ওয়াওরানিদের আদালত জয়ের গল্প, সত্যিই বিপর্যয় ঠেকাবে কী?

নাজমুল হাসান রানা

অ্যামাজন মানেই দক্ষিণ আমেরিকার বুক জুড়ে গড়ে ওঠা এক সবুজ বনভূমি। সেই বনভূমির বুক চিড়ে বয়ে চলা নদীর কলতান। আর সেই কলতানে মিশে থাকা বিশাল জীবন চক্র। নানা প্রজাতির প্রাণী থেকে শুরু করে মানুষ; সবাই মিলেমিশে বাস করে এই অ্যামাজনে। তবে কালের পরিক্রমায় জীবনের আধার অ্যামাজনও এখন হুমকির মুখে। আনাচ-কানাচ পেরিয়ে স্বার্থলোভী কর্পোরেট চোখ পৌঁছে গেছে বনভূমির গহিনে। তেলসহ নানা খনিজ পদার্থ, দামি কাঠ— অনেক কিছুর লোভেই আর স্বাভাবিক থাকছে না প্রাণবৈচিত্র্যের আবাসভূমি অ্যামাজন। দিনে দিনে বন যেমন বিলোপ হচ্ছে, তেমনি বিলীন হয়ে যাচ্ছে জীব বৈচিত্র্য। স্বার্থান্বেষী রাষ্ট্র ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অত্যাচারে অতিষ্ট বন কেন্দ্র করে বসতি গাড়া আদিবাসীরা। অ্যামাজনের অনেক আদিবাসী এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে, অনেকে আবার বাধ্য হয়ে পূর্ব পুরুষের গায়ের গন্ধ মুছে বাসা বেঁধেছে কথিত সভ্যতার সদর দরজায়।

যারা সভ্যতায় ফিরেছেন, নিজেদের গায়ের পুরনো গন্ধ ঝেড়েমুছে সাফ করে সভ্যতার সজারু কাঁটায় ঝোলানো সেন্ট পকেটে পুরে সেটা এক অন্য আলাপের প্রসঙ্গ। কিন্তু যারা পূর্বপুরুষের ইতিহাস ঐতিহ্য ছাড়তে চান না বরং আঁকড়ে ধরতে চান শক্ত করে। অথবা যারা এই কথিত সভ্য জীবনের চেয়ে এখনো অনেক সাবলীল জঙ্গলবাসে। যাদের কাছে উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তি, দ্রুত গতির গাড়ি কিংবা আকাশ কাঁপানো বিমানের চেয়ে এখনো প্রিয় এই জঙ্গল জীবন। জঙ্গলই যাদের মা,মাতৃদুগ্ধের মতো যাদের কাছে পবিত্র বন চিড়ে বয়ে যাওয়া মায়াবী নদীর টলটলে জল। দামি রেস্তোরাঁর বার্গার, স্যান্ডুউইচ কিংবা পিৎজ্জার চেয়ে যাদের কাছে এখনো প্রিয় জঙ্গলে বেড়ে ওঠা কোনো বুনো ফল। যাদের এখনো জাজ-রক কিংবা সভ্য সমঝদার সমাজের ধ্রুপদী গানের চেয়ে গহন বনের পাখির কিচিরমিচিরই বেশি ভালো লাগে, কিংবা নিজেদের আদি সুরে খুঁজে পান ক্লান্তি  দূর করার চাবি কাঠি, তারা কেমন আছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের যেতে হবে সবুজ অ্যমাজনে। শত শত বছর ধরে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরের অ্যামাজন অংশে বাস ওয়াওরানি আদিবাসী গোষ্ঠীর। অ্যামাজন চিড়ে বয়ে যাওয়া কুরারে  (Curaray) ও ন্যাপো (Napo) নদীর মাঝামাঝি অঞ্চলেই তাদের বাস। সংখ্যায়ও এরা হাতেগোনা, সবমিলে এই গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা মাত্র তিন থেকে চার হাজার। মুখচোরা স্বভাবের ওয়াওরানিরা। ‘সভ্যতা’ বিমুখ এই আদিবাসী গোষ্ঠী নিজেদের আড়াল করে রাখতেই ভালোবেসে। সে কারণেই হয়তো একবিংশ শতাব্দিতেও এরা পড়ে আছে জঙ্গল আঁকড়ে, প্যান্ট-শার্ট কোট গায়ে চাপানো শহরের পথ ধরেনি। গোত্রের নামের সাথে মিলিয়ে এদের ভাষার নামও ওয়াওরানি। মজার বিষয় হলো এই ভাষার সাথে নাকি এখনও পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষার মিল খুঁজে পাননি ভাষাবিদরা। সেই দিক থেকেও ওয়াওরানিরা অনন্য।

শুরু থেকে অ্যামাজনে ভবঘুরে জীবন যাপন করলেও গেল ৪০ বছর ধরে বনেই থিতু হওয়ার চেষ্টা করছে ওয়াওরানিরা। এমনকি অনেকে ছেড়েছে নিজেদের আদিম পেশা, শিকার। বনে থিতু হলেও ওয়াওরানিদের পাঁচ সম্প্রদায়ের দুটোই বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখতে একদম আগ্রহী নয়। তারা সাজিয়ে-গুছিয়ে আপন আলয় বনবাসেই বেশি আগ্রহী। তবে শান্তি নেই কোথাও, ১৯৫০-এর দশকে ওয়াওরানিদের সাথে প্রথমবারের মতো যোগাযোগের চেষ্টা করে মার্কিন মিশনারীরা। এ উপলক্ষ্যে তাদের কাছে আকাশ থেকে ছোড়া হয় বাক্সবন্দি উপহার। যদিও সেই উপহার সন্তুষ্ট করতে পারেনি ওয়াওরানিদের। তারা নাকি বাক্সের ওপর থাকা ছবি দেখেই ভড়কে গিয়েছিলো। পেছনের কারণ হিসেবে জানা যায়, ওয়াওরানিরা এর আগে নাকি কোনো ধরনের ছবিই দেখেনি। তাদের কাছে মনে হয়েছে এই ছবিওয়ালা বাক্স অভিশাপ স্বরুপ, এটা শয়তানের কাজ। সেই থেকেই মূলত অস্থিরতার সূত্রপাত।

পঞ্চাশের দশক থেকেই একের পর এক আঘাত আসে বন আঁকড়ে থাকা ওয়াওরানিদের ওপর। নিজেদের সংস্কৃতি আর আবাসভূমি টিকিয়ে রাখাটাই হয়ে দাঁড়ায় বড় চ্যালেঞ্জ। তেল ব্যবসায়ী ও অবৈধভাবে বন দখলকারীদের চোখ পড়ে ওয়াওরানিদের আদিভূমির দিকে। তারা তেল সন্ধানের নামে অতিষ্ট করে তোলে এ আদিবাসী গোষ্ঠীর জনজীবন। কিন্তু লেজ গুটিয়ে পালায়নি ‘অশিক্ষিত’ আদিবাসীরা। তারা বন থেকে বাইরে এসে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। প্রকাশ্য বিরোধীতা করেছে এই সরকারি আগ্রাসনের। ওয়াওরানিদের সম্প্রদায়ের এক নেতা কথিত শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও বিষয়টা ঠিক ধরেছেন। সবার উদ্দেশ্যে নিজের ভাষায় তিনি বললেন, ‘বড়ো বড়ো কোম্পানির স্বার্থে মানুষ পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তাই সবার এই প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলনে যোগ দেয়া উচিৎ। যদি আমরা কেউ এতে অংশ না নেই, তবে বুঝতে আমরাই পৃথিবীকে ধবংস করছি।’ তিনি আরো প্রশ্ন ছোড়েন, সভ্য বিশ্বের কাছে জানতে চান, ‘তবে কী আপনারা চান তেল কোম্পানি জঙ্গলকে হত্যা করুক? বিশুদ্ধ পরিবেশ ও পানি থেকে মানুষকে দূরে ঠেলে দিক?’

এর উত্তর ইকুয়েডর কর্তৃপক্ষ দিতে পেরেছে কিনা জানা নেই, তবে ২০১২ সালে তেল অনুসন্ধান নিয়ে ওয়াওরানিদের সাথে একটি চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিলো ইকুয়েডর সরকার। অবশ্য পরে সে চুক্তি নিয়ে টালবাহানার অভিযোগ ওঠে। আদিবাসী নেতাদের দাবি সেই কথা রাখেনি সরকার। তারা প্রতারিত হয়েছেন। চুক্তির শর্ত না মেনেই ইকুয়েডর অ্যমাজনের এক লাখ আশি হাজার হেক্টর বন এলাকায় তেল অনুসন্ধান শুরু করে। যদিও দেশটির সংবিধানে বলা আছে কোনোভাবেই আদিবাসীদের ভূমি কব্জা করা যাবে না, এমন কোনো প্রকল্পও হাতে নেয়া যাবে না, যাতে আদিবাসীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। তাই তেল বেনিয়াদের হাত থেকে রেহাই পেতে জনবিচ্ছিন্ন এই আদিবাসী গোষ্ঠী আন্দোলনের পথ মাড়িয়ে দাঁড়ায় আদালতের বারান্দায়।
২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল ইকুয়েডরের পুয়োর এক অপরাধ আদালত ওয়ারানিদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকারকে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় তেল অনুসন্ধান বন্ধের আদেশ দিয়েছে। পাশাপাশি আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ারও পরামর্শ দিয়েছে। আর আদালতের এমন সিদ্ধান্তকে শুধু ওয়াওরানি নয়, অ্যামাজন বনাঞ্চল রক্ষার বড়ো পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিশষজ্ঞরা। যদিও জানা নেই শেষ অবধি কী ঘটছে ওয়াওরানিসহ বাকিসব অ্যামাজন বাসিন্দাদের ভাগ্যে। কতো দিন ঠিক বুক চিতিয়ে লড়তে পারবেন এই সংখ্যালঘু মানুষেরা। রাষ্ট্র যেখানেই নিজ থেকে বুক বাড়িয়ে কর্পোরেট বেনিয়াদের আশ্রয় দেয়, খনিজ সম্পদ আহরণের নামে গলা টিপে হত্যা করে প্রকৃতির অমূল্য দান বন-পাহাড়-নদীগুলোকে। তারা আসলে বুঝবেন কি প্রকৃতি তথা ওয়াওরানিরা শেষ হয়ে গেলে শেষ হয়ে যাবে অ্যামাজন! শেষ হবে জীব বৈচিত্র্য। আর জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়া মানে মানবসভ্যতার ধ্বংসও অনিবার্য।

৬ মে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন সত্যিই শিওরে ওঠার মতো। সংস্থাটি বলছে, বিশ্বের ৮০ লাখ প্রজাতির মধ্যে ১০ লাখ প্রজাতিই মানুষের কারণে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে ১০ কোটি হেক্টর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন ধ্বংস করেছে মানুষ। পাশাপাশি সবাইকে সতর্কও করেছে জাতিসংঘ। বলেছে, এখনই পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই বড়ো বিপর্যয়ের মুখে পড়বে পৃথিবী।