তীব্র পানি সংকটের হুমকিতে স্পেন, মরক্কো, ভারত ও ইরান

মরক্কো, ভারত, ইরাক এবং স্পেনে জলাধারগুলোর সংকোচনের কারণে শুরু হতে পারে পরবর্তী পানি সংকট। এমনটাই জানিয়েছেন পূর্বাভাস প্রদানকারী এক স্যাটেলাইটের ডেভেলপারেরা।

দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম প্রধান শহর কেপটাউন সম্প্রতি সংবাদ শিরোনামে এসেছিল জলশূণ্যতার কবলে পড়া প্রথম শহর হিসেবে। সেখানে অবস্থা এতই খারাপ যে তিন বছর মেয়াদী খরার আশংকা দেখা দিয়েছিল। জরুরী ভিত্তিতে পানি ব্যবহারে ব্যাপক নিয়ন্ত্রন এনে দক্ষিন আফ্রিকার এই শহর আপাতত ঠেকাতে পেরেছে তাদের করুণ দশা। কিন্তু বিশ্বে এখনো অনেক দেশ রয়েছে এমন ধরণের ঝুকির মাঝে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরিবেশ সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইন্সটিটিউট (ডাব্লিউআরই)’ জানিয়েছে, বাড়তি চাহিদা, অব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ডজনখানেক দেশ আছে হুমকিতে। এই সংস্থাটি ডেলতারেস, ডাচ সরকার এবং অন্য আরো কিছু সংস্থার সাথে একসাথে কাজ করছে পানি এবং নিরাপত্তা পূর্বাভাসের সিস্টেম তৈরি করার লক্ষে। এই সিস্টেম এর উদ্দেশ্য হবে সামাজিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং সীমান্ত সংরক্ষনসহ নানান বিষয়ে আগে থেকে জানান দেবে। এর একটি নমুনা এই বছরের শেষ নাগাদ দেখা যেতে পারে। তবে গত বুধবারে এই সিস্টেম এর তোলা একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে, যা থেকে দেখা যায় পৃথিবীর চারটি সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় থাকা বাধ সম্পর্কে তথ্য।

এই তালিকায় শুরুতেই মরক্কোর দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাধার আল মাসিরা রয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত ৬০% সংকুচিত হয়ে গিয়েছে এরই মাঝে। পরপর কয়েকবার খরা, সেচ বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী শহর ক্যাসাব্লাংকার তৃষ্ণা মেটাতে গিয়েই হুমকিতে পড়েছে জলাধারটি। বৃষ্টিপাতের পরেও অবস্থার উন্নতি ঘটেনি। এর আগে যখন এমন শুষ্ক পরিস্থিতি হয়েছিলো তখন সেখানে খাদ্য উৎপাদন নেমে গিয়েছিলো অর্ধেকে। আর তার ফলে ভুগেছেন প্রায় ৭ লাখ মানুষ। এই জলাধারের উপরে চাপ আরও বাড়বে এই বছরের শেষ নাগাদ।

ইরাকের মসুল বাধ আরো দীর্ঘস্থায়ী পতনের সাক্ষী। এটিও ৬০% সংকুচিত হয়েছে। নগন্য বৃষ্টিপাতের কারণে এমন দশা এই জলাধারের। তাছাড়া তুরষ্কের জলবিদ্যুত প্রকল্পগুলোর চাহিদার ফলেও বাড়তি চাপ পড়ে এর উপরে। সিরিয়া এবং ইরাক, দুই দেশে যে সহিংসতার ঘটনা, তার পিছনে এই পানিস্বল্পতাও কিছুটা দায়ী। এই দুই দেশের গ্রামাঞ্চলে পানির অপ্রাপ্যতার কারণে অনেকে গ্রাম ছেড়ে ভীড় জমিয়েছেন শহরে।

ভারতেও চলছে থমথমে ভাব। সেদেশের দুটি জলাধার যা নর্মদা নদী দ্বারা সংযুক্ত, সেগুলোর পানি ভাগাভাগি নিয়ে একটু গরম অবস্থাই চলছে সেখানে। গত বছরের বাজে বৃষ্টিপাতের ফলে উজানের দিকের ইন্দিরা সাগর বাধ সংকুচিত হয়েছে প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। আর ভাটির দিকে সরদার সরোবর জলাধারে এই কম বৃষ্টিপাতের প্রভাবে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, কারণ এটিই সেখানকার ৩০ কোটি মানুষের খাবার পানির যোগান দেয়।

গত মাসে গুজরাট প্রদেশের সরকার সেখানে সেচ নিষিদ্ধ ঘোষিত করে আর কৃষকদেরকে অনুরোধ করে নতুন করে ফসল না বপন করতে।

শিল্পোন্নত দেশগুলোতে এই সামাজিক ঝুঁকিগুলো তুলনামূলকভাবে কম। কারণ সেসব দেশ কৃষির উপরে নির্ভর করেনা, আর আর্থিকভাবেও তারা মোটামুটি স্বচ্ছল।

স্পেনে এক খরার ফলে বুয়েন্দিয়া বাধের আশেপাশে পানির সংকোচন ঘটেছে ৬০ শতাংশ। আর তার ফলে জলবিদ্যুৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার কারণে বেড়ে গিয়েছে বিদ্যুৎ এর মূল্য।

উল্লেখিত চারটি বাঁধই অক্ষরেখার মাঝ বরাবর অবস্থিত এবং এদের ভৌগলিক অবস্থান এমন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেসব স্থানে খরার সম্ভাবনা খুব বেশি। আরো যত বাধ নিয়ে গবেষনা করা হচ্ছে, ততই সম্ভাবনা বাড়ছে এমন ঝুকির মুখে থাকা বাধের সন্ধান পাবার।

ডাব্লিউআরই এর চার্লস আইসল্যান্ড বলেন, “এই চারটি বাধ আসলে আসন্ন দিনগুলি সম্পর্কে দুঃখের সংবাদ দিচ্ছে। আরো অনেকগুলো কেপ টাউনের দেখা পেতে যাচ্ছি আমরা। বিশ্বজুড়ে অবস্থা খারাপের দিকেই যাচ্ছে”।