বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী নিয়ে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে দ্য ডিপ্লোম্যাট। লিখেছেন অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক একটি সামরিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রায়ান স্মিথ। এটি সেই লেখাটির হুবহু অনুবাদ। এই লেখার মতামত বা বক্তব্যের সঙ্গে ‘এই বাংলার’ সম্পাদকীয় নীতিমালার অমিল থাকতে পারে।

সরকারী পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ২০১৭-১৮ সালের বাজেটে সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ ছিলো ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের মোট বাজেটের ৬% খরচ করা হয় সেনাবাহিনীর উন্নয়নে। এতকিছু সত্ত্বেও প্রতিবেশি দেশ মায়ানমারের দ্বারা নিজেদের ভূখন্ড, আকাশসীমা ও সমুদ্রসীমায় বেশ কিছু অনিয়মের ব্যাপারে তেমন জোর দেখাতে সক্ষম হয়নি তারা।

তারা দেশের কোন বিপদে দেশকে রক্ষা করতে পারবে, সাধারন মানুষকে এমন আশ্বাস দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পিছনে অন্যতম কারন হতে পারে যে, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই সেনাবাহিনী থেকেছে সকল দায়বদ্ধতা ও জবাবাদিহিতার উর্ধ্বে। দেশের যে সকল জায়গা তাদেরকে সুরক্ষিত রাখার কথা তার অনেক জায়গা তারা জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাঠামো আগের ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্তান আর্মির মতোই। আর সেরকমই যেন হয়ে গিয়েছে তাদের অসামরিক আচরন আর রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে সম্পর্ক। বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার পর ৪৬ বছরের মধ্যে তারা দেশ শাসন করেছে ১৫ বছর।

বাংলাদেশের গনপ্রজাতন্ত্রী শাসন ব্যবস্থায়ও রাজনৈতিক নেতাদেরকে বলা হয় সেনাবাহিনীর সাথে বুঝেশুনে কথা বলতে। আর বর্তমানে দেশের অনেক ক্ষমতাসীন নেতার রয়েছে অতীতে সেনাবাহিনীতে যুক্ত থাকার ইতিহাস। তারা সরকারকে রীতিমত উদ্বুদ্ধ করে যেন সরকার সেনাবাহিনীর কোন ব্যাপারে নাক না গলায়।

অনেক উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেনাবাহিনীর আভ্যন্তরীন তেমন কিছু জানার উপায় নেই অসামরিক কারো। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সব তথ্য গোপন রাখা হয় ফলে বাজেট নির্ধারন এবং অন্যান্য সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বচ্ছতার অভাব। নিরাপত্তারক্ষীরা মনে করেন তাদের বিশেষ যত্ন দরকার কারণ জাতির নিরাপত্তার গুরুদায়িত্ব তাদের কাধে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্ম প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরেকটি জটিলতা। দেশের অভ্যন্তরের কোন ঝামেলা নিরসনেও মোতায়ন করা হয়ে থাকে তাদেরকে। উদাহরনস্বরূপ, ২০০৭ সালে দুই রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার লড়াইয়ের অবস্থা সামাল দিতে মধ্যস্থতা করে সেনাবাহিনী। এই দ্বৈত ভূমিকার কারণে তাদের মাঝে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ন এবং কোনটি নয়, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

আর্মড ফোর্স বিভাগ থেকে সেনাবাহিনীর নীতি নির্ধারিত হয় এবং বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের পূর্ন অধিকার রয়েছে সেনাবাহিনীর তদারকি করার। কিন্তু বাস্তবে তা হয়েও হয়না যেন।

বর্তমানে আর্মড ফোর্স বিভাগ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় দুইই রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ব্যাপারে কথা বলতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সহ ছয় সদস্যের এক কমিটি গঠিত হয়।  তারা সেনাবাহিনীর কল্যান এবং উন্নয়ন নিয়ে সিদ্ধান্তগুলো সেখান থেকে নেয়।

সমস্যা হয় যখন এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাজেট নির্ধারন করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়না। বীতি ও বাজেটের মধ্যে বিস্তর তফাত । মাঝে মাঝে নানান প্রশ্নবিদ্ধ পন্থা চর্চা এবং অন্যান্য কারণে ব্যয়বহুল সব যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্পর্কে বাৎসরিক বাজেট ছাড়া তেমন কোন তথ্য জানায় না। অনান্য উন্নয়নশীল দেশের মত সামরিক পর্যায়ে কত অস্ত্র আমদানী হচ্ছে, কোন সরঞ্জাম আনা হলো এমন সব তথ্য কৌশলে বাজেটে উল্লেখ করা থেকে বিরত রাখা হয়।

সেনাবাহিনীর জন্য তৈরি বাজেট নিরাপত্তা বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে করা হচ্ছেনা, তাদের বাজেট প্রনয়ন হচ্ছে যেন এক মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিনিয়োগ স্বরূপ। ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর চর্চায় অভ্যস্ত নয়। নীতি এবং প্রয়োজনের সাথে প্রণীত বাজেট এর সম্পর্ক কম হওয়ার কারণে শেষমেশ কাঙ্খিত লক্ষ অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। শেষ পর্যন্ত এইসব অর্থ ব্যয় হয়ে যায় অপ্রয়োজনীয় সব খাতে, যেখানে নিরাপত্তার চাহিদার পেয়ালা খালিই থেকে যাচ্ছে। আর দূর্নীতি তো হচ্ছেই সেসব অর্থ নিয়ে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দেওয়া অতিরিক্ত অর্থ তারা নিরাপত্তা বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার না করে তাদের অন্যান্য ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে বিনিয়োগ করছে।

পাকিস্তানী আর্মির ব্যবসায়ের ধরন অনুসরন করে বাংলাদেশের সেনা কল্যান সংস্থা খুলে বসেছে বেশ কিছু লাভজনক ব্যবসা। এর মধ্যে রয়েছে দুগ্ধ খামার ও আইসক্রীম কারখানা। বিবিসি জানায়, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ব্যবসায়ের মধ্যে রয়েছে খাদ্য, টেক্সটাইল, পাট, গার্মেন্ট, ইলেকট্রনিক, রিয়াল স্টেট, অটোমোবাইল, জাহাজ নির্মান, উৎপাদন এবং পর্যটন শিল্প। তাছাড়া তারা ট্রাস্ট ব্যাংক এবং আনসার ভিডিপি ব্যাংকেরও নিয়ন্ত্রক। বিবিসি-এর তদন্তে আরো উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবসায়িক হাত সম্প্রসারিত হয়ে তা পৌছেছে বিদ্যুৎ পাওয়ার প্লান্ট, সড়ক ও কাঠামো নির্মান এবং সেতু নির্মান প্রকল্পে। যা থেকে তারা আয় করছে কয়েক শত কোটি টাকা।

২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের পিছনেও একটি কারণ ছিল খুচরা পন্য বিক্রির ক্ষেত্রে সেনা অফিসারদের বিভিন্ন দূর্নীতিতে বিডিআর সেনাদের অসন্তোষ।

বাংলাদেশের অনেক স্বনামধন্য ব্যবসায়ী মনে করেন, বাংলাদেশের অন্যান্য অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে সেনাবাহিনী পরিচালিত ব্যবসাগুলোর কোনই পার্থক্য নেই। অবাক করার ব্যাপার হলো, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনের সময়ের চেয়ে বর্তমানের বেসামরিক শাসনামলেই তারা ব্যবসায়ে বেশি পটু হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যতই ‘উন্নতি’ করছে, ততই অতীতের এক বিতর্ক আরো তীব্র হচ্ছে- সেনাবাহিনীর কি নিরাপত্তার কথা ভাবা বাদ দিয়ে ব্যবসা নিয়ে ভাবা উচিৎ? যেখানে তাদের জন্য জাতীয় বাজেটে এমনিতেই যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে।