট হরাইযন।

এই চিত্র থেকে কিছুটা ধারনা পাওয়া যায় স্পেসটাইমে ব্ল্যাক হোলের প্রভাবের। আমরা প্রথম পর্বেই বলেছি ব্ল্যাক হোলের কাছে কোন কিছু গেলে তা আর ফিরে আশে না এর কারণ এই বিকৃত স্পেসটাইম। এবার মজার কিছু পরীক্ষা করা যাক ব্ল্যাক হোল নিয়ে।

কী হবে যদি আমরা ব্ল্যাক হোলের কাছে চলে যাই। বাস্তবে না যাই, আলোচনার জন্যই না হয় যাওয়া যাক। যখন আমরা ইভেন্ট হরাইযনের কাছে যাব অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করবে। ভয়ানক ব্যাপার হল ওই জায়গা থেকে আর ফিরে আসার উপায় নেই। যেহেতু জীবনের শেষ অনিবার্য তাই ওই মুহূর্তটাকে উপভোগ করাই উচিত হবে। যেহেতু আলোও ইভেন্ট হরাইযন থেকে ফিরে আসে না তাই আমরা যখন ব্ল্যাক হোলে প্রবেশ করব তখন চারপাশ আস্তে আস্তে লাল বর্ণ ধারন করবে। কারণ সাদা আলো থেকে একে একে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য ক্রমে হারিয়ে যেতে থাকবে।
মজার ব্যাপার হল আমরা ওই মুহূর্তে সোজা সামনে তাকিয়ে আমাদের মাথার পেছনের অংশ দেখতে পাব। কারণ যে আলো আমাদের মাথার পেছনের অংশে পড়ছে তা ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণে বেঁকে গিয়ে আমাদের চোখে ধরা পড়বে। এরপর সবকিছু নিকষ কালো।
ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণে আমাদের শরীর লম্বা হতে থাকবে। বিজ্ঞানীরা এই টানের একটা সুন্দর নামও
দিয়েছেন। একে বলে স্প্যাগেটিফিকেশন। এই আকর্ষণ এতটাই বেশি যে আমাদের শরীরের মাঝামাঝি থেকে ছিঁড়ে ফেলবে। তারপর ছিঁড়ে যাওয়া টুকরো দুটোর উপর এই আকর্ষণ চলতেই থাকবে। দুইয়ের গুণিতকে চলবে এই প্রক্রিয়া। একে বলে বাইফারকেটিং। সময় স্থির হয়ে যাবে। সবকিছু মিশে যাবে সিঙ্গুলারিটিতে।

কিছুই জানি না আমরা ব্ল্যাক হোল এর কেন্দ্র সম্পর্কে। একবার যেতে পারলে মন্দ হত না। একদিন আমরা ভেদ করব এই রহস্য দানবকে। আমাদেরই কোন প্রজন্ম লাগাম দেবে এই অসীম আকর্ষণকে।

আরও পড়ুন: ব্ল্যাক হোল (কৃষ্ণ গহ্বরের ইতিকথা)- পর্ব-১