ফ্রান্সের “ইয়েলো ভেস্ট” কারা, কি চায় তারা?

ফ্রান্সে সম্প্রতি তোলপাড় তুলেছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ প্রতিবাদকারীরা। বেশ কয়েক দফার সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে দেশটির রাজধানী প্যারিস। সহিংস এই আন্দোলনের পর দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারির কথাও বিবেচনা করছে সরকার।

গত ১৭ নভেম্বর পূরব সাভোয়ি এলাকায় আন্দোলন চলাকালে একজন আন্দোলনকারী মারা যান। বেশ কিছু পুলিশ অফিসারও সেদিন আহত হন। আর নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে চ্যাম্পস-এলিসিস এলাকায় পুলিশ আর আন্দোলনকারীদের মাঝে বেশ কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যেখানে ব্যারিকেডের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, বিভিন্ন অভিজাত দোকানপাট লুটপাট হয় এবং ট্রাফিক লাইট উপড়ে ফেলা হয়। এসময়ে ৩০ জন মানুষ আহত হয় এবং শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত ১ ডিসেম্বর বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে প্রায় একই ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দাঙ্গা পুলিশ সেখানে জলকামান ব্যবহার করে পাথর নিক্ষেপকারী আন্দোলনকারীদের দমন করে। এর আগে তারা পুলিশের দুটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। কিভাবে শুরু এই আন্দোলনের আর কারা এই ‘ইয়েলো ভেস্ট’? উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে দ্য জার্নালের একটি প্রতিবেদনের সাহায্যে।

এই আন্দোলনের শুরু গত মাসে। গাড়ির তেলের মূল্যের ট্যাক্স বৃদ্ধির প্রতিবাদে এর শুরু হয়। শহরের অদূরে যারা ছোট শহর কিংবা গ্রামের দিকগুলোতে থাকেন তাদের গাড়িতেই যাতায়াত করতে হয়। এই মূল্যবৃদ্ধি বড় শহরের আরো উন্নতিতে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন অনেকে। এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে আগামী ১ জানুয়ারীতে ডিজেলের উপরে ট্যাক্স বাড়বে ৬.৫ সেন্ট এবং গ্যাসোলিনের উপরে বাড়বে ২.৯ সেন্ট।

এই ইয়েলো ভেস্ট পরা আন্দোলনকারীরা মূলত এই হলুদ পোশাক পরেছে কারণ এটি খুব সহজেই দেখা যায় এবং ফ্রান্সের সকল ড্রাইভারের গাড়িতে এটি থাকা বাধ্যতামূলক। তারা দেশজুড়ে রাস্তা ব্লক করেছে। ইয়েলো ভেস্ট পরিহিত এই আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে আসা বার্তা আর ট্যাক্স বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল করাতেই সীমাবদ্ধ নেই।

ওপেন্সিটিজ পলিটিকাল কনসাল্টেন্সি ফার্ম এর বিশেষজ্ঞ ফামকে ক্রাম্বমুলার এনবিসি নিউজ কে জানান, এই আন্দোলন ফ্রান্সের অবহেলিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কথা বলে। অনেকেরই দাবি, তারা যতখানি ট্যাক্স দেন সেই অনুযায়ী সেবা পাননা রাষ্ট্রের কাছ থেকে। কিছু আন্দোলনকারী তাই চান ধনীদের ট্যাক্স কর্তন আইন বাতিল করা এবং দরিদ্র্য শ্রেণীর মানুষের সুবিধার্থে নতুন আরো কিছু ধারা শুরু করতে। অনেকেই প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর পদত্যাগ চাইছেন।

দুই সপ্তাহ আগে একজন নারী আন্দোলনকারী মারা যান এবং ২২০ জন আহত হন এই চলমান আন্দোলনে। পূর্ব সাভোয়ি এলাকায় এক মা তার মেয়েকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আন্দোলনকারীরা তাদের গাড়ি অবরোধ করে। এতে সেই আরী আতংকিত হয়ে সজোরে গাড়ি ভীড়ের মধ্যে চালিয়ে দিলে ৬৩ বছর বয়সী এক আন্দোলনকারী মারা যান। দেশজুড়ে প্রায় ২,০০০ টি আন্দোলন কর্মকান্ডে প্রায় ২,৮৩,০০০ জন মানুষ অংশ নিয়েছেন।

২৩ নভেম্বর ৪৫ বছর বয়সী এক আন্দোলনকারী হলুদ ভেস্ট এর সাথে বিস্ফোরক পরিধান করে হুমকি দেন। তিনি দাবি করেন প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ যেন আন্দোলনকারীদের সাথে আলাপ করেন। কয়েক ঘন্টা তাকে বুঝিয়ে শান্ত করা হয়।

গত শনিবার কয়েক হাজার আন্দোলনকারী হলুদ ভেস্ট পরিহিত অবস্থায় চ্যাপ্স-এলিসিস এ জড়ো হন। পুলিশ দাবি করে, এই জনতার ভীড়ে পুলিশকে হয়রানি করেছে এমন অনেকে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ ১৩০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে ৬৯ জন প্যারিসের, আর তাদের মধ্যে আহত হয়েছেন ২৪ জন। আহতদের মধ্যে ৫ জন পুলিশ অফিসারও ছিলেন।

ফ্রান্সে তো অনেক আন্দোলনই হতে থাকে, এটি তবে আলাদা কেনো? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এই আন্দোলনের প্রকৃতপক্ষে কোন নেতা নেই এবং এর আয়োজন মূলত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেই করা হচ্ছে।

যদিও সরকার এই আন্দোলনে সহিংসতার দায় দিচ্ছে ডানপন্থী সমর্থকদের, কিন্তু বৃহত দৃষ্টিতে দেখলে এই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থান খুবই মিশ্র ধরণের।

এক জনমত জরিপে দেখা যায় যে ফ্রান্সের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নাগরিক আন্দোলনকারীদের সমর্থন করেন এবং ৮০% মানুষ মনে করেন মাক্রোঁর এই সিদ্ধান্ত বাতিল করা প্রয়োজন।

গত শনিবার ফ্রান্স সরকার আন্দোলনকারীদের সাথে সমঝোতায় আসার চেষ্টা চালায়, কিন্তু আমন্ত্রিত আটজন প্রতিনিধির মধ্যে মাত্র দুইজন প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করতে আসেন। সেই দুজনের একজন সাংবাদিকদের ঢুকতে না দেওয়ায় সাথে সাথেই সেখান থেকে প্রস্থান করেন।