সুইডেনের স্কুলপড়ুয়া মেয়েটি যেভাবে শুরু করল একটি বৈশ্বিক আন্দোলন

১৬ বছর বয়সী গ্রেটা থানবার্গ। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে সুইডেনের নাইনথ গ্রেডের এই শিক্ষার্থী। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা সম্পর্কে জেনে ও সুইডেনে ভয়াবহ দাবদাহ ও দাবানলের বিভীষিকা প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করার পর কিছু একটা করার প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করে গ্রেটা। সেই তাড়না থেকে ২০১৮ সালের ২০ আগস্ট সুইডিশ পার্লামেন্টের সামনে একাই দাঁড়িয়ে যায় একটা প্ল্যাকার্ড হাতে। যেখানে লেখা ছিল, “জলবায়ুর জন্য স্কুল ধর্মঘট”। খুবই দ্রুত শুধু সুইডেন না, পুরো বিশ্বের স্কুলপড়ুয়ারা নেমে আসে রাস্তায়। ধর্মঘট করে তারা জানান দেয় সুস্থ-পরিচ্ছন্ন একটা পৃথিবীতে তাদের বেড়ে ওঠার অধিকারের কথা। 

“জলবায়ুর জন্য স্কুল ধর্মঘট”

২০১৮ সালের নভেম্বরে বড় আকারের বিদ্রোহ দেখা যায় অস্ট্রেলিয়ায়। ডিসেম্বর নাগাদ সেটা ছড়িয়ে যায় বিশ্বের প্রায় প্রতিটা কোনায়। ২০১৯ সালের শুরু থেকে বেশ কয়েকটি বড় স্কুল ধর্মঘট পালিত হয়েছে বিভিন্ন দেশে। ১৭-১৮ জানুয়ারি শুধু সুইজারল্যান্ড আর জার্মানিতেই স্কুল ধর্মঘট করে রাস্তায় বিক্ষোভ দেখিয়েছে ৪৫ হাজার শিক্ষার্থী। ১৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তায় নেমে আসে স্কুলপড়ুয়ারা। বিশ্বজুড়ে একযোগে সম্মিলিত স্কুল ধর্মঘট পালিত হয় ১৫ মার্চ। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত, প্রতিটি দেশ এই ধর্মঘটে সামিল হয়। একযোগে ১৪ লাখ স্কুল-শিক্ষার্থী আওয়াজ তোলে জলবায়ু নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য। সেদিনই গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক লেখায় গ্রেটা ও তার সহযোদ্ধারা লিখেছিলেন একটি লেখা, যার শিরোনাম ছিল: “ তোমরা ভাবছ যে আমাদের স্কুলে থাকা উচিৎ? আজকের এই জলবায়ু ধর্মঘট আমাদের সবচেয়ে বড় পাঠ”।

ব্যানারে লেখা: “কেন জানব, যদি কোনো ভবিষ্যতই না থাকে” (বার্লিন, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৯)

কিভাবে এরকম চিন্তাভাবনা আসল আর সেটা বাস্তবে রূপ নিল শুনুন গ্রেটার মুখেই:

যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার অনেক পরিকল্পনা ছিল। এটা-ওটা হওয়ার কথা ভাবতাম। অভিনেত্রী থেকে শুরু করে বিজ্ঞানী পর্যন্ত– হওয়ার কথা ভাবতাম। কিন্তু একদিন স্কুলে এক শিক্ষক আমাদের বলছিলেন জলবায়ু পরিবর্তনের কথা। এটা আমার জন্য একটা চোখ খুলে দেওয়ার মতো ব্যাপার ছিল। এরপর আমি এটা নিয়ে আরও যত পড়াশোনা করলাম, ততই দেখতে পেলাম যে, এটা সবার জন্যই কতটা বিপদজনক। আমি এতটাই মুষড়ে পড়েছিলাম যে, কারো সঙ্গে কথা বলতাম না, স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়েছিলাম।
ব্যাপারটা আমাকে খুবই উদ্বিগ্ন করে তোলে। আর একদিন আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি যে, যথেষ্ট হয়েছে। আমি এটা আর মেনে নেব না। আমার এবং অন্য সবারই ভবিষ্যত খুব হুমকির মুখে আছে। কিন্তু এটা নিয়ে কিছুই করা হচ্ছে না, কেউই কিছু করছে না। ফলে আমাকেই কিছু একটা করতে হবে। 
এমন ভাবনা থেকে আমি সুইডিশ পার্লামেন্টের বাইরে একাই মাটিতে বসে পড়ি আর সিদ্ধান্ত নিই যে, আমি আর স্কুলে যাব না। প্রথম দিন আমি একদমই একা একা বসে ছিলাম। এরপর দ্বিতীয় দিনে অন্য অনেকে আমার সঙ্গে যোগ দেওয়া শুরু করে। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে, এরকমটা হবে। কিন্তু এটা হয়েছে। খুবই দ্রুত। 
এটা খুবই অসাধারণ ব্যাপার যে, বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার শিশু আমার মতোই প্রতিবাদ করেছে। তারা বলেছে যে, যদি আমাদের কোনো ভবিষ্যতই না থাকে, তাহলে আমরা কেন স্কুলে যাব? আর কেন আমরা বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানব, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাই অগ্রাহ্য করা হয়?

পুরোনো সাইকেলকে এভাবে নিজের মত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে গ্রেটা

আমাদের এখনো কিছু সময় আছে সবকিছু থামিয়ে আবার গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়ার। ইমার্জেন্সি ব্রেক চাপার আর কার্যকরী সব পদক্ষেপ নেওয়ার। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সময়ের পর্যায়টাও খুব বেশিদিন থাকবে না।

h