ফিলিস্তিনে ইসরায়েল ‘হয়তো’ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেঃ জাতিসংঘ

ফিলিস্তিনের গাজা সীমান্ত আন্দোলনে শিশুসহ প্রচুর নিরপরাধ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলি সেনারা ‘হয়তো’ মানবতার বিরুদ্ধে অন্যায় করে ফেলেছে, গত বৃহস্পতিবার এমনটাই বলেছেন জাতিসংঘের তদন্তকারীরা। জানা গেছে আল জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের গঠিত তদন্ত দলের সদস্যরা এই সহিংসতার ভেতরে খতিয়ে দেখেছেন। তাদের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ১৮৯ জন ফিলিস্তিনিকে প্রাণে মেরে ফেলেছেন এবং ৯০০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে আহত করেছেন। গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় ২৫ পৃষ্ঠার এই তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করার সময় তারা বলেন, এই দায়ে অভিযুক্ত কাউকে শাস্তি দেবার কোন ইচ্ছাই দেখাচ্ছেনা ইসরায়েল।

রিপোর্টে বলা হয়, “ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী সুশৃংখল আন্দোলনকারীদের উপরে হামলা করেছে যারা কোন ধরণের সহিংসতা করছিল না বা কোন ধরণের হুমকি ছিল না। তাদের দিকে যখন গুলি ছোড়া হলো তখন পর্যন্ত তারা পাল্টা হামলা চালায়নি। হত্যাযজ্ঞ না চালিয়ে আরো কম সহিংসতার মধ্য দিয়ে ব্যাপারটি অবসান করা সম্ভব ছিল। সেখানে হত্যা করার অর্ডার একেবারেই অপ্রয়োজনীয়”।

এদিকে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে দোষারোপ করেছে হামাস নামের এক জঙ্গি দলকে। এই দলটি গাজার দিকে ক্ষমতাশালী। বিবৃতিতে বলা হয়, “হামাস সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েল তাদের আক্রমণের জবাবে আমাদের সাধারণ জনগণকে নিরাপদে রাখতে তাদের হামলা ঠেকিয়েছে মাত্র”।

ফিলিস্তিনিরা চেয়েছিল তাদের উপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক কারণ এটির জন্য গাজার প্রসার আটকে আছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। আলাদা হবার ৭০ বছর পরে এসে ফিলিস্তিনের দাবি ছিল যে শরণার্থী ও ইসরায়েল থেকে চলে আসা মানুষেরা যেন তাদের নিজ ভূমিতে ফিরতে পারে।

কিছু আন্দোলনকারী আন্দোলনের সময়ে ব্যারিকেডে আঘাত করেছে এবং ইসরায়েলে প্রবেশের চেষ্টা করেছে। অন্যরা জ্বলন্ত টায়ার গড়িয়ে দিয়েছে বেড়ার দিকে, তারকাটা টেনে ছিড়ে ফেলেছে, ফানুস উড়িয়েছে অথবা ইসরায়েলি সেনাদের দিকে পাথর নিক্ষেপ করেছে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই বেড়া থেকে শত শত গজ দূরে শান্তিপূর্ণভাবেই অবস্থান করেছে। তাদেরকেও গুলি করে মেরেছে ইসরায়েলি সেনারা।

ইসরায়েল সরকার বলছে হামাস সাধারণ মানুষের ভিতরে সহিংসতা উস্কে দিয়েছে। তারা জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের সাথে একমত নয়। তারা বলছে এটি মানবাধিকার কাউন্সিলের একপাক্ষিক মতামত। এই কাউন্সিলের তিন সদস্যের একটি দলকে ইসরায়েল ও গাজা পরিদর্শনে আসার ব্যাপারেও তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মিশর শুরুতে তদন্তকারীদেরকে গাজা পর্যন্ত যাবার অনুমতি দিলেও পরবর্তীতে নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে তা নিষিদ্ধ করেছে।

এই অংশে প্রবেশ না করেই কমিশন ৩২৫ জনের সাক্ষাৎকার ও ৮,০০০ নথিপত্র সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এসব নথির মধ্যে আছে বিভিন্ন এফিডেভিট ও মেডিক্যাল রিপোর্ট। তাছাড়াও রয়েছে ছবি, ভিডিও ও ড্রোন ফুটেজ।

কমিশন থেকে বলা হয়েছে যে ইসরায়েলি স্নাইপারধারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিক, স্বাস্থ্যকর্মী, শিশু ও নিরীহ প্রতিবন্ধী মানুষ হত্যা করেছে। ১৮৯ জন নিহত ফিলিস্তিনির মাঝে ১৮৩ জনই মারা গেছেন গুলিবিদ্ধ হয়ে, যার মধ্যে ৩৫ জন শিশু, তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী ও দুজন সাংবাদিক রয়েছেন।

এই রিপোর্টে আরো জানানো হয় যে ৬,১০৬ জন মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৯৪০টি শিশু, ৩৯ জন স্বাস্থ্যকর্মী ও ৩৯ জন সাংবাদিক আছেন। সেই সাথে ৩,০৯৮ জন মানুষ গুলির অংশবিশেষ বা অন্যান্য বিস্ফোরনের তোড়ে আহত হয়েছেন। অনেকে আহত হয়েছেন টিয়ার শেল এবং রাবার বুলেটের আঘাতে।

প্যানেলের একজন সদস্য সারা হোসেইন বলেন, “সাংবাদিক, স্বাস্থ্যকর্মী ও শিশু হত্যার কোন সঠিক কারণই নেই। যে বা যারা কোন ধরণের হুমকির কারণ না তাদেরকে হত্যা করাকে কোনভাবেই বৈধতা দেওয়া যাবেনা”।

এমন ঘটনার বিচার ইসরায়েলের আদালত বা আন্তর্জাতিক আদালতে সম্ভব। কিন্তু মিস হোসেইন জানান যে ইসরায়েল সরকার এমন কোন পদক্ষেপ নিতে কোন সহায়তাই দিচ্ছেনা।