সিল্ক রোডের পুর্নজন্ম: কী করতে চাইছে চীন?

রোমান সম্রাজ্যের সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ব্যবসা সচল রাখার জন্যে ব্যবহৃত প্রাচীন রাস্তা সিল্ক রোডের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। এই রাস্তা দিয়েই পূর্বদেশীয় সিল্ক প্রথমবারের পৌছতে পেরেছিলো ইউরোপের দেশগুলোতে। তখন থেকেই সেই রাস্তার এই নামকরণ।

সেই ঐতিহাসিক রাস্তারই যেন পুনঃজন্ম হতে চলেছে। ২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং নতুন এক রাস্তা নির্মাণের ঘোষণা দেন যা চীনকে এর পশ্চিমা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এ রাস্তা দিয়ে মূলত মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য আর ইউরোপের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।

২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড অ্যাকশন প্ল্যান’ এ বলা হয়, এ উদ্যোগের বাস্তবায়নের দ্বারা আশেপাশের ভূমি অঞ্চল ও উপকূলবর্তী এলাকাগুলোয় সম্পর্ক ও বাণিজ্যের কাঠামোগত উন্নয়ন ঘটবে।

৯০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের এ পরিকল্পনা বিশ্লেষণকালে চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি বিশ্বায়নের নতুন এক যুগের সূচনা করবে। এই রাস্তার মাধ্যমে বাণিজ্যের সোনালী দিনের শুরু হবে, যা দ্বারা সবাই উপকৃত হবে।

তবে বিশ্বব্যাপী এ সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে মিশ্র অনুভূতি বিরাজমান। কিছু দেশ চীনের ব্যবসা ছাড়াও অন্য কোন ভৌগলিক রাজনীতির চাল আছে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তবে অনেক দেশের প্রতিনিধিরা বেইজিং এ এ পরিকল্পনার উম্মোচন অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন এবং এর যথেষ্ট প্রশংসা জানিয়েছেন। এ প্রোজেক্টটি একটা খুবই বড়, ব্যয়বহুল আর সমালোচিত প্রোজেক্ট। উম্মোচনের ৪ বছর পরে এসেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।

কারা সবথেকে বেশি সুবিধা ভোগ করবে?

পৃথিবীর ৬২ টি দেশ সামনের পাঁচ বছর ধরে ৫০০ বিলিয়নেরও বেশি আর্থিক বিনিয়োগ করার সম্ভাবনা রয়েছে। তার মধ্যে বেশিরভাগই আসছে ভারত, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মিশর, ফিলিপাইন আর পাকিস্তান থেকে।

চীন বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যেই নানান ধরণের প্রোজেক্ট সাজিয়ে ফেলেছে। চীন, রাশিয়া, কাজাকিস্তান আর মায়ানমারের মধ্যে তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন স্থাপন, ইথোপিয়া, কেনিয়া, লাওস আর থাইল্যান্ডের মধ্যে রাস্তা নির্মানসহ নানান কাজে চীন ইতিমধ্যেই জড়িত।

পাকিস্তান এ নতুন সিল্ক রোড তৈরির ক্ষেত্রে বড় এক সমর্থক দেশ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ বলেন, “এটি আসলেই এক নতুন যুগের সূচনা। আন্তঃমহাদেশীয় যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প”। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক সেতুর এক প্রান্তে থাকা এক দেশের কাছ থেকে এমন প্রশংসা পাওয়াই স্বাভাবিক। চীনের অধীনে থাকা রাস্তা, ব্রীজ, উইন্ডমিলসহ যেকোন প্রোজেক্ট থেকে পাকিস্তানের প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলার লাভের সুযোগ রয়েছে।

চিলির প্রেসিডেন্ট বাশেলেট মনে করেন, এ রাস্তা সকলের জন্য সাম্য, সমৃদ্ধি আর শান্তি বয়ে আনবে।

বিরোধীতা করছে কারা?

এ প্রকল্পের সবচেয়ে কঠোর সমালোচক বোধহয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি তীব্রভাবে চীন-পাকিস্তান এর মধ্যকার ৪৬ বিলিয়ন ডলার চুক্তির এ বিষয়টির নিন্দা জানান। কারণ এ চুক্তির একটি অংশ কাশ্মীরভিত্তিক, ভারত যেটিকে নিজেদের বলে দাবি করে। মোদী এটিকে ‘ঔপনিবেশিক উদ্যোগ’ বলে আখ্যা দেন এবং জানান যে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চারিদিকে ঋণের বোঝা বাড়বে।

মোদী ছাড়াও জাপান, দক্ষিন কোরিয়া এবং উত্তর কোরিয়া থেকে কোন উচ্চপদস্থ নেতাকর্মী যাননি বেইজিং-এর সে উম্মোচন সভায়। গ্রুপ অফ সেভেন (জি ৭) এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কেবল ইতালীয়ান প্রধান মন্ত্রী পাওলো জেন্তিলোনী উপস্থিত ছিলেন সেখানে।

চীনের উদারতায় মুগ্ধ দেশগুলোর মাঝে কিছু দেশ আবার একই সাথে শঙ্কিত। বিশ্বের অনেক দেশ এ থেকে উপকৃত হলেও বেইজিং-এর রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে সেসব দেশের রয়েছে মতের অমিল, যা একটি চিন্তার বিষয়। কারন কারো পন্থা পুরোপুরি সমর্থন করতে না পেরে তার হাতে এতখানি ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া শঙ্কার উদ্রেগ ঘটাচ্ছে। তবে সম্প্রতি চীন জানিয়েছে যে, সিল্ক রোডের মাধ্যমে তারা কারো উপর কোন ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে না।