‘þetta reddast’: যে অদ্ভুত জীবনদর্শনে চলে আইসল্যান্ডের মানুষ!

মনে করেন আপনি বেড়াতে গেছেন নতুন কোনো দেশে। ঘুরে দেখার জন্য গাড়ি ও অন্যান্য জিনিসপত্র ভাড়া নিয়েছেন কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। হঠাৎ মাঝপথে আপনার গাড়ি খারাপ হয়ে গেল। আপনাকে অপরিকল্পিত একটা অবস্থার মধ্যে পড়তে হলো। আপনি ফোন দিলেন সেই প্রতিষ্ঠানে। তারা তৎক্ষণাৎ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না বলে জানাল। পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিল। আর সবশেষে বলল, ‘আচ্ছা! ‘þetta reddast!’’

বলাই বাহুল্য, হোঁচট খেলেন! মানে কী এর? গুগল করে আপনি জানতে পারলেন যে, ‘þetta reddast!’ মানে এমন না যে, ‘দুঃখিত, আপনার এসব ঝামেলার মিটমাট করার জন্য আমরা যথেষ্ট অর্থ পাইনি।’ বা অর্থটা এমনও না যে, ‘রাস্তার মাঝখানে এরকম ঝামেলায় না পড়ার চেষ্টা করবেন’। এটার অর্থ দাঁড়ায়, ‘সবকিছু শেষে ঠিকঠাকই হয়ে যাবে’।

———————————-
আইসল্যান্ড নিয়ে আরও পড়ুন: 
*** অর্থনৈতিক ধাক্কা কাটিয়ে কিভাবে সমৃদ্ধির পথে গেল আইসল্যান্ড

***  আইসল্যান্ডের ইতিহাসে পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন মাত্র একজন!

***  বইপোকাদের দেশ: যেখানে প্রতি ১০ জনের একজন লেখক! 
————————————–

আইসল্যান্ডে এই ‘þetta reddast!’ যেন একটা জাতীয় স্লোগান। একটা জীবনদর্শন। এই একটা বাক্য দিয়েই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে আইসল্যান্ডবাসী কিভাবে জীবনের সামনে দাঁড়ায়। আরাম-আয়েশী ও সহজমুখী মনোভাব নিয়ে। সেই সঙ্গে থাকে দারুণ রসবোধের মিশেল। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমনভাবেই আইসল্যান্ডের এই জীবনবোধের পরিচয় তুলে ধরছিলেন কেটি হ্যামেল।

আইসল্যান্ডের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে বেশ কিছু বইয়ের প্রণেতা Alda Sigmundsdóttir বলেছেন, ‘এখানে এটা সর্বত্র বিরাজমান একটা শব্দবন্ধ। একটা জীবনদর্শন, যা এখানকার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। এটা বলা হয়ে থাকে কিছুটা হালকাভাবে, উৎফুল্ল ভঙ্গিতে। এটা ব্যবহৃত হতে পারে কাউকে সান্তনা দেওয়া বা সমবেদনা জানানোর ক্ষেত্রে। বিশেষ করে যখন কেউ ভালোমতো বুঝতে পারে না যে, আসলে কী বলা উচিৎ। সব মিলিয়ে এটা দিয়ে অনেক কিছু বলে ফেলা যায়।’

কিন্তু কিভাবে এরকম জীবনবোধ গড়ে উঠল আইসল্যান্ডবাসীর? তাদের কোনো কিছুই তো ঠিকঠাক থাকার মতো না। বছরের একটা সময়ে তারা দিনের আলো পায় মাত্র ৪ ঘন্টা। অনবরত থাকে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের আশঙ্কা। অন্যান্য যাবতীয় দৈনন্দিন টানাপোড়েন বাদ দিলেও; সব সময় তাদের সমঝে চলতে হয় প্রকৃতিকে। এত কিছুর মধ্যে কিভাবে আইসল্যান্ডের মানুষ এমন একটা নির্ভাবনার ভাব ধরে রাখতে পারেন? উৎফুল্ল ভঙ্গিতে কোনো সমস্যায় পড়া বন্ধুকে বলতে পারেন ‘আরে ব্যাপার না! সব কিছু শেষে ঠিকঠাকই হবে!’

প্রশ্ন জেগেছিল বিবিসির এই প্রতিবেদকের। আইসল্যান্ডের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে তিনি হয়েছেন আরও বিস্মিত। … মহাসাগরের মাঝে এই দ্বীপরাষ্ট্রটির ইতিহাসের একটা বড় অংশজুড়ে নির্মম লড়াই চালাতে হয়েছে প্রকৃতির রুদ্ররোষের সঙ্গে। এমন সময় গেছে যখন শীত হয়েছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। ছিল ভীষণ দারিদ্র। ১৭৮৩ সালের লাকি অগ্নুৎপাতের সময় মারা পড়েছিলেন তখনকার ৫০ হাজার অধিবাসীর প্রায় ২০ শতাংশ। প্রাণ হারিয়েছিল দেশটির ৮০ শতাংশ গবাদি পশু। প্রধানত ভেড়া। কৃষিকাজের সুযোগ কম থাকায় এই গবাদি পশুই ছিল তাদের খাদ্যের একটা অন্যতম উৎস।
দেশটির বুকে এমন ঝঞ্ঝাও এসেছে যখন মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে অনেক মানুষ। ১৮ শতকে এমনই এক ভয়ঙ্কর ঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিল একটি শহরের বেশিরভাগ পুরুষ সদস্য। ৩০ শতাংশ শিশু মারা গিয়েছিল এক বছর পূর্ণ করার আগেই।

বারবার প্রকৃতির রুদ্রমূর্তির সামনে রীতিমতো অসহায় হয়ে যেতে হয়েছে আইসল্যান্ডের অধিবাসীদের। আর সেগুলো খুব আগেকার কথাও না। দেশটির একটি পর্যটন কোম্পানির মালিক Auður Ösp বলেছেন, ‘খুব বেশিদিন আগের কথা না, যখন আমরা কৃষক আর জেলের সমাজ ছিলাম। আর ঋতু পরিবর্তন, চরম বিরূপ আবহাওয়া আমাদের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করত।’

এখন অবশ্য আইসল্যান্ড বেশ আলট্রা-মডার্ন জায়গা। চারিদিকে ওয়াই-ফাইয়ের ছড়াছড়ি। সব জায়গাতে চলে ক্রেডিট কার্ড। পুরো দেশের একটা বড় অংশ চলে নবায়নযোগ্য জিওথারমাল এনার্জি দিয়ে। আর মাত্র ৯০ বছর আগে দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই থাকত ঘাস-মাটি দিয়ে বানানো প্রাচীন ঘরবাড়িতে। ফলে এসব কঠিন সময়ের কথা স্মৃতি থেকে মুছেও যায়নি। ৪৫ ও ২৩ বছর আগেও দুটি বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল আইসল্যান্ড। একবার আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ও একবার ভূমিধ্বসে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল পুরো দুটি শহরের। সবাইকে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছিল ঘরবাড়ি ছেড়ে। মারাও গিয়েছিলেন ২০জন।

এমনকি কোনো বিপর্যয় ছাড়াও, আইসল্যান্ড যে প্রাকৃতিকভাবে প্রচণ্ড জাগ্রত একটা স্থান- তা প্রতি মুহূর্তে টের পাওয়া যায়। টের পাওয়া যায় পুরো দ্বীপটির শ্বাস-প্রশ্বাস। গরম পানির ঝর্না, উষ্ণ লেক, অসংখ্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরির মধ্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতি জানান দিয়ে চলে তার অস্তিত্বের কথা।
এছাড়াও ভূতাত্ত্বিকভাবে আরও একটি কারণে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ আইসল্যান্ড। এই দ্বীপটির মধ্য দিয়েই একসঙ্গে জুড়েছে উত্তর আমেরিকান ও ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেট। আর এই দুই প্লেট প্রতিনিয়ত একে অপরের চেয়ে দূরে সরে যাচ্ছে। যার ফলে প্রতি বছরে আইসল্যান্ডের দৈর্ঘ্য বাড়ছে ৩ সেন্টিমিটার করে। আর প্রতি সপ্তাহে টের পাওয়া যায় গড়ে ৫০০টি ছোট ভূকম্পন।

এ তো গেল ভূতাত্ত্বিক দিক। আবহাওয়ার দিক দিয়েও আইসল্যান্ডের মানুষ একই রকমভাবে অসহায় প্রকৃতির কাছে। কখনো কখনো সেখানে ঝড়ো বাতাস বয়ে যায় হারিকেনের গতিতে। এমন ঝড় আসতে পারে গ্রীষ্মেও। আর শীতের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোতে সেখানে দিনের আলো পাওয়া যায় মাত্র ৪ ঘন্টা।
আইসল্যান্ডে আরেকটা পরিচিত শব্দবন্ধ আছে। “জানালা আবহাওয়া (Window Weather)”। এই সময়টায় জানালার কাছে দাঁড়ালে আপনার মনে হবে বাইরে কী সুন্দর। ঝড় বইছে… কিন্তু বাইরে গেলেই আর দাঁড়িয়ে থাকার মতো অবস্থা থাকবে না। জমে যেতে হবে ঠাণ্ডায়।

Auður Ösp বলেছেন, ‘এখানে যারা বসবাস করেন, তারা প্রকৃতির উপাদানগুলোর সঙ্গে সবসময় একটা যুদ্ধরত অবস্থায় থাকেন। কয়েক বছর আগে উত্তরাঞ্চলে আগস্ট মাসে হঠাৎ করে বরফ পড়তে শুরু করে। তখন সব কিছু বাদ দিয়ে আপনার একটাই কাজ করার থাকে। সেটা হলো দৌড়ে বাইরে যাওয়া আর গবাদিপশুদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা। অথবা হুট করে শুরু হয়ে গেল অগ্নুৎপাত। বিমান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ। হঠাৎ আটকে পড়া অবস্থায় আপনাকে তাৎক্ষণিকভাবে স্থির করতে হবে কী করা যায়।’

সব মিলিয়ে প্রকৃতির সামনে মানুষ যে কত অসহায়, তা প্রতিনিয়ত জীবন দিয়ে উপলব্ধি করে আইসল্যান্ডবাসী। সব সময় তাদের থাকতে হয় প্রকৃতির খেয়ালমর্জির বশবর্তী হয়ে। ফলে তারাও পাল্টা প্রকৃতির কাছে নিজেদের সমর্পন করেছে। অনেক কিছুই ছেড়ে দিয়েছে প্রকৃতির হাতে। তারা শুধু মনে আশা রাখে। সুকামনা করে। আর মনে মনে বা একে-অপরকে বলে, ‘সবকিছু শেষে ঠিকঠাকই হয়ে যাবে’।

আইসল্যান্ডের অধিবাসীদের এই জীবনসংগ্রামের জীবনদর্শন গড়ে ওঠার পেছনে আরও শক্ত ভিত্তি হয়তো পাওয়া যাবে তাদের ইতিহাসের একদম শুরুর দিকটায় নজর দিলে। অনেকেই মনে করেন যে, ভাইকিং যোদ্ধারা এখানে প্রথম বসতি গড়েছিল আর তারা ছিল খুবই সাহসী-দুর্ধর্ষ মানুষ। কিন্তু ব্যাপার মোটেই তেমন না। নবম শতকের দিকে নরওয়ের দিকে প্রচণ্ড অত্যাচারিত-নিপীড়িত হয়ে সাগরে পাড়ি জমিয়েছিল অনেক দাস। বেশিরভাগই ছিলেন কৃষক-খামারি জাতীয় মানুষ।

সেসময় কোনো মানচিত্রের বালাই ছিল না। বড় নৌকা-জাহাজ ছিল না। ভাগ্যের হাতে সব কিছু সঁপে দিয়ে তাঁরা ছোট ছোট ডিঙিতে চেপে বসেছিলেন। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে ১৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তারা এসে পৌঁছেছিলেন আইসল্যান্ডে। শুধু বুকভরা আশা নিয়ে তারা সাহস করেছিলেন সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার। অজানাকে জয় করার। অসম্ভবকে সম্ভব করার। সেই আশাটাও হয়তো এমন যে, ‘সবকিছু শেষে ঠিকঠাকই হয়ে যাবে’।

Auður Ösp যেমনটা বলেছেন যে, ‘বাধাবিপত্তি যতই আসুক, সবকিছু শেষে ঠিকঠাকই হয়ে যাবে- এমন একটা বিশ্বাস কিছু মাত্রায় না থাকলে আমরা যে পরিবেশে বেঁচে আছি- তা থাকা যায় না। দিয়ে একধরণের আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। আর কখনো এই নির্বিঘ্ন-নির্লিপ্ত ভাবটা বেপরোয়াও করে তোলে। কখনো সত্যিই ঠিকঠাক হয়, কখনো হয় না। কিন্তু সেগুলোর ফলে আমাদের সবকিছু ঠিকঠাক করার চেষ্টাটা থেমে থাকে না।

এমনও না যে আমরা চিন্তাশূণ্য বা নির্বোধ। আমরা বিশ্বাস করি নিজেদের সক্ষমতার ওপর যে, আমরা সবকিছু ঠিকঠাক করে ফেলতে পারি। আমরা এমন পরিবেশ-পরিস্থিতির মধ্যে থাকি যে প্রায়ই আমরা বাধ্য হই অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রয়াসে নামতে।’

শুধু মুখের কথা না। সত্যিই তেমনটা প্রতিনিয়ত করে চলেছে আইসল্যান্ড। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ধ্বসের ফলে বড়সড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল দেশটি। সেখান থেকেও তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে অভিনব ভঙ্গিতে। প্রকৃতির এত সব বিরূপ বাধা জয় করে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ইউরো কাপে অংশ নিয়েছিল আইসল্যান্ডের ফুটবল দল। ইউরোপের সবচেয়ে বড় এই আসরে তারাই সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে অংশ নেওয়ার নতুন রেকর্ড গড়েছে। আর শুধু অংশ নেওয়াই না, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আইসল্যান্ড চলে গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত। শুধু এটুকুই না… এবারের রাশিয়া বিশ্বকাপেও প্রথমবারের জায়গা করে নিয়েছিল আইসল্যান্ড। নিজেদের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে রুখে দিয়েছিল ১-১ গোলে। নানা বাধাবিপত্তি জয় করে এভাবেই প্রতিনিয়ত নিজেদের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে আইসল্যান্ডবাসী। আর সেটা সব ক্ষেত্রেই।

২০১৭ সালে আইসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের করা এক জরিপ থেকে দেখা যায় যে, দেশটির অর্ধেকেরও বেশি মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাপন করেন এই ‘þetta reddast’দর্শনকে উপজীব্য করে। যুগ যুগ ধরে নানা ঘটনা পরম্পরায় আইসল্যান্ডবাসীর মধ্যে গড়ে উঠেছে এই বোধ যে, “সবকিছু শেষে ঠিকঠাকই হয়ে যাবে।” Alda Sigmundsdóttir বলেছেন, ‘আমার মনে হয় আমাদের নিজেদের মধ্যে, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে এমন একটা দারুণ আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছে। কে বিশ্বাস করতে পেরেছিল যে, মাত্র সাড়ে তিন লাখ মানুষের একটা দেশ ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে যাবে? আমরা সেটা করেছি।’

‘সব কিছু শেষপর্যন্ত ঠিকঠাকই হবে’- শুধু বিশ্বাস রেখেই সব কিছু হয়ে গেছে- এমনটাও না। এর সঙ্গে আত্মবিশ্বাস আর ক্রমাগত লড়াইয়ের মানসিকতাও সঙ্গী হয়েছে আইসল্যান্ডের মানুষের। তবে সবসময় সামনে একটা আশাবাদ রাখায় তারা জীবনকে দেখতে পেরেছে আয়েশী ও সহজ একটা দৃষ্টিতে।