যে চলচ্চিত্রটি অনেক আগেই বলেছিল নাৎসিদের ইহুদি গণগত্যার কথা!

১৯২৪ সালের একটি মূক চলচ্চিত্র অনুমান করেছিলো জার্মানীতে শুরু হতে যাচ্ছে নাৎসি বাহিনীর নিপীড়ন। চলচ্চিত্রটি কালের স্রোতে হারিয়ে গেলেও সেটি ২০১৫ সালে প্যারিসের একটি সস্তা জিনিসের খোলা বাজারে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। একটি বিশাল অর্থ সংগ্রহ প্রকল্পের সুবাদে চলচ্চিত্রটিকে সংরক্ষন করা হয়েছে এবং পুনরায় প্রদর্শিত হচ্ছে বিভিন্ন হলে। জানা গেছে বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে।

একটি দৃশ্যে দেখা যায়, এক নারী একটি বাজারে কেনাকাটা করছেন। কিন্তু পন্যের চড়া মূল্য দেখে তিনি রেগে যান এবং পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া এক ইহুদী ব্যক্তির দিকে রাগে ফলমূল ছুড়ে মারতে থাকেন।

পরবর্তীতে আন্দোলনকারী বিশাল এক জনতাকে দেখা যায় আচার্যের কার্যালয়ের সামনে। এর ভিতরে নেতা একজন উপদেষ্টার সাথে পরামর্শ করছেন। তিনি বলেন, “ইহুদীদের দমন করাটা অন্যায়। কিন্তু মানুষকে সন্তুষ্ট করতে হলে তা করতেই হবে”।

“দ্য সিটি উইদাউট জিউস” নামের অস্ট্রিয়ান এই চলচ্চিত্রে দেখানো ঘটনাগুলো যেন আসন্ন দিনগুলোরই এক ভবিষ্যদ্বাণী। চলচ্চিত্রটি ইহুদি গণহত্যার ২০ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। সে সময়ে অস্ট্রিয়ায় নাৎসি বাহিনী নিষিদ্ধ ছিল। আর অ্যাডলফ হিটলার ছিলেন জার্মানির কারাগারে।

ইহুদীবিদ্বেষের সম্প্রসারন

এই চলচ্চিত্র এমন এক শহরের গল্প বলে যেখানে সকল ইহুদীদেরকে বিতাড়িত করা হয়। সেই শহরের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আর বেকারত্বের কারণে বলির পাঠা হয় ইহুদী সম্প্রদায়।

চলচ্চিত্রটি অস্ট্রিয়ান ইহুদী লেখক ও সাংবাদিক হিউগো বেট্টর-এর একটি রম্য উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। ফিল্মআর্কিভ অস্ট্রিয়ার সংগ্রহ পরিচালক নিকোলস উয়োস্ট্রি বলেন, “১৯২০ এর দশকের শুরুতে, ঠিক যখন অস্ট্রিয়ার প্রথম গনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়, তখন চারিদিকে ইহুদীবিদ্বেষ বাড়তে শুরু করেছিল। রাজতন্ত্রের সময়ের চেয়ে তা অনেক বেড়ে যায়”।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে বাস্তুচ্যুত ইহুদীরা যখন ভিয়েনায় আশ্রয় নেন, তখন সেখানে বাড়তে থাকা অস্থিতিশীলতা আর বর্নবাদের প্রতিবাদ করছিলেন বেট্টর। উয়স্ট্রী বলেন, “হিউগো বেট্টর এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি সমাজকে ইহুদী, সমকামী এবং নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহনের ব্যাপারে সহনশীল হতে আহবান জানাতেন। আর তার কারণে অস্ট্রিয়ার ডানপন্থী সমাজের সাথে কলহে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সে সময়ে অস্ট্রিয়ায় ডানপন্থীরা বেশ ক্ষমতার অধিকারী ছিল”।

 অদ্ভূত হত্যা

এই চলচ্চিত্র অস্ট্রিয়ান পরিচালক এইচকে ব্রেসলর এর পরিচালনায় ১৯২৪ সালে ভিয়েনায় প্রথম প্রদর্শিত হয়। চলচ্চিত্রটি একটি সফল চলচ্চিত্র ছিল এবং ভিয়েনার পাচটি বড় প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছিল এটি। কিন্তু তারপরেই ডানপন্থীরা বেকে বসে।

এই চলচ্চিত্র নির্মানের এক বছরেরও কম সময়ের মাঝে লেখক হিউগো বেট্টরকে হত্যা করা হয়। এর আগে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছিল।

কিন্তু খুনী রথস্টক-এর বিরুদ্ধে আইনী বিচারটি খুব বেশি অদ্ভূত ছিল। সে নামমাত্র সাজা পায় আদালত থেকে। একটি খুনের মতো বড় অপরাধে লঘু শাস্তি নিয়ে পার পেয়ে যায় নাৎসি পার্টির সেই সদস্য।

হতাশ বিদায়

চলচ্চিত্রটি এখন দেখলে দেখা যায় এই চলচ্চিত্রটির বিতাড়নের দৃষ্যগুলো খুব ভয়ংকর এবং খুবই দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। এখানের শহরটিতে বসবাসকারী ইহুদীদেরকে বড়দিনের আগেই শহর ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। দরিদ্র ব্যক্তিরা পায়ে হেটে শহর ছেড়ে যেতে শুরু করেন। তাদের সাথে সাথে হেটে যায় বেয়োনেট ধারী সৈন্যরা। পুরো সম্প্রদায় শুভ্র তুষার ভেদ করে ধীরে ধীরে হেটে চলে, কেউ কেউ ক্রাচে ভর করেম কেউ বা সেনদাগার তওরা স্ক্রোল হাতে নিয়ে।

বাকিরা যাত্রা শুরু করেন ট্রেনে চড়ে। রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে দেখা যায় হতাশ এক বিদায়ের মেলা। একজন ইহুদী বাবা তার ছোট্ট কন্যাকে বিদায় জানান, যে মেয়েটি সেই শহরেই তার খ্রিস্টান মায়ের সাথে থেকে যাবে।

বাস্তবে নাৎসি শাসিত ইউরোপে প্রায় ৬ মিলিয়ন ইহুদিকে এভাবেই একত্রিত করে হত্যা করা হয়েছিল। আরো অনেকে দেশ ছেড়ে অন্য দেশে জীবন নিয়ে পালিয়েছিলেন।

এই চলচ্চিত্রের একজন অভিনেতা হান্স মোসার। তিনি সে সময়ে অস্ট্রিয়ার অন্যতম বিখ্যাত একজন তারকা ছিলেন। তিনি একজন ইহুদী নারীকে বিয়ে করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে যখন নাৎসি বাহিনী সেখানকার দখল নিয়ে নেয়, তখন তাকে বলা হয় সে বিয়ে ভেঙ্গে দিতে। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি অ্যাডলফ হিটলারকে সরাসরি চিঠি লিখেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন হিটলার তার একজন ভক্ত ছিলেন। তার সহধর্মিনী ঘটনাক্রমে হাঙ্গেরীতে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে সেখানে তাদের আবার মিলন ঘটে। আর এর মাঝেই হারিয়ে যায় সেই চলচ্চিত্রটি।

ক্রমবর্ধমান প্রাসঙ্গিকতা

১৯৯১ সালে চলচ্চিত্রটির খুবই ক্ষতিগ্রস্ত একটি কপি পাওয়া গিয়েছিল। তারপরে ২০১৫ সালে একজন সংগ্রাহক-এর কাছে প্যারিসের এক বাজারে পাওয়া যায় সম্পূর্ন চলচ্চিত্রটি।

অস্ট্রিয়ান ফিল্ম আর্কাইভ এই চলচ্চিত্রটি সংরক্ষনের লক্ষে জনগনের কাছ থেকে অর্থ সহায়তার আহবান জানায়। এই ডাকে সাড়া দেন প্রায় ৭০০ জন ব্যক্তি। তারা মিলে মোট ১,০৭,০০০ মার্কিন ডলার একত্রিত করেন, যার কল্যানে চলচ্চিত্রটিকে ডিজিটাল রূপে সংরক্ষন করা সম্ভব হয়েছে এবং পুনরায় প্রেক্ষাগৃহগুলোতে প্রদর্শন করা হচ্ছে।

বর্তমানে এটি ভিয়েনায় প্রদর্শিত হচ্ছে। এ বছরের শেষ নাগাদ এটি অস্ট্রিয়া এবং ইউরোপের অন্য কয়েকটি বড় শহরে প্রদর্শিত হবে। নিকোলস উয়োস্ট্রী মনে করেন, মূক চলচ্চিত্রের সময়ে এই চলচ্চিত্রটি নাৎসি বাহিনির বিরুদ্ধে নির্মিত অন্যতম শক্তিশালী একটি চলচ্চিত্র।

চলচ্চিত্র দেখা যায়, যখন শহর ইহুদীমুক্ত হলো, শহরের কর্তৃপক্ষ আতসবাজি ফুটিয়ে উদযাপনে মাতে। কিন্তু তারপরেই জীবনে নেমে আসে নেতিবাচক সব পরিস্থিতি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আর অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হয়ে যায় আর শহরের নামীদামী ক্যাফেগুলো সস্তা বিয়ার হল-এ পরিণত হয়। ঘটনাক্রমে আচার্য পুনরায় ইহুদীদেরকে ফিরে আসার আহবান জানান। যুগলেরা আর অন্যান্য ইহুদী পরিবারেরা আবার একত্রিত হয়।