বইয়ের জন্য একটা দিন, একটা জীবন ও অনেক লড়াইয়ের ইতিহাস

২৩ এপ্রিল বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস। ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর এই দিবসটি পালিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস পালনের মূল লক্ষ্যই হল বই পড়া, বই ছাপানো, বইয়ের কপিরাইট সংরক্ষণ করা ইত্যাদি বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়ানো। কিন্তু কিভাবে শুরু হলো বই দিবসের যাত্রা? কী এর ইতিহাস?

বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবসের ইতিহাস

মনে প্রশ্ন আসতে পারে, এত তারিখ থাকতে ২৩শে এপ্রিল কেন? এই ২৩শে এপ্রিলের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৩২ সালের স্পেনের কাতালোনিয়াতে। স্পেনের বই বিক্রেতারা প্রথম আওয়াজ তুললেন শুধুমাত্র বইয়ের জন্যই বাৎসরিক ক্যালেন্ডারে একটি বিশেষ দিন রাখার স্বপক্ষে। তবে বইয়ের জন্য বিশেষ দিবস পালনের জন্য বছরের তিনশত পয়ষট্টি দিনের মধ্যে থেকে সবচেয়ে গঠনমূলক একটি দিন প্রস্তাব করেন স্পেনের লেখক ভিসেন্ট ক্রাভেল আন্দ্রোসের কাছ থেকে। আন্দ্রোস ছিলেন স্পেনের অবিসংবাদী লেখক মিগুয়েল দে সার্ভেন্তেজের বিশেষ অনুরাগী। বিশ্বসাহিত্য সার্ভেন্তেজকে অমর করে রেখেছে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ডন কিহোট’। ডন কিহোট হল এই গ্রহের প্রথম আধুনিক উপন্যাস। সার্ভেন্তেজের প্রভাব বিশ্বসাহিত্যে এতটাই যে স্পেনীয় ভাষাকে বিশ্ববাসী ‘সার্ভান্তেজের ভাষা’ বলে সম্বোধন করে। তো এই সার্ভেন্তেজের মৃত্যু দিবস হল ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে এপ্রিল। আন্দ্রোসই প্রথম তাঁর নিজের প্রিয় লেখক সার্ভেন্তেজের স্মরণে স্পেনে শুরু করেন বই দিবস পালন।
১৯৯৫ সালে যখন ইউনেস্কোতে বই দিবস পালনের প্রস্তাব উঠে, তখন বিশ্বসাহিত্যের খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের জন্ম ও মৃত্যু সাল ও তারিখ দেখতে গিয়ে দেখা যায়, শেক্সপীয়র ও সার্ভেন্তেজ উভয়েই একই সাল ও একই তারিখে মৃত্যুবরণ করেছেন। সাহিত্যের এই দুই নক্ষত্রের একই দিনে সমাপতন ইউনেস্কোকে আর দ্বিতীয়বার ভাবায় নি ২৩শে এপ্রিল কে এই দিবস পালনের তারিখ নির্ধারণ করতে। ১৯৯৫ সালের আজকের এই দিনটিকে বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে। শুধু সার্ভেন্তেজ বা শেক্সপীয়রই শুধু নয়, স্পেনের বিখ্যাত ঘটনাপঞ্জিকার ইনকা গার্সিলাসো ডেলা ভেগা এবং আমাদের সত্যজিৎ রায়ের মহাপ্রয়ান দিবসও ২৩ এপ্রিল।

মিগুয়েল দে সার্ভান্তেজ

কেন বিশ্বব্যাপী দিবস পালন করা হয় এই বিশেষ দিন?

বিশ্বব্যাপী বই দিবস উদযাপিত হয় বইয়ের গুরুত্ব আরও ব্যপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। বই আসলে অতীত এবং ভবিষ্যতের এক যোগসূত্র। পাশাপাশি সংস্কৃতির সঙ্গে প্রতি প্রজন্মের একটি সেতুবন্ধনের কাজও করে বই। লেখক-পাঠক-প্রকাশক এই ত্রয়ীর মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে এই বই দিবসের আয়োজন। বিশ্ব বই দিবসের দিনে ইউনেস্কো (UNESCO) ছাড়াও প্রকাশক, বই বিক্রেতাদের এবং লাইব্রেরির মতো প্রতিষ্ঠান মিলে এক বছরের জন্য বিশ্ব বই রাজধানী নির্বাচন করে। ২০১৯ সালের জন্য সংযুক্ত আরব আমির শাহির শহর শারজাকে বিশ্ব বই রাজধানী নির্বাচিত করা হয়েছে। ২০২০ সালে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর হবে বইয়ের রাজধানী। আজ কপিরাইট দিবসও। কপিরাইট হল কোন লেখকের যা কিছু সৃষ্টি, হতে পারে তা কোন গল্প, কবিতা, হতে পারে তা কোন সুর, গান, ভাস্কর্য, আঁকা ছবি, ভিডিও,স্থাপত্যসহ এমন কিছু যার সৃষ্টির পেছনে লেখকের মেধা রয়েছে, সেই সৃষ্টিকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া যাতে অন্য কেউ লেখকের অনুমতি ছাড়া আর্থিকভাবে লাভবান বা নিজের সৃষ্টি বলে চালাতে না পারে।

এ বছরের গ্রন্থ ও কপিরাইট দিবস উদযাপনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় কি?

ইউনেস্কোর পরিচালক জেনারেল আন্ড্রে অজাউলে জানিয়েছেন, “বইগুলি সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি প্রকাশের এক রূপ, যা একটি নির্বাচিত ভাষা দ্বারা প্রকাশিত। প্রতিটি প্রকাশ একটি বিশেষ ভাষায় লেখা হয় এবং সেই ভাষা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য। এইভাবে একটি বই বিশেষ ভাষা এবং সংস্কৃতির অধীনে লেখা হয়, নির্মিত হয়, বিনিময় হয় এবং প্রশংসিত হয়। এই বছর আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই, কারণ ইউনেস্কোর নেতৃত্বে ২০১৯ সালে স্বদেশী ভাষাগুলিকে আন্তর্জাতিক বছরের প্রেক্ষিতে চিহ্নিত করেছে। যাতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিটি সম্প্রদায় নিজস্ব সংস্কৃতি, জ্ঞান এবং অধিকার রক্ষা করতে পারে।”