থাই বালকদের উদ্ধারকার্যঃ সাহসিকতা, দক্ষতা আর ভালোবাসার জয়

মাঝেমাঝে পৃথিবীর বাকি সব খবরই যেন অর্থহীন মনে হয়। গুহায় আটকে পড়া সেই থাই বালকেরা আর তাদের কোচকে বের করা সম্ভব হয়েছে সেখান থেকে। তাদের আটকে পড়ার এই ঘটনায় বুক কেপেছে অনেকেরই। কিন্তু এই দলটি ও তাদের কোচকে যখন উদ্ধার করা হলো, সেই উদ্ধার তৎপরতা আর সকলের প্রচেষ্টা দেখে অবাক না হয়ে পারা যায়না। ডুবুরিরা নায়কোচিতভাবে এক অসাধ্য সাধন করতে সক্ষম হয়েছেন। সারা বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে সেই ঘটনাটি।

মাটির নিচে আটকে থাকা, আর কালো পানিতে নিজেদের নিমজ্জিত হয়ে যাবার অপেক্ষা অনেকেরই এক অন্যতম ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের রূপ। এমনই এক মৃত্যুকূপে স্বেচ্ছায় নেমে বিপদগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার আর ঔষধ সরবরাহ করা এবং ঘটনাক্রমে তাদেরকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করতে পারা অবিশ্বাস্য এক ব্যাপারই বটে। শেষ মূহুর্তে যার সবচেয়ে বেশি অভাব ছিলো তা হলো অক্সিজেনের পর্যাপ্ততা। আর নিজে পর্যাপ্ত অক্সিজেন গ্রহণ করতে না পারার কারণে একজন হারালেন প্রাণ। সামান কুনান অন্যদেরকে বাচাতে গিয়ে নিজে প্রাণ উৎসর্গ করলেন। বিশ্ববাসী তাকে ভুলবেনা।

সমগ্র পৃথিবী রুদ্ধশ্বাসে দেখছিলো যে এই উদ্ধারকাজে সকলে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবেন কিনা। আমরা অনেকেই হয়তো একটি গুহার ভিতরে ঠিক কিরকম পরিবেশ তা জানিনা, এমনকি কল্পনাও করতে পারিনা। ১৬ ইঞ্চির কাছাকাছি সরু এক পাথরের ফাঁক দিয়ে পিছলে ওইপাড়ে যাবার কথা বাদই দিলাম। এমন সরু এক ফাঁক দিয়ে ঢোকার জন্য নিজের অক্সিজেন ট্যাংক খুলে রেখে সেখানে ঢোকা আর নরকে ঢোকা সমার্থক। কিন্তু উদ্ধারকর্মীরা সেই অসাধ্য সাধন করে দেখালেন।

থাই নেভী সীলস এবং আন্তর্জাতিক কেইভ ডাইভারদের সেই চমৎকার সমন্বিত দলটির কথাই বলা হচ্ছে এখানে। আগে অনেকেরই প্রশ্ন জাগতো, এমন বাহিনীর কি দরকার? তাদের প্রয়োজনীয়তাটা আসলে কোথায়? এমন বাহিনীর কোন কর্মকান্ডের কথা তেমন শোনাও যায়না। কিন্তু আমরা দেখলাম, বহু বছরের সাধনা আর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই দলটিই শেষমেশ এমন অসাধ্যের বাস্তবায়ন দেখালো। তারা জানতো কিভাবে করতে হবে এবং কখন করতে হবে। তারা উপমহাদেশ পাড়ি দিয়েছে কয়েকজন শিশুর প্রাণ রক্ষার্থে। তারা জানতেন যে যাদের উদ্ধার করতে হবে তাদেরকে কিভাবে মানসিক ও শারীরিকভাবে শক্তি যোগানো যায়। তারা অতীতে দুর্গম সব গুহা থেকে লাশ উদ্ধার করেছেন, অনেকে ফিরেছেন নিজেরাই লাশ হয়ে। এত সব ঝুকি মাথায় নিয়েও তারা বারবার ফিরে যান এমন সব মৃত্যুপুরীর ভিতরে।

এই গল্প আমাদের সবচেয়ে নাড়া দেয় কারণ এমন নিঃস্বার্থ সহযোগীতার উদাহরণ খুব কমই আছে, ফাঁপা নায়ক আর স্বার্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে ভরা সহায়তার নাটক দিয়ে পৃথিবী বেষ্টিত। এমনকি এতগুলো শিশুকে নিয়ে বিপদে পড়ার পরেও সেসব শিশুদের পিতামাতারা সে দলের কোচকে আশ্বস্ত করেছেন যে তারা তাকে কোনরকম দোষ দেননি ঘটনাটির জন্য। অনেকে বলছেন যে কোচ আসলে তার খেলোয়াড়দেরকে ধ্যান করানোর জন্য সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। থাইল্যান্ড সরকার এসব বালকদের আর তাদের পরিবারকে মিডিয়ার ক্যামেরার খপ্পর থেকে বাচাতে জোরদার নির্দেশ দিয়েছেন। এই ঘটনাটি টেলিভিশনের চেয়ে ইন্টারনেটের কল্যাণেই মানুষ দেখেছে বেশি। টেলিভিশনে কেবলই অ্যাম্বুলেন্স আর হেলিকপ্টার ছাড়া কিছু দেখাচ্ছিলোনা। স্থানীয়রা কয়লা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সকলের খাবারের ব্যবস্থা করতে তৎপর হয়েছিলো। বালকেরা সেখান থেকে বেরিয়ে এসেই খেতে চাইলো। তাদের দেখে মায়া জন্মাতে বাধ্য যেকোন মানুষের মনের মাঝে। আর সেই উদ্ধারকার্যে সহায়তা করতে ইলন মাস্ক এর পাঠানো সাবমেরিন তো ছিলোই।

আমরা সকলে কৃতজ্ঞ যে সেই বালকেরা ভালোভাবে ফিরতে পেরেছে। ভঙ্গুর বিবেকের এই পৃথিবীতে এখনো যে ভালো মানুষ আছে এই ঘটনা তা আবারো প্রমাণ করে। এই বালকদের আরো সহায়তা লাগবে স্বাভাবিক হতে। সংবাদপত্রে লেখালেখি করে আসলে অন্তরের ভয় দূর করা যায়না। কিন্তু আমরা যা দেখলাম, তা কোন আচমকা ঘটনা নয়, বরং সুগঠিত নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা, আরো এক বিজয় ভালোবাসার। ‘মানুষ’ যেন এমনই হবার কথা, এমনই অসাধারণ।