ব্ল্যাক হোল (কৃষ্ণ গহ্বরের ইতিকথা)- পর্ব-১

মুবিনুর রহমান

ব্ল্যাক হোল বাংলায় কৃষ্ণ গহ্বর। জ্যোতি পদার্থবিদ্যার (Astrophysics) সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এটি। সম্প্রতি বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। সরব ইন্টারনেট দুনিয়া। চেষ্টা করা যাক কৃষ্ণ গহ্বরের ভেতরে ঢোকার।

১০ই এপ্রিল ২০১৯ জ্যোতি পদার্থবিদ্যার ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণ। এই দিনেই প্রথমবারের মত ইভেন্ট হরাইযন টেলিস্কোপ এর শক্তিশালী রেডিও ফ্রিকুয়েন্সিতে ধরা পড়ে ব্ল্যাক হোলের ছবি। শিল্পীর তুলিতে আঁকা ব্ল্যাক হোল প্রথমবারের মত বাস্তবতায় রূপ নেয়।

ছবির ব্ল্যাক হোলটি আমাদের পৃথিবী থেকে ৫৩.৫ আলোকবর্ষ (Light Year) দূরে। মেসিয়ের ৮৭ ছায়াপথ (Galaxy) এর কেন্দ্রে অবস্থিত। এই ছবি এবং এর দূরত্ব হিসেব করে বোঝা যায় এটি আকারে আমাদের সূর্য থেকে ৭ বিলিয়ন গুণ বড়। ছবিটিতে যে আলোর বৃত্ত দেখা যাচ্ছে সেটা হল ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণে বেঁকে যাওয়া আলোর কারণে। এই ব্ল্যাক হোলটির অনেক আলোকবর্ষ পেছনের কোন নক্ষত্র থেকে আলো যখন আমাদের কাছে এসে পৌছায় তখন আলো তার সরল রেখা ধরে রাখতে পারে না। ব্ল্যাক হোল দেখার এই উপায়কে বলে Gravitational Lensing. নিচের চিত্রে দেখা যায়, ব্ল্যাক হোলটি যখন মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথ অতিক্রম করছে তখন ওই ছায়াপথ থেকে আসা আলো ব্ল্যাক হোলটির আকর্ষণ এর কারণে বৃত্ত সৃষ্টি করছে।

কী এই ব্ল্যাক হোল?

সহজ করে বলতে গেলে, ব্ল্যাক হোল হল মহাবিশ্বের এমন বস্তু যার আয়তন অতি ক্ষুদ্র কিন্তু এর ভর এত বেশি যে এর মহাকর্ষীয় শক্তি কোন কিছুকেই তার ভিতর থেকে বের হতে দেয় না। এমনকি ‘আলোর’ মত তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণকেও (Electro Magnetic Radiation) নয়। এ থেকেই কিন্তু বোঝা যায় কেন আমরা এতদিন এর কোন ছবি তুলতে পারিনি। কোন বস্তু থেকে আলো আমাদের চোখ অথবা ক্যামেরাতে এসে পড়লে তবেই আমরা বস্তুটি দেখতে পাই।

ব্ল্যাক হোলের চারপাশে একটি অদৃশ্য বলয় থাকে, একে বলে ইভেন্ট হরাইযন (Event Horizon)। এজন্যই বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলের ছবি তোলার জন্য যে টেলিস্কোপ ব্যবহার করেছে তার নামও ইভেন্ট হরাইযন। এই ইভেন্ট হরাইযন পার হবার পর আর কিছুই ফিরে আসবে না।

কেন ফিরে আসে না কিছু?

আমরা জানি এই মহাবিশ্বে যার ভর আছে তা অন্য সব কিছুকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। যেমন পৃথিবী আমাদের সবাই কে ৯.৮ m/s2 বেগে টানছে। আমরা যদি পৃথিবীর বাধা এড়িয়ে মহাশূন্যে যেতে চাই তবে আমাদের জন্য দরকার অনেক বেগ। এই বেগকে বলে মুক্তিবেগ। পৃথিবীর মুক্তিবেগ (Escape Velocity) ১১.২ km/s। তার মানে আমরা যদি কোন বস্তুকে ১১.২ km/s বেগে উপরের দিকে ছুড়ে দেই তাহলে বস্তুটি আর কখনো পৃথিবীতে ফিরে আসবে না।

ব্ল্যাক হোলের ভর এতটাই বেশি যে এর মুক্তিবেগ আলোর বেগ থেকেও বেশি। আমরা জানি বেগের তালিকায় আলোই সবার উপরে। আলোর বেগকেই আমরা মহাবিশ্বের দূরত্ব মাপার একক হিসেবে ধরি। মজার ব্যাপার হল আমরা সঠিকভাবে মাপতে পারি আলোর বেগ। আর মনে রাখতে হবে আলোর বেগ ধ্রুবক। সবসময় একই থাকবে। কমবে বা বাড়বে না। আর এ বেগ হল প্রতি সেকেন্ডে ২৯৯৭৯২৪৫৮ মিটার। ব্ল্যাক হোলের মুক্তিবেগ তাহলে এখন আমরা বুঝতে পারছি।

কীভাবে সৃষ্টি হয় ব্ল্যাক হোল?

মজার ব্যাপার হল তাত্ত্বিকভাবে (Theoretically) সব কিছুকেই ব্ল্যাক হোলে রুপান্তরিত করা সম্ভব। যদিও বাস্তবে বিজ্ঞানীরা এমন কোন পথ বাতলাতে পারেননি যা দিয়ে আমরা কোনো ব্ল্যাক হোল বানাতে পারব। সব কিছু এখনো সূত্রেই আটকে আছে। তবে আশার কথা সূত্রগুলো প্রমাণিত।

সূত্র অনুযায়ী, কোন কিছুকে যদি একটা নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধে নিয়ে আসা যায় তাহলে সেই বস্তুটি ব্ল্যাক হোলে পরিনত হবে। এই ব্যাসার্ধকে বলে Schwarzschild radius। বিজ্ঞানী Karl Schwarzschild এর নামানুসারে এই নাম। তাঁর সূত্র মতে, আমাদের পৃথিবীকে যদি ভর ঠিক রেখে একটি ফুটবল এর সমান আয়তন এ নিয়ে আসা যায় তাহলে আমরা ব্ল্যাক হোল পাব। এমনই ভাবে মাউন্ট এভারেস্টকে চিনাবাদামের চেয়েও ছোট আকারে নিয়ে এলে আমরা ব্ল্যাক হোল পাব। কিন্তু সমস্যা হল কোন কিছুকে ভর ঠিক রেখে এত ছোট করে ফেলার ক্ষমতা বা উপায় কোনটাই আমাদের নেই। প্রশ্ন হল তাহলে কিভাবে সৃষ্টি হয় এই সর্বগ্রাসী দানব- ব্ল্যাক হোল?

আমাদের ব্ল্যাক হোল বানানোর ক্ষমতা না থাকলেও মহাবিশ্বের আছে। ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হয় নক্ষত্র থেকে। নক্ষত্র নিউক্লিয়ার ফিউশান বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি বিকিরণ করে।  আমাদের সূর্য থেকেও শত সহস্র গুণ বড় এ নক্ষত্র যখন আলো বিকিরণ করতে করতে এর জীবনীশক্তি শেষ করে ফেলে তখন নক্ষত্রটি ভেঙে পড়ে নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে। কারণ নিউক্লিয়ার ফিউশান বিক্রিয়া শেষে ভারি মোল তৈরি হয়। আর তখনই বিকট বিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় ব্ল্যাক হোল। একে বলে সুপার নোভা বিস্ফোরণ (Super Nova Explosion)।

নামের মতই রহস্যময় ব্ল্যাক হোল। এর সম্পূর্ণ ভর পুঞ্জিভূত হয়ে আছে অসীম ক্ষুদ্র কেন্দ্রে, বিজ্ঞানীরা যাকে বলে Singularity. আমরা কিছুই জানি না এখনও কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য ইভেন্ট হরাইযনের ওপাশে। যেখানে আইনস্টাইনের সূত্রও কাজ করতে ব্যর্থ হয়। প্রতিটি ছায়াপথের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে এই ব্ল্যাক হোল। আমাদের ছায়াপথ আকাশ গাঙ্গার (Milky Way) কেন্দ্রেও আছে এমনি একটি ব্ল্যাক হোল- নাম  Sagittarious A*। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের উন্নতদেশগুলোর সাথে মহাকাশ অভিযানে নাম লিখিয়েছে। ব্ল্যাক হোল ভাবায় বিজ্ঞানীদের। হয়তো কোন একদিন আমরা এর রহস্যও উন্মোচন করব। মহাবিশ্ব নিয়ে আরেকটু জানলে মন্দ হবে না। নিঃসঙ্গ নীল বিন্দু হয়ে থাকতে হবে না হয়ত আমাদের।